আঙুল
অলংকরণ :: নাজিব তারেক
মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
শরতের প্রথম হাসনাহেনার মায়াবিষ্ট প্রস্ফুটনের আসন্ন ব্রাহ্মক্ষণে মানুষেরা জানতে পারে–শহরের সর্বজনে চেনা বিড়ালচোখের দুরন্ত, চঞ্চলা, সদা লাস্য যার সালংকার; অম্বিকাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট, রাইচরণ রায় লেন আর মওলানা মৈজদ্দি কোরেশী রোডের বিকেলগুলো যার সাইকেলের গজানো পেখমের পরশে বিহ্বলিত হয়, আর তার সাইকেলের সামনের ঝাঁকিতে মাখমের ভাস্কর্যের মতো মগ্ন বসে মেঘ-নরম রঙের ডোরাঙ্কিত বিড়ালটি শহরের মানুষদের অবিরাম অভ্যর্থনা জানাতে থাকে–সেই বিড়ালওয়ালী, যে হয় অতিশয় উজ্জ্বলা কিশোরী, উদ্দীপ্তা; তার বিড়ালটি সেদিনই হারিয়ে যায় এবং বিড়ালটিকে সারা শহরময় খুঁজতে খুঁজতে কিশোরীর সাইকেলের সমস্ত পেখম খসে পড়লে শেষ উদ্ধার অভিযান হিসেবে বিড়ালওয়ালী কিশোরী–যাকে বয়স্ক-বৃদ্ধরা বিড়ালমাতা, বালক-বালিকারা বিল্লুরানী ও তরুণেরা বিড়ালসুন্দরী বলে সম্মোধন করে–সেই কিশোরী অমিত সাহসিকা, শহরের পরিত্যক্ত জঙ্গলাকীর্ণ ডাকঘরের ভেতরে ঢোকে, তখন বিকেলের মরা আলোর আঠালোতা চারদিকে। এবং সন্ধ্যা আরেকটু আরূঢ় হলে শহরের কতিপয় মানুষেরা শোনে প্রবল চিৎকার, হৃদয়বিদীর্ণ আহাজারি, আর তা হয় শহরের কতিপয় মানুষের শোনা বিড়ালওয়ালী কিশোরীর শেষ কণ্ঠস্বর। এর ঠিক কদিন আগে থেকে মানুষেরা দেখে–শহরের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী কপাল কাটা শরফুল্লাহ, সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো কুকুরের দল ত্যাগ করে প্রতিদিন সন্ধ্যা আসন্ন হলে পরিত্যক্ত ডাকঘরটির সামনে দাঁড়িয়ে মুখে অদ্ভুত এক ঘো ঘো শব্দ তোলে, তখন জঙ্গলাকীর্ণ পরিত্যক্ত ডাকঘরের ভেতর থেকে একদল শেয়াল বের হয়ে আসে এবং কপাল কাটা শরফুল্লাহ একটি থলি থেকে নানা রকম বিস্কুট, পাউরুটি বা মাংসের টুকরো ছুড়ে ছুড়ে দেয় আর শেয়ালগুলো লুটোপটি করে সেইসব খায়। মানুষেরা এই দৃশ্য দেখে প্রীত হয়, উৎসুকেরা মোবাইলে ভিডিও করে ফেসবুক ও ইউটিউবে ভাসায়, পত্রিকাতে সংবাদ ও টেলিভিশনের প্রতিবেদনে জানা যায়–শরফুল্লাহ এখন পশুপ্রেমিক এবং সে সমাজের প্রভূত কল্যাণসাধনে নিজেকে নিয়োজিত করতে চায়; কিন্তু শহরের মানুষেরা এতে খুব আশ্বস্ত হতে পারে না, কেননা আসন্ন পৌর নির্বাচনে পৌরসভার কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের প্রচারণা ফেস্টুনে মানুষেরা কপাল কাটা শরফুল্লাহর তরমুজের বিচিসদৃশ দাঁত কেলানো ছবি দেখতে পেয়ে তার শেয়ালপ্রীতি নিয়ে প্রশ্নাকুল হয়।
পরদিন সকালবেলা শহরের মানুষেরা দেখে বিড়ালওয়ালী কিশোরীর পেখমভাঙা সাইকেলটি পড়ে আছে পরিত্যক্ত ডাকঘরের সামনে এবং ময়নাতদন্তে আসা পুলিশের দল পরিত্যক্ত ডাকঘরের ভেতর তছনছ করে একটিও শিয়াল কিংবা বিড়ালওয়ালী কিশোরী কিংবা কিশোরীর মেঘ-নরম রঙের ডোরাঙ্কিত বিড়ালটির কোনো নমুনার হদিস পায় না; কিন্তু ডাকঘরের ওপরের আকাশে অসংখ্য কাক ও কালো-তমসা মেঘ ও বেশ কয়েকটি শকুনের বিক্ষিপ্ত উড়াল প্রত্যক্ষ করে। কাক, শকুন ও কদাকার মেঘে ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষেরা ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে চোখ ও মাথার মগজ উৎপাটনের ভয়াবহতা থেকে নিজেদের রক্ষাপ্রচেষ্টায় নীত হয় কিন্তু তাদের রক্ষা হয় না। তারপরের দিন যা ঘটে, তাতে শহরের মানুষেরা আরও ঘাবড়ে যায়। তারা আবিষ্কার করে–তাদের বাড়ির উঠোনে, বারান্দায় কিংবা ছাদে পড়ে আছে টুকরো টুকরো মাংসখণ্ড; কানে কানে সংবাদ প্রক্ষিপ্ত হয়, তাতে টেলিভিশনের প্রতিবেদকদের ও সাংবাদিকদের ভয়ংকর ব্যস্ততা বাড়ে এবং এলাকা পুলিশে পুলিশে ভরে যায়। চিরুনি তল্লাশির আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যায় অম্বিকাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট, রাইচরণ রায় লেন আর মওলানা মৈজদ্দি কোরেশী রোড। এই তিন গমনাগমন পথের সম্মেলন স্থলেই পরিত্যক্ত ডাকঘরের সম্মুখের একটি জীর্ণ দোতলা বাড়ির চিলেকোঠার এক রুম, এক রান্নাঘর, এক বাথরুম, ড্রয়িং-ডাইনিং নেই–চাকরির বদলি নিয়ে এমন একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে গত ১৭ দিন হলো ভাড়ায় এসেছে মাঝবয়সী অকৃতদার সরকারি পশু ডাক্তার আলী আতোয়ার। অবশ্য সে যে এইভাবে অনন্ত অকৃতদার থেকে গেল কীভাবে, একটা ছোট গোপন সাববাক্স খুলে বের করে আনা অশ্রুদরিয়ায় প্রতি রাতে অকূলে ভাসে আর ভেবে ভেবে আজও সে বিমনা ও বিষণ্ন হয়; আফসানার সাথে দিনক্ষণ নির্ধারিত বিবাহবসন্ত যে তার জীবনে কেন এলো না! আফসানা, মাধবীলতার মতো সর্পিল আফসানা, শারদীয় মেঘের ভাস্কর্য আফসানা, বহমান পাহাড়ি নির্জন নদীর মতো আফসানা, কলেজের করিডোরে চৈত্রদুপুরের নৈঃশব্দ্যের প্রতিমা আফসানা, আফসানা আফসানা আফসানা–কেন? গোপন সাববাক্সে আফসানার জন্যে কেনা বিয়ের শাড়ি-চুরি-স্নো-পাউডার-আলতা-নখরঞ্জক ও বিবিধ সজ্জাসরঞ্জাম–আজও আলী আতোয়ার বয়ে নিয়ে বেড়ায়; সে হয় একজন সদাশয় নিরীহ, মাঝবয়সী, সরকারি পশু ডাক্তার।
প্রতিদিনই সন্ধ্যা নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়ে বদলি হয়ে আসা নতুন এ শহরে আলী আতোয়ার ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিরুদ্দেশ হাটে কিংবা কখনও কখনও শহরের সিঁথিতে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটির নির্জন অন্ধকারে পাড়ের ঘাসে শুয়ে আকাশের নক্ষত্রদের সে নিকটে ডাকে, কিন্তু তাদের সাথে কোনো সংলাপ বিনিময় করে না; মৌনতার ঘন বৃত্তের মধ্যে বন বন করে ঘুরে ঘুরে ক্লেদক্লান্ত, সে ঘরে ফেরে এবং গোপন সাববাক্স খুলে একে একে বিয়ের শাড়ি-চুরি-স্নো-পাউডার-আলতা-নখরঞ্জক বের করে নদীপারের রাতের নক্ষত্রদের বিভোর দেখার মতোই সমস্ত সজ্জাসরঞ্জামের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে কোনো কোনো দিন সে শোনে–রাতের বয়স্ক পাপড়ি ঝরার শব্দ, কোনো কোনো দিন শেষ রাত্রির কোনো করুণ পাখির বিধুর ডাক আর আসন্ন সূর্যের হুইসেল। কিন্তু আজ সে পড়েছে আমিষের চক্রান্তে–অফিস থেকে বেরিয়ে শহর প্রদক্ষিণ শেষে রাত ঘন করে ঘরে ফেরার সময় শহরের পুরোনো মেথরপট্টির মাথার সড়কে প্রকাণ্ড ছাতিম গাছের তলায় আলো-আঁধারিতে দাঁড়ানো খোলা ভ্যানটির দিকে অনিবার্যই চক্ষুসংযোগ করে এবং আবিষ্কার করে প্রতিদিনের মতোই ভ্যানের ওপরে সাজানো রয়েছে ছাগলের কয়েকটি কর্তিত মাথা আর মাংস চুরানোর ডাসা হাতে ভাস্কর্যপ্রায় বৃদ্ধ কসাই, একা, বসে। আলো-আঁধারিতে ছাতিম যেমন একা, সেই মতো খোলা ভ্যানটি একা, বৃদ্ধ কসাই একা, মাংস চুরানোর ডাসাটি একা, আর একা রাত্রি ও কর্তিত ছাগলের মাথার জ্বলতে থাকা ম্রিয়মাণ মৃত চোখগুলো। প্রায় দিনই কমবেশি আলী আতোয়ারের জিহ্বা কিছুটা রসাসিক্ত হয় আমিষের আহ্বানে–যে একটা ছাগলের মাথা কিনে চুরিয়ে নিয়ে রুমে ফিরে খুব যত্ন করে ভুনা করে খাবে এবং ছাগলের মস্তিষ্কের শিমুল তুলো-দলার মতো ঘিলুর অমৃত ভুনা, খাবে; তা সে বরাবরই সংযম করে এবং উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু আজ আমিষপঙ্কিলে হলো পতিত–জিহ্বাকে শাসন করবার অভিপ্রায় তার হলো না অনেকটাই। ছাগলের মাথার ভুনা মাংসের জন্য তার উদর যে রূপে হলো উদগ্র, মনও সেই রূপে হলো কল্পনাতাড়িত–খুব রসিয়ে রসিয়ে রাতভর খাসির মাথার মাংস ভুনা করছে আফসানা আর অফিস ফেরত আলী আতোয়ার দিনের বাসি পত্রিকা পড়ছে দুলতে জানা অরূপ এক আরামকেদারায় বসে। দিনের পৌরবাজারের চেয়ে মেথরপট্টির মাথার সড়কে প্রকাণ্ড ছাতিম গাছের আলো-আঁধারিতে ছাগলের মাথার মাংসের দাম অনেকটাই কম দুর্মূল্যের বাজারে। মাত্র দুইশ টাকায় কেনা ছাগলের মাথাটি বৃদ্ধ কসাই যখন চুরাচ্ছে, আলী আতোয়ার ভ্যানের ওপরে রাখা আরও বেশ কয়েকটি ধড় বিচ্ছিন্ন ছাগলের মাথার দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থাকে এবং দেখে–ছাগলের মাথাগুলো নীল রঙের এক ধরনের ঘাস চিবুতে চিবুতে ভ্যানের ওপর থেকে ব্যাঙের মতো প্রথমে লাফিয়ে পড়ে সড়কে, তারপর ধীরে ধীরে মাথাগুলোতে উঁচিয়ে থাকা শিংগুলো রুখপাখির কিংবা উড়োজাহাজের ডানার বিস্তার পেয়ে উড়ে উড়ে অন্তরীক্ষের দিকে চলেছে আর তারা সংখ্যা থেকে সংখ্যাধিকে পরিণত হয়ে ঢেকে ফেলছে রাতের আকাশের নক্ষত্রমালা।
ছাগলের মাথার মাংস নিয়ে চিলেকোঠার ঘরে ফিরে আজ আলী আতোয়ার মাংসের ব্যাগটি রান্নাঘরে রেখে গোপন সাববাক্সটি খুলে গত পঁচিশ বছর বয়ে বেড়ানো ভাঙা বিয়ের শাড়ি-চুরি-স্নো-পাউডার-আলতা-নখরঞ্জক ও বিবিধ সজ্জাসরঞ্জাম বের করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর নৈমিত্তিক স্বগতকথনের মতোই–আফসানা, খাসির মাথার মাংসটুকো খুব ভালো করে ধুয়ে কষিয়ে ভুনা করো না প্লিজ। রান্নাঘর থেকে আফসানার প্রত্যুত্তর আসে না, কোনোদিন আসবে না–তা আলী আনোয়ারের জানা; আসে কয়েকটি টিকটিকির করুণ ডাক। অতঃপর, রান্নাঘরে, সে নিজেই। পলিথিনের ব্যাগ থেকে ছাগলের মাথার মাংস একটা মাজারি সাইজের গামলাতে ঢেলে সিঙ্কের জলে কচলিয়ে সযতনে ধুতে থাকে। কচলিয়ে কচলিয়ে সযতনে, যেন ভূপৃষ্ঠের সুগভীর তলদেশ থেকে তুলে আনা আকরিক সোনা ধুয়ে পরিষ্কার করছে। হঠাৎ মাংসের টুকরোর ভেতরে সে একখণ্ড লম্বাটে মাংসখণ্ড আবিষ্কার করে, যা ছাগলের মাথার মাংসখণ্ডগুলোর আকার থেকে ভিন্ন, সরু ও লম্বাটে। পলকেই, আবিষ্কারে ক্ষণবিলম্ব ঘটে না তার–এ তো চাক্ষুষ, মানুষের কর্তিত আঙুল, নারীর; নিশ্চিত তরুণীর, হতে পারে করুণ কিশোরীরও–কচি ঢ়্যাঁড়শাকার, সরু ও অতিশয় কোমল; আর সেই কর্তিত আঙুলে এখনও টকটক করছে লাল নখরঞ্জক। এ কি আফসানার আঙুল? আফসানা, আফসানা, আফসানা–কোন নিষ্ঠুর আততায়ী, বীভৎস জল্লাদ কেটে ফেলেছে তোমার আঙুল? আফসানা আফসানা–আমার প্রিয়তমা, আমার মা, আমার করুণ কন্যা...। মূর্ছিত আলী আতোয়ার হাঁটু গেড়ে বসে পরে গোপন সাববাক্সের সামনে, বিবিধ সাজসরঞ্জামের ভেতর থেকে বের করে আনে আফসানার জন্য কেনা নখরঞ্জক। হঠাৎ সেই সময় ঘরের জানালা গলিয়ে একটা বাদুড় ঢুকে পড়ে। রাতাকানা বাদুড় ঘরের ভেতরে নিরুদ্দেশ, বন বন করে ঘুরতে থাকলে আলী আতোয়ার সচেতন হয়, নখরঞ্জকসজ্জিত কর্তিত আঙুলটি সে শক্ত করে ধরে; ছোঁ মেরে রাতকানা বাদুড়টি যেন নিয়ে যেতে না পারে তার আগেই সযতনে আঙুলটি সে লুকিয়ে রাখতে চায়, খুব গোপনে। এবং তার অফিসের ব্যাগ থেকে আজকের পুরোনো পত্রিকাটা বের করে, ভেতরের একটি পাতা ছিঁড়ে কাগজে আঙুলটি মোড়াতে গিয়ে চোখ পড়ে পত্রিকায় মুদ্রিত একটি ছবিতে। অফিসের নানা ব্যস্ততায় কোনো দিনই অফিসে বসে পত্রিকার পড়া তার শেষ হয় না, অফিস শেষে শহরে নিরুদ্দেশ ভ্রমণের পরে বাসায় ফিরে রাত্রির অনন্ত সময়ে ঢুকে সে পত্রিকার শব্দদের কাছে সমর্পিত হয়; কখনও কখনও নানা সংবাদ স্কুল পরীক্ষার্থীর মতো ভোর পর্যন্ত পড়ে পড়ে মুখস্থ করে। মুদ্রিত ছবিটাতে বিড়াল কোলে এক কিশোরী–ত্বরিত মনে করতে পারে এই তো, দুদিন আগেই এই ছবির মেয়েটি, চঞ্চলা কিশোরী আলী আতোয়ারের সরকারি পশু চিকিৎসালয়ের চেম্বারে গিয়েছিল তার বিড়ালের ফ্যালাইন প্যানলিউকেনিয়া রোগ নিয়ে। ঠিক তার পরের দিনই কিশোরীর বিড়ালটি হারিয়ে যায় এবং আলী আতোয়ার পত্রিকায় আরও পরে–শহরের জঙ্গলাকীর্ণ পরিত্যক্ত ডাকঘরের ভেতরে বিড়ালটি খুঁজতে গিয়ে কিশোরী নিজেই নিখোঁজ হয়। ডাকঘরের বাইরের রোয়াকে তার পেখমভাঙা সাইকেলটি বাদে বিড়াল কিংবা বিড়ালওয়ালী কিশোরীর কোনো নমুনা আবিষ্কার করতে পারেনি পুলিশ, কেবল শহরের কতিপয় মানুষের কানের পর্দায় এখনও আঘাত করছে কিশোরীর আর্তনাদ, শেষ স্বর। আর আজ সকালে শহরের নানাবাড়ির উঠোনে, বারান্দায়, ছাদে মানুষেরা টুকরো টুকরো মাংসের দলা খুঁজে আবিষ্কার করে এবং ডাকঘরের ওপরের আকাশে কদাকার ও করুণ তমসাক্রান্ত মেঘের ভেতরে অসংখ্য কাকের উড়ন্ত হল্লা ও অশ্লীল উল্লাস এবং অবলুপ্ত বেশ কয়েকটি বৃকোদর শকুনের উপস্থিতি দেখে গাড়ি গাড়ি পুলিশ এসে ভরে যায় এলাকা, প্রতিটি বাড়ি খানাতল্লাশি করে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘটনাসূত্র আবিষ্কারে ব্যর্থ হয়।
আলী আতোয়ার বাম হাতের করপুটে কর্তিত আঙুলটি শক্ত করে ধরে পত্রিকাটি ডান হাতে উঁচিয়ে বাদুড়টাকে তাড়িয়ে ঘর থেকে বের করার কসরত করে অনেকক্ষণ। ইঁদুর-বিলাই খেলায় ক্লান্ত হতে হতে সে আবিষ্কার করে বাদুড় নয়, এটি আসলে একটি ডানাওয়ালা বিড়াল। এমন একটি বিড়ালই তো কিশোরীটি সযতনে জড়িয়ে ধরে তার চেম্বারের চেয়ারে বসেছিল। আলী আতোয়ার খুব করে মনে করবার চেষ্টা করে–তখন কি কিশোরীর মৃন্ময় আঙুলগুলো নখরঞ্জক সজ্জিত ছিল? হয়তো ছিল। একটু আগেই যেন সে নখরঞ্জক মেখে আঙুলে, তার প্রিয় বিড়ালটিকে আরোগ্য প্রার্থনায় এনেছিল পশু হাসপাতালে।
অনেকক্ষণ উদভ্রান্ত উড়ে ডানাওয়ালা বিড়ালটি ঘরের সিলিং ফ্যানে বাড়ি খেয়ে ছিটকে পরে আলী আতোয়ারের মেলিয়ে রাখা গোপন সাববাক্সের ভেতরে। রক্তাক্ত হয়ে যায় বিয়ের শাড়িটি–এই শাড়িতেই আফসানার বধূ সাজবার কথা ছিল। কিন্তু বিয়ের আগের দিন সকালেই আফসানাদের বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ে, ঘন তেঁতুল গাছের তলায় নগ্ন-উদ্ভিন্ন, বিক্ষতযোনির আফসানার নিথর দেহটার সন্ধান পাওয়া যায়; আর তার কারণ অনুসন্ধান করতে পুলিশ শুধুমাত্র আবিষ্কার করতে পেরেছিল আফসানার গোপন ডায়েরির পাতাতে একটি লাইন–আইনু কাকা, তোমাকে আমার খুব ভয় করে, জঘন্য তোমার চোখ...।বিড়ালওয়ালী কিশোরী ও তার বিড়াল নিখোঁজ হওয়ার পর সন্দেহভাজন অধুনা পশুপ্রেমিক শহরের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী কপাল কাটা শরফুল্লাহকে কোথাও যেমন খুঁজে পায় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকর্তারা, আইনুকেও–আফসানার প্রতিবেশী আইনু কাকাও নিজেকে এমন গোপন অণুতে রূপান্তরিত করেছিল যে আইন-আদালতের চোখ অতিসূক্ষ্ম মাইক্রোস্কোপেও কোনোদিনই আর সন্ধান করতে পারবে না তার। বরং বাতাস যেভাবে হারিয়ে ফেলে বিড়ালওয়ালী কিশোরী ও তার বিড়ালের গন্ধ, তেমনি আফসানাদের পারিবারিক কবরস্থানের হাসনাহেনাও আফসানার নামে গন্ধ ছড়াতে ভুলে যায়। ভোলে না আলী আতোয়ার। আজও গোপন সাববাক্সে আফসানার খণ্ড খণ্ড প্রতিমামূর্তি। চুড়ি-স্নো-পাউডার-আলতা-নখরঞ্জক বিবিধ সজ্জাসরঞ্জাম, বিয়ের শাড়ি...।
সেই রক্তাক্ত শাড়িটি থেকে তুলে বিক্ষত বিড়ালটিকে আলী আতোয়ার জানালা দিয়ে বাইরে ফেলতে গিয়ে দেখে–তার বাসার নিচেই পায়চারি করছে একদল পুলিশ। সে শব্দ করে জানালা বন্ধ করে দেয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ়–নিচে পুলিশ, ঘরে বিক্ষত ও মৃত বিড়াল আর একটা কর্তিত আঙুল–নারীর, তরুণীর, কিশোরীর, হতে পারে আফসানার; আফসানা, আফসানা, আফসানা। পুলিশ যদি উঠে তার ঘরে এই মৃত বিড়াল ও কর্তিত আঙুল পায়? দিগভ্রান্ত হয়ে পড়ে সে। দ্রুত রান্নাঘরে, চপার ও ধারালো ছুরি। মৃত বিড়ালটিকে টুকরো টুকরো। তারপর খাসির মাথার মাংসের সাথে। চুলায়, কড়াইয়ে টগবগ। আর ওই নখরঞ্জক সজ্জিত কর্তিত আঙুল, সেটাও কি দিয়ে দেবে কড়াইয়ে? তখন, খটখট। কড়া নাড়া, তার দরজায়। পুলিশের বুটের শব্দ।
ধারালো ছুরি ও চপার। চপারে তার বাম হাতের আঙুলগুলো।
পুলিশের বুটের শব্দ। কড়া নাড়া, খটখট। ধারালো ছুরি ও চপার। আঙুল...রক্ত...
- বিষয় :
- গল্প