ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

লাসভেগাসের রাত

লাসভেগাসের রাত
×
×

রাতের আলো ঝলমলে লাস ভেগাস

মাহমুদ হাফিজ

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রায় মধ্যরাতে ম্যাককারান এয়ারপোর্টে যখন নামি, লাস ভেগাস স্ট্রিপে তখন সবে সন্ধ্যা! আকাশ থেকে নেমে আসা উন্নতবক্ষা ডানাকাটা পরী-অপ্সরীদের কলহাস্য, হাইহিলের খটখট আর ধনকুবেরদের কোটি টাকার বাজিতে উন্মাতাল এ আলোকনগরী। কাকদ্বীপের কবিবন্ধু কাব্যে বলেছিলেন ‘সন্ধ্যার সঙ্গী ঠিক করে দেবে রাতের চরিত্র’। তেমনি মদিরায় বুঁদ হয়ে ঢুলঢুলে চোখে যৌবনধর্মের মৌতাতে মগ্ন নগরীটি জেনে নিতে চায় রাতের চরিত্র। দিনের আলোর বিপরীতে রাতজাগা লাস ভেগাস এক ভিন্ন দুনিয়া। এক রাতের গুজরানে যদি দেখতে পাই বিশ্বখ্যাত নগরীর রাতের চরিত্র, মন্দ কী!
পরিচয় বন্ধুতার জেরে এয়ারপোর্টে যার আসার কথা, তিনি আসেননি কাজে ব্যস্ত বলে। থ্যাংক গড, ব্যস্ততার বিষয়টি খুদে বার্তায় জানিয়ে দিয়েছেন। এ নগরে নবাগত আমাকে সঙ্গ দিতে এসেছেন আরেক বন্ধু। মালয়েশিয়ার বিশ্বপ্রবাসীদের সম্মেলেন তাঁর সঙ্গে একবারের জন্য পরিচয় হয়েছিল। তাঁকে এক বন্ধু কবি জানিয়ে দিয়েছেন এই বলে– বেখবর পর্যটক ওই নগরীতে পা রাখতে যাচ্ছে। তার খেয়াল রাখা ভালো! সে মতে, বন্ধুটি এয়ারপোর্টে হাজির! অবতরণের পর ‘জাস্ট ল্যান্ডেড অ্যাট ম্যাককারান’ বলে বার্তা দিতেই ফিরতি বার্তা, ‘৯ নম্বর ব্যাগেজ ক্লেইমে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছি। চলে আসুন।’
এই বিমানবন্দর দিয়ে ফ্লোরিডা যাওয়ার পথে দিনের তিনটি ঘণ্টার পার করায় ছোট্ট এয়ারপোর্টটি মুখস্থ। নেমেই ত্বরিত লাগেজ ক্লেইমে পৌঁছে দেখি বান্দা হাজির। 
ট্যাক্সিতে ওঠার পর বন্ধুটি বলে ‘বেলিজ’। ট্যাক্সি চলতে থাকে। অনুসন্ধানী পর্যটকের প্রশ্নে জানতে পারি, চালক ডানিয়েল, বাড়ি ইথিওপিয়ায়। ইথিওপিয়া শুনে মনে ভাবি সে মুসলিম হতে পারে। কিন্তু তার নাম শুনে আর কথা বাড়াইনি। বেলিজ মানে ‘বেলিজ রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো’র সামনে নামি। 
আমার চক্ষু চড়কগাছ। এ কী দেখছি! সিডনির ক্যাসিনো দেখেছি, নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটি, নিউইয়র্কের ম্যানহাটান, বাফেলোর নায়েগ্রা ফলস নানা দেশে ক্যাসিনো দেখেই ক্ষান্ত হইনি, স্লট-রুলেট-পাচিনকো থেকে কড়ি বের করে ছেড়েছি। কিন্তু এত আলোকমালায় ভেসে যাওয়া জাগ্রত নগরী তো কোনোদিন দেখিনি!
বেলিজ থেকে কয়েক কদম হাঁটলেই চোখে পড়ে আলোর আইফেল টাওয়ার। অবিকল। স্থপতি আইফেল দেখলে ভ্যাবাচ্যাকা খেতেন। চারদিকে আলোয় আলোয় লেখা পাঁচতারকা, সাততারকা হোটেল, বার, ক্যাসিনোর নামের ঝলক। ঝলকানো দুনিয়ায় কোন দিকটাকে ব্যাকগ্রাউন্ড বানিয়ে ছবি তুলব তা নিয়েই আমরা দিশেহারা। ভ্রমণবন্ধু এ নগরে দীর্ঘদিন থাকেন বলে তাঁর কাছে যা নতুন, আমার কাছে অভিনব। আমাদের ক্যামেরায় বিরামহীন ছবি উঠতে থাকে। ‘বালাজিও হোটেল’ বৃহত্তম ক্যাসিনোতে অগুনতি নারী-পুরুষ টেবিল ঘিরে কিংবা স্লট মেশিনে বসে ভাগ্যের পরীক্ষায় মেতেছে। লোভের হাতছানিতে আমরা স্লটের সামনে বসি। ভাগ্য আমাদের বিমুখ করে না, বরং এ রাতে খরচের জন্য কিছু নগদ নারায়ণ তুলে দেয়। স্লট। যতবার বসি ততবারই মেশিনের ঘুরন্ত ভাগ্যচাকা আমার কপালের দিকে নিশানা করে। দেখলাম, এভাবে বসে স্লটে স্পিন করতে থাকলে বালাজিও ফতুর হবে, আমারও ফেল হবে প্লেন। আমি এখানে অর্ধরাতের যোগী, আমাকে ফিরতে হবে। 
আমরা এই ক্যাসিনো ফ্লোরের ভিতরেই বিশ্বের সবচে’ সুন্দর পুষ্পপার্কে গিয়ে ছবি তুলি। এখানে আলো আর নানা ফুলের খেলা। নবদম্পতিরা তাদের বিয়ের ছবি তুলতে এখানে আসছে। দেশ-বিদেশের নানা পর্যটক ভরা কৃত্রিম পুষ্পপার্কটি। ছাদের নিচে এ রকম আলো সজ্জিত ফুলের সমারোহ আমি পর্যটক জীবনে কোথাও দেখিনি। 
বালাজিও থেকে আমরা ভ্যানেশিয়ান হোটেল ও শপিংমলে যাই। বিস্ময় মানি, হোটেলের বহুতলে গিয়ে নদী গন্ডোলা দেখে। আস্ত ভেনিস শহর উঠিয়ে এখানে বসানো হয়েছে। আগে ইতালির ভেনিসে গিয়ে যা দেখেছিলাম, তাই যেন চাক্ষুষ দেখছি লাস ভেগাসে। ধনকুবেররা এ শহরকে এমনভাবে সাজিয়েছে যে মিসরের পিরামিড, ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার, ইতালির ভেনিস কোনো কিছু বাদ রাখেনি। সব ল্যান্ডমার্ক এক জায়গা করে ডাকা হচ্ছে আনন্দপাগল ভাগ্যাকাঙ্ক্ষী প্রজাপতি আর ফড়িংদের। ভ্যানেশিয়ানের বহুতলে উঠে কৃত্রিম আকাশ, এর নিচে খাল ও নৌকা দেখে বিস্ময়ের অন্ত থাকে না। যাওয়া-আসার পথে একটি সোনালি কারুকাজময় প্রশস্ত হলকক্ষের ছাদ দেখিয়ে বন্ধু বলেন, এই ছাদের কারুকাজে ব্যবহৃত হয়েছে তাল তাল সোনা। বলি, বলেন কী! 
এ রাতে আর কী করলাম, কোথায় গেলাম, সে সবিস্তারের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে পরে ঘটে যাওয়া এক বিপত্তি!
সিয়াটলগামী ফ্লাইট ভোর ছয়টায়। ভোর সোয়া পাঁচটার মধ্যে বোর্ডিংগেটে উপস্থিত হতে হবে। সিকিউরিটি চেকিংয়েও লাইন দীর্ঘ হতে পারে। আমরা সাড়ে চারটার দিকে এয়ারপোর্টে ফেরার পরিকল্পনা করে সিজার আইল্যান্ড হোটেলের লবি থেকে ট্যাক্সি নিই। ত্রিশ ডলার ভাড়া পরিশোধ করে ট্যাক্সি ক্যাব থেকে পা বাড়িয়ে দিয়েই দেখি পকেটে মোবাইল নেই। ক্যাবচালক তখনও ড্রাইভওয়ে ধরে সামনে ফ্লাইওভারে উঠতে যাচ্ছে। ফোন ক্যাবে ফেলে ব্যাকপ্যাক নিয়ে নেমেছি, মুহূর্তে এ সংবিৎ হতেই ক্যাবের দিকে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করতে করতে পেছনে ছুটি, ততক্ষণে ক্যাব চোখের আড়ালে। 
ফোনের মধ্যে জীবনযাপনের সব তথ্য। বড় সমস্যা, যে বিমানে ওঠার জন্য এয়ারপোর্টে এসেছি, তার বোর্ডিং পাসও মোবাইলে। মোবাইলের বোর্ডিং পাসের বারকোড মেশিন দিয়ে স্ক্যান করে অতিক্রম করা যায় সিকিউরিটি গেট। বিমানে ওঠার চাবিও ওটিই। দু’বন্ধু ভোররাতে হতভম্ব হয়ে যাই। প্রাকফজরে আমরা আল্লাহ বলে বসে পড়ি। 
খানিক বাদে, ব্যাকপ্যাকের নোটবুকে লিখে রাখা টিকিটের কনফার্মেশন কোড খুঁজে পাই। বিমানবন্দরে স্পিড এয়ারলাইন্সের কিওস্কগুলো থেকে বোর্ডিং পাসটির রিপ্রিন্ট বের করতে পারি না। মোবাইল গেছে। কিওস্ক মেশিনটাও ‘বেতরাজ’ ভেতরে ঢুকতে দিতে। মোবাইলের বারকোড নেই তো আমার যাত্রী পরিচয় নেই!
অনেক কসরত করে স্পিডের কাউন্টারে পৌঁছাই। ফোন বিপত্তির কথা বলে কোনো রকমে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করি। বিলম্ব না করে বন্ধুর কাছে নিকটজনদের ফেসবুক আইডি দিই। আমার হয়ে তাদের বার্তা দিতে বলি– যাতে আমাকে পরবর্তী এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করা হয়। 
ভেতরে ঢুকে বড় রাগ দুঃখ হয়। বালাজিওর স্লট যে নগদ নারায়ণ ও পকেটে পুরে দিয়েছিল, বিমানের ওঠার অপেক্ষার সময় এয়ারপোর্টে বসানো স্লটকে তা একে একে বুঝিয়ে দিয়ে ঠান্ডা পকেটে বিমানে উঠি। 
২.
লাস ভেগাসবাসী বন্ধু কাজের কাজ যা করেছেন তা হলো, মেসেজ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, নিকটজনদের বন্ধুদের পোস্ট খোঁজ করে তার মন্তব্যের ঘরে আমার মোবাইলের হারানোর খবর দিয়েছেন। সিয়াটলে পৌঁছে আত্মজকে পেয়েই বুঝি, বন্ধুর বুদ্ধিমত্তা আমাকে এখানকার বিপর্যয় থেকে সুরক্ষিত করেছে। 
বাসায় ল্যাপটপ খোলার পর মাথায় আসে, গুগল লোকেশনের মাধ্যমে ফোনের হদিস পাওয়া যেতে পারে। দেখতে পাই, আমার লোকেশন দেখাচ্ছে এয়ারপোর্ট থেকে, নেমে শহর আর এয়ারপোর্টে বারবার ঘুরেছি, তারপর ‘ইয়েলো চেক স্টার কোম্পানির অফিস পার্কিংলটে’ অপেক্ষা করেছি ঘণ্টা পাঁচেক। সেটাই আমার ফোনের শেষ লোকেশন। গুগলে সার্চ করে ওই কোম্পানির অফিস হিসেবে একই ঠিকানা পাই। তাদের ওয়েবসাইটে ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ নামে একটি বিভাগ পাই, ক্যাবে ফেলে যাওয়া জিনিসের বর্ণনা লিখে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে সাবমিট করি। বন্ধুকে জানাই তাদের অফিসের ঠিকানা। কালবিলম্ব না করে লাস ভেগাস পোস্ট রোডের অফিসটিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মিসেস ইভেতির সঙ্গে দেখা করেন। জানা যায়, তারা বর্ণিত মোবাইল ফেরত পায়নি। পরে আমাকে ফোনে রেখে ইভেতির সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন সুজন বন্ধু। আমি ফরম সাবমিট করে রণে ভঙ্গ দিলেও ভেগাসি বন্ধু ক্ষান্ত দেননি। তিনি আশাবাদী মানুষ। নিরন্তর চেষ্টা করেছেন নানাভাবে। 
২২ অক্টোবর ওয়াশিংটন স্টেট থেকে অরেগন যাচ্ছি। ফোন এলো ছেলের মেসেঞ্জারে। ফোন ধরতেই বন্ধুর কণ্ঠ: ভাই, ফোন পাওয়া গেছে। দ্রুত ইভেতিকে ফোন করেন। ওরা প্রুফ চাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে কল করি। এটাই যে আমার ফোন তার প্রমাণ চায়। প্রমাণ হিসেবে বলি, ফোনে এ রকম দুটি সিম আছে, সিমের ওপরে এ রকম সিম্বল, ফোনে কিছু ছবি ইত্যাদি। ইভেতি কনভিন্সড হয়ে ফোন আমার বন্ধুর কাছে দিতে চায়। বন্ধু সে ফোন সংগ্রহ করেন। এরপর এক স্টেট থেকে আরেক স্টেটে পাঠানোর পালা। তিনি বিশেষ যত্নে প্যাকেজ করে প্রায়োরিটি মেইলে পাঠিয়ে দেন আমার ঠিকানায়। ফোনটি অক্ষত অবস্থায় আমার হাতে এসে পৌঁছালে চোখের কোনায় অশ্রু চলে আসে। 
লাস ভেগাসের এই বন্ধুর নাম সিকদার গিয়াস উদ্দিন। 
সিকদার গিয়াস উদ্দিনরা আছেন বলে পৃথিবীর কতশত দুঃস্বপ্নময় রাতের পর ফিরে আসে সুকুমার বৃত্তির জয়। ধনবান দেশে দীর্ঘদিন অবস্থান করেও তাঁর বা তাদের মন পড়ে থাকে দেশের সোঁদামাটি গন্ধে, তৃণে, বৃক্ষ লতায়। তারা দেশের অর্থনীতির উড্ডয়নে উল্লসিত হন, খারাপ কিছুতে ব্যথিত হন। দেশ ও মানুষের উন্নয়ন-বিকাশের  স্বপ্ন হৃদয়ে লালন করে হয়ে ওঠেন লাল সবুজের গর্বিত দূত। 

আরও পড়ুন

×