কাচের প্রবন্ধ
অ্যান কারসনের কবিতা ।। ভাষান্তর : মাসুদুজ্জামান
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
এক
স্বপ্নের ভেতর আমি মৃদু খটখট শব্দ শুনতে পাই। রাত তার রুপোলি জলের ফোঁটা ঝরিয়ে দেয় আমার পিঠ ঘেঁষে। ভোর চারটেয় ঘুম ভেঙে যায় আমার। ভাবছি
সেই লোকটার কথা, যে সেপ্টেম্বরে চলে গেছে। তার নাম ছিল ল।
বাথরুমের আয়নায় নিজের মুখ দেখি–সাদা রঙের দাগ গড়িয়ে পড়েছে গালে। মুখটা ধুয়ে আবার শুতে যাই। কাল আমি মায়ের কাছে যাব।
দুই
উত্তরের এক বিস্তীর্ণ নির্জন প্রান্তরে মা থাকেন। তিনি একা থাকেন। সেখানে বসন্ত আসে ধারাল তরবারির মতো তীক্ষ্ণ হয়ে। সারাদিন ট্রেনে ভ্রমণ করে যাই, সাথে নিয়ে চলি অনেক বই–কিছু মায়ের জন্য, কিছু আমার নিজের; যার মধ্যে রয়েছে ‘এমিলি ব্রন্টের রচনাবলি’।
তিনি আমার প্রিয় লেখিকা। একই সাথে আমার সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গাও, যার মুখোমুখি হতে চাই এবার। যতবারই মায়ের সাথে দেখা করতে যাই, আমার মনে হয় আমি যেন এমিলি ব্রন্টেতে রূপান্তরিত হচ্ছি–আমার চারপাশের নিঃসঙ্গ জীবনটা ওই নির্জন প্রান্তরের মতো ছড়িয়ে পড়ে, কাদামাখা জমিতে রূপান্তরের এক অদ্ভুত আলো মেখে আমার অপটু শরীরটা হেঁটে চলে, যে আলো রান্নাঘরের দরজায় পা রাখতেই নিভে যায়। আমাদের ঠিক কোন মাংসের ক্ষুধা মেটানো দরকার, এমিলি?
তিন
রান্নাঘরের টেবিলে নিঃশব্দ তিনটি নারী। মায়ের রান্নাঘরটা অন্ধকার আর ছোট, কিন্তু জানালার বাইরে বরফে জমে নিথর হয়ে থাকা প্রান্তর। চোখ যতদূর যায়, সমতল মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে গিয়ে মিশেছে এক নিভে যাওয়া সাদা আকাশে। মা আর আমি খুব মনোযোগ দিয়ে লেটুস পাতা চিবোচ্ছি। দেওয়াল ঘড়িটা থেকে একটা খসখসে নিচু গুঞ্জন ভেসে আসছে, যা প্রতি মিনিটে বারোটার কাঁটা পার করার সময় একবার লাফিয়ে ওঠে। চিনির পাত্রের সাথে ঠেস দিয়ে রাখা এমিলি ব্রন্টের বইয়ের ২১৬ নম্বর পৃষ্ঠা খোলা, তবে আমি চুরি করে আড়চোখে মাকে দেখছি। ভেতর থেকে হাজারটা প্রশ্ন আমার চোখের ওপর আছড়ে পড়ছে। মা ব্যস্ত তাঁর লেটুস পাতা নিয়ে। আমি ২১৭ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্টে যাই।
‘রান্নাঘর দিয়ে তড়িঘড়ি যাওয়ার সময় আমি হেয়ারটনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলি, সে দরজার ফ্রেমের পেছনে চেয়ারের পিঠে ছোট কুকুরের ছানাগুলোকে ফাঁস দিয়ে ঝোলাচ্ছিল।’
মনে হচ্ছে আমরা সবাই যেন এক কাচের পরিবেশের ভেতরে নেমে গেছি। মাঝে মাঝে সেই কাচ ভেদ করে দু-একটা কথা ভেসে আসে–পেছনের জমির ওপর। তরমুজটা ভালো না, তরমুজের সময় এখনও আসেনি। শহরের হেয়ারড্রেসার নাকি ঈশ্বরের সন্ধান পেয়েছে, এখন প্রতি মঙ্গলবার দোকান বন্ধ রাখে। চায়ের তোয়ালে রাখার ড্রয়ারে আবার ইঁদুর ঢুকেছে। ছোট ছোট মল ছড়িয়ে রেখেছে। কাগজের ন্যাপকিনের কোণাগুলো কেটে ফেলে, আজকাল কাগজের ন্যাপকিনের যে দাম তা যদি ওরা জানত! আজ রাতে বৃষ্টি হবে। কালকেও বৃষ্টি। ফিলিপাইনের ওই আগ্নেয়গিরিটা আবার জেগে উঠেছে। ডেসপার সেই অ্যান্ডারসন নাকি মারা গেছে, না না শার্লি না–ওই অপেরা গায়িকা। কৃষ্ণাঙ্গ নারী। ক্যান্সার। গ্লেসের সাজানো খাবারগুলো খাচ্ছ না যে, লাল মরিচ পছন্দ নয়?
জানালার বাইরে আমি দেখতে পাচ্ছি মরা পাতাগুলো সমতল ভূমির ওপর খটখট শব্দে উড়ে চলেছে, আর পাইন গাছের ময়লায় দাগী বরফের অবশিষ্টাংশ। প্রান্তরের ঠিক মাঝখানে, যেখানে জমিটা একটু নিচু হয়ে নেমে গেছে, বরফ সেখানে গলতে শুরু করেছে। রাগের মতো তীব্র হয়ে উঠে আসছে কালো খোলা জল। মা হঠাৎ কথা বলে ওঠেন, ‘তোমার ওই সাইকোথেরাপি তো কোনো কাজে আসছে না, তাই না? তুমি তো তাকে ভুলে এগোতে পারছ না।’ মায়ের একটা ক্ষমতা আছে, যেকোনো বিষয়কে সংক্ষেপে গুটিয়ে ফেলার। মা কখনও ল-কে খুব একটা পছন্দ করেননি, তবে আমার জীবনে একজন পুরুষ থাকুক আর আমি জীবনে এগিয়ে যাই–এই ধারণাটা তাঁর পছন্দ ছিল। ‘যাকগে, সে হলো নেওয়ার মানুষ আর তুমি দেওয়ার, আশা করি ব্যাপারটা টিকবে’–ল-এর সাথে প্রথম দেখা হওয়ার পর মা শুধু এটুকুই বলেছিলেন। তখন আমার কাছে ‘দেওয়া’ আর ‘নেওয়া’ শব্দ দুটো শুধুই কথা ছিল। এর আগে তো আমি কখনও প্রেমে পড়িনি। ব্যাপারটা ছিল পাহাড় গড়িয়ে নামা কোনো চাকার মতো। কিন্তু আজ খুব ভোরে, মা যখন ঘুমিয়ে ছিলেন...
আমি নিচে নেমে উইদারিং হাইটস-এর সেই অংশটা পড়ছিলাম–যেখানে ঝড়ের রাতে হিথক্লিফ জানালার গ্যারেটে আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, তার কলিজার টুকরো ভালোবাসার প্রেতাত্মাকে ডেকে বলছে: ফিরে এসো! ফিরে এসো!
মেঝের গালিচায় হাঁটুমুড়ে বসে আমিও কান্নায় ভেঙে পড়লাম। পাপ্পিদের ফাঁসিতে কেমনে ঝোলাতে হয়–এই এমিলি তা খুব ভালো করেই জানে।
‘এটা তো আর অ্যাসপিরিন খাওয়ার মতো ঝটপট সারার বিষয় নয়,’ আমি মৃদু গলায় উত্তর দিই। ‘ডক্টর হাউ বলেন–শোক একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।’ সে কপাল কুঁচকে তাকায়। ‘অতীতের এসব ঘেঁটে কী উদ্ধারটা হয়, শুনি?’
‘আহা–’ আমি দুই হাত ছড়িয়ে দিই।
‘আমি কিন্তু টিকে থাকি!’ আমি তার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলি।
সে মৃদু হেসে ওঠে। ‘হ্যাঁ, তা তো বটেই।’
- বিষয় :
- গল্প