ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

অ্যান কারসনের গীতল ভাষার বিশ্বজয়

অ্যান কারসনের গীতল ভাষার বিশ্বজয়
×
×

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাজিকরদের জয় হলো এবার। কানাডার কবি অ্যান কারসন ২০২৬-এর সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেলেন। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগমুহূর্তে বাজিকরদের তালিকায় তিনি চীনের কথাসাহিত্যিক ক্যান জু-এর সাথে যৌথভাবে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছিলেন। ল্যাডব্ৰোকস-এর মতো খ্যাতনামা প্ল্যাটফর্মে তাঁর বেটিং রেট ছিল ১০/১, অর্থাৎ তাঁর ওপর এক টাকা বাজি ধরলে ১০ টাকা পাওয়া যাবে; যদি তিনি নোবেল জয় করে ফেলেন। 
স্মরণ করা যায়, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেও তাঁর বেটিং রেট ছিল ২০/১। অর্থাৎ এক টাকা বাজিতে ২০ টাকা। মাত্র এক সপ্তাহে ল্যাডব্ৰোকস তাঁর জন্য নোবেল জেতার সম্ভাবনা দ্বিগুণ করে দেয়। সম্প্রতিকালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য বাজিকরদের ভবিষ্যৎবাণী সফল হওয়ার ঘটনা আর নেই। নোবেল কমিটি প্রায় এক দশক পর্যন্ত চমকের পর চমক দিয়ে আসছে।
কবি হিসেবে অ্যান কারসন খুব জনপ্রিয় কবি নন। অনেক সাধারণ পাঠকই তাঁর কবিতা সহজে গ্রহণ করতে পারে না। তাঁর কবিতা দুর্বোধ্য ও অনধিগম্য বললে অত্যুক্তি করা হয় না। কবিতায় তিনি এমন সব জটিল রূপক ব্যবহার করেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য না সুস্বাদু, না বোধগম্য। তবে তিনি বিশ্বসাহিত্য মহলে একজন পণ্ডিত হিসেবে পরম শ্রদ্ধার পাত্র। বাংলাদেশ সময় ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব তাঁর নাম ঘোষণা করার সময় বলেছেন, অ্যানা কারসন এমন একজন সাহিত্য ব্যক্তি; যিনি সাহিত্যের প্রচলিত সব ঐতিহ্য তছনছ করে দিতে পারঙ্গম–প্রথা ভাঙার দক্ষ কারিগর। 
নোবেল বিজয়ী হিসেবে অ্যানা কারসনের নাম ঘোষণার সময় তাঁর ‘সাহসী এবং উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের’ প্রশংসা করা হয়। কমিটি জানায়, গ্রিক ও রোমান ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সাথে উত্তর-আধুনিক মনস্তত্ত্বের এক চপল ও বুদ্ধিবৃত্তিক মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি সমসাময়িক সাহিত্যের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক রূপবন্ধ সৃষ্টি করেছেন; যার কোনো পূর্বসূত্র নেই। নেই কোনো অগ্রজ।
গ্রিক ক্ল্যাসিক, দর্শন ও কবিতার মিশেল দিয়ে অ্যানা কারসন যে কাব্যশৈলীর প্রবর্তক, সেই নির্দিষ্ট আঙিনায় তিনি হয়তো একমেবাদ্বিতীয়ম; তবে বিশ্বসাহিত্যের জগৎটি কোনো একক প্রতিভার একচেটিয়া রাজত্ব নয়। সমসাময়িক কালে বিশ্বজুড়ে এমন বেশ কয়েকজন কবি ও লেখক আছেন, যাদের নিজস্ব কাব্যশৈলী, উপলব্ধির গভীরতা এবং আবেগের অতলান্তিক তীব্রতা অ্যানা কারসনের সমকক্ষ বা সমান্তরাল বলে গণ্য করা যায়। 
অ্যানা কারসনের মতো যারা কবিতা, দর্শন ও গদ্যের সীমানা মুছে দিয়ে এক নতুন মিশ্র ধারার সৃষ্টি তৈরি করেছেন, তাদের মধ্যে আমেরিকার ম্যামি নেলসন সবচেয়ে এগিয়ে। তাঁর বিখ্যাত বই ‘ব্লুয়েটস’ বা ‘দি আরগোনটস’ পড়লে কারসনের মতোই এক পরম বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগঘন অভিজ্ঞতার আস্বাদন হয়। পাঠক অনেকেই এই দুজনকে সমসাময়িক সাহিত্যের দুই সমান্তরাল স্তম্ভ মনে করেন।
নোবেল বিজয়ী অ্যানা কারসন যেমন প্রাচীন গ্রিক ও ক্ল্যাসিক সাহিত্যকে আধুনিক রূপ দেওয়ার জন্য বিখ্যাত, ঠিক তেমনি যুক্তরাজ্যের কবি অ্যালিস অসওয়াল্ড ধ্রুপদি মহাকাব্যকে সমকালীন কবিতার ভাষায় রূপান্তর করায় সিদ্ধহস্ত। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘মেমোরিয়াল’ (যা হোমারের ইলিয়াডের সর্বাধুনিক রূপান্তর) কাসনের অনুবাদ ও মৌলিক সৃষ্টির মতোই শক্তিশালী। 
দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কিম হাইসুন সমকালীন এশীয় ও বিশ্ব কবিতায় এক অবিসংবাদিত নাম। কারসন যেমন মিথ বা পুরাণ নিয়ে খেলা করেন, কিম হাইসুন তেমনি পরাবাস্তবতাবাদ ও নারীবাদের এক অসমসাহসী তীব্র রূপ ফুটিয়ে তোলেন। বিশ্বজুড়ে সমালোচকদের কাছে তাঁর কাব্যিক গভীরতা কারসনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
অ্যানা কারসনের সর্বশেষ প্রকাশিত মৌলিক বইটির নাম ‘রং নরমা’ (Wrong Norma), যা ২০২৪ সালের শুরুর দিকে প্রকাশিত হয়। ২৫টি ব্যতিক্রমী কাঠামোর রচনার সমন্বয়ে সংগ্রন্থিত এই সংকলনটি ২০২৪ সালের আমেরিকার মর্যাদাপূর্ণ ‘ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর পোয়েট্রি’ না-পেলেও চূড়ান্ত তালিকায় (শর্টলিষ্টে) জায়গা করে নিয়েছিল। ‘রং নরমা’ কোনো একক ধারাবাহিক কাহিনির বই নয়। এটি ২৫টি ভিন্নধর্মী আখ্যান, পরাবাস্তব গল্প, গদ্য-কবিতা এবং খণ্ড-স্মৃতির সংকলন। এখানে একরৈখিক কোনো আখ্যানভাগ নেই, বরং একেকটি অধ্যায়ে একেকটি অদ্ভুত ও চমকপ্রদ গল্প বা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক সমালোচক সুসান সনট্যাগ অ্যান কারসনের লেখার গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন। তিনি কারসনের ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ বইটিকে একটি ‘জাদুকরী সাফল্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেছিলেন যে ‘কারসন যা-ই লিখবেন, আমি তা-ই পড়তে প্রস্তুত।’ 
বুকারজয়ী ঔপন্যাসিক মাইকেল ওনডাতজে অ্যানা কারসনকে সমসাময়িককালে ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে ‘উত্তেজনাময় কবি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। 
আয়ারল্যান্ডের বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক কলম তোইবিন বলেছেন, ‘কারসন যদি স্রেফ একজন গদ্য লেখকও হতেন, তাহলেও বিশ্ববাসী তাঁকে একজন ক্ষণজন্মা প্রতিভাধর হিসেবে স্বীকৃতি দিত।’ পণ্ডিতদের সঙ্গে আমরা অহেতুক দ্বিমতপোষণ করি না। 
তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য পড়ানোর কারণে তাঁর কবিতায় সাপ্পো বা ইউরিপিদিসের মতো প্রাচীন কবিদের মিথ ও দর্শনের আধুনিক রূপান্তর ঘটেছে। পণ্ডিতদের মতে, তিনি চিন্তাভাবনা করা বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে একটি সাহিত্যিক আঙ্গিকে রূপান্তর করতে সক্ষম। আমরা দেখেছি, কারসনের কবিতা স্রেফ গৎবাঁধা কবিতা নয়। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, ফিকশন, নাটক এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাকে একসাথে মিশিয়ে এক ধরনের ‘হাইব্রিড গদ্য-কবিতা’ তৈরি করেন। তাঁর উপরিউল্লিখিত ‘Autobiography of Red’ হলো কবিতায় লেখা একটি আস্ত উপন্যাস। সর্বশেষ প্রকাশিত রংনর্মা বইয়ের কয়েকটি অংশের কথা তুলে ধরা যায়।
জোসেফ কনরাড ও রেস্তোরাঁর বিল যে গল্প তাতে কথক নিজেকে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক জোসেফ কনরাডের সাথে গুলিয়ে ফেলেন এবং তাদের জীবনের স্মৃতি একাকার হয়ে যায়। সেখানে একটি রসাত্মক দৃশ্য আছে; যেখানে তিনি ভাবেন: ‘আমি যদি জোসেফ কনরাড হিসেবে কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে বিল না দিই, তবে সেই দোষ কার নথিতে জমা হবে?’ 
‘আকাশের জবানবন্দি’ গল্পে স্বয়ং ‘আকাশ’ এক সপ্তাহের ডায়েরি লেখে। সেখানে মহাজাগতিক ওলটপালট, পারমাণবিক ফিশন, নুড়িপাথরের সাক্ষাৎকার এবং প্রখ্যাত নাট্যকার স্যামুয়েল বেকেটের (যাকে গল্পে ‘রাস্টি’ নামে ডাকা হয়েছে) সাথে আকাশের কথোপকথন উঠে আসে। খুবই ইন্টারেস্টিং এ ধরনের কাহিনি।
আরেকটি ইন্টারেস্টিং কাহিনি গড়ে উঠছে দার্শনিক ও কবির ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ নিয়ে। ১৯৬৬ সালে জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার (যিনি নাৎসি সমর্থক ছিলেন) এবং রোমানিয়ান-ইহুদি কবি পল সেলান (যার পিতামাতা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে মারা যান)-এর মধ্যকার বিখ্যাত ও বিতর্কিত পাহাড়ি কুটিরের সাক্ষাৎকারের ঘটনাটি অ্যানা কারসন তাঁর নিজস্ব কল্পনায় গল্পাকারে ফুটিয়ে তুলেছেন।
অন্যত্র গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের তাঁর বন্ধু ক্রিতোকে দেওয়া বিদায়ী ভাষণকে কারসন অত্যন্ত আধুনিক ও খামখেয়ালি রূপ দিয়েছেন, যেখানে সক্রেটিসকে দেখতে কিছুটা ছোট সোনালি চোখের ‘বব ডিলান’-এর মতো মনে হয়! 
গুয়ান্তানামো বে ও রাজনৈতিক বন্দি একটি অংশে গুয়ান্তানামো বে কারাগার থেকে আসা চিঠি এবং সেখানকার বন্দিদের বন্দিদশার মনস্তাত্ত্বিক গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা বৈশ্বিক রাজনীতি ও মানবিকতার এক অন্ধকার দিককে স্পর্শ করে। 
এছাড়া রয়েছে বরফের রঙের ওপর সংক্ষিপ্ত ধ্যান, দারিদ্র্য নিয়ে বিশেষ কবিতা, শনিবারের রাতের একাকিত্ব এবং কারসনের নিজের বাবার স্মৃতি নিয়ে লেখা কিছু আবেগঘন খণ্ড-গল্প। 
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি এমন এক বই যেখানে একই সাথে রুশ গুন্ডা, যিশুর পা, গুয়ান্তানামো কারাগার এবং বিখ্যাত লেখকদের পরাবাস্তব উপস্থিতি খুঁজে পাবেন পাঠক আর পড়ে যাবেন অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে।
 একথা বললে সত্যের অপলাপ হবে এই যে অ্যানা কারসন নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় আমি বেশ সন্তুষ্ট বোধ করছি। দশ বছর ধরে অপেক্ষা করছিলাম যে জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির ভাগ্যে কখন নোবেলের শিকে ছিঁড়বে। যখন বুঝতে পেরেছি গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার হাং কাং নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কারণে এ বছর নোবেল পুরস্কারকে আর দূর প্রাচ্যে পাঠানো হবে না, তখন থেকে আমি কমপক্ষে কুড়িজন কবি-সাহিত্যিকের লেখা পর্যালোচনা করে মেক্সিকোর বিখ্যাত লেখিকা ক্রিস্টিনা রিভেরা গাজার ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ইউরোপে এবার নোবেল যাবে না। নোবেল যাবে আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকাতে এবং মেক্সিকোর রিভেরা গাজার উপন্যাস আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয়েছিল। ‌
যাই হোক, অ্যানা কারসন নোবেল জিতে নিলেন। তাঁকে অভিনন্দন। 

আরও পড়ুন

×