ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প: শৈলী ও নির্মিতি

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প: শৈলী ও নির্মিতি
×
×

[১৮ জানুয়ারি ১৯৫১– ১০ অক্টােবর ২০২৫]

মোজাফ্‌ফর হোসেন

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

গল্পকথনের ঐতিহ্যকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ছোটগল্পে অভিনব এক আখ্যানশৈলী তৈরি করেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। প্রথাকে সঙ্গে নিয়েই প্রথাগত গল্প থেকে তাঁর আলাদা পথে হাঁটা। পরিপূর্ণ নিরীক্ষাধর্মী বলা যাবে না। পড়তে পড়তে মনে হবে এই কথনশৈলী আমাদের জানা, কিন্তু এভাবে এই প্রথম পড়ছি! 
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্মের লেখক। তাঁর গল্প নিয়ে আলোচনার সময় মনে রাখা প্রয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের আগে বাংলাদেশের সাহিত্যের একটা বিরাট অংশ রচিত হয়েছে সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে। এ পর্বের ছোটগল্পে মোটাদাগে নির্মিতির চেয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বক্তব্য।
তবে আশির দশকে এসে ছোটগল্পে নিরীক্ষা ও নির্মিতির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এ পর্বের সবচেয়ে আলাদা ছোটগল্পকার হলেন শহীদুল জহির। শহীদুল জহির অধিকাংশ সময় গল্পটা বলেন সমষ্টির বয়ানে। প্রায় কাছাকাছি অবস্থান থেকে আরেক ধরনের গল্প লিখেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। দুজনের গল্পই বাংলার লোকায়ত জীবন ও গল্পের মৌখিক রীতি থেকে অনুপ্রাণিত। কিন্তু সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পে ঐতিহ্যগত নির্মাণশৈলীটা শিথিল হয়নি, বরং আরও মজবুত হয়েছে। তাঁর গল্পের কথককে আমরা চিনি, অধিকাংশ সময় লেখক নিজেই, অর্থাৎ প্রথম ব্যক্তির বয়ানে বর্ণিত। গল্পটা কিছুদূর এগোতেই তিনি পাঠককেও সেই গল্পের ন্যারেটর হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেন। কোনো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি পাঠকের মতামত চান। কখনও কখনও সমাপ্তিতে এসে পরিণতি হিসেবে একাধিক অপশন দিয়ে দেন পাঠকের জন্য। এটা বাংলা গল্পের লৈখিক রীতি থেকে আসেনি। এসেছে মৌখিক রীতি থেকে। গল্পের কথ্য-ঐতিহ্যে কোনো গল্প একক অবদান থেকে তৈরি হয় না। এটা এক ধরনের কালেকটিভ অ্যাফোর্ট। যে যখন বয়ান করে সে তখন কিছু না কিছু যুক্ত-বিযুক্ত করে নেয়। সেই অর্থে গল্পের ন্যারেটর হয়ে ওঠে একক ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ (বহুস্বর অর্থে)। কিন্তু সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘আমরা’ আর শহীদুল জহিরের ‘তারা’ (মহল্লার লোকজন) গল্পের বয়ান ও গতিপথ নির্ধারণে এক রকম ভূমিকা পালন করে না।   
বিশ্বসাহিত্যের পণ্ডিত হলেও মনে রাখতে হবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গল্প লেখার প্রস্তুতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন শৈশবে-কৈশোরে শোনা রূপকথাকে। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি গল্প লেখার সঙ্গে গল্পকথনের ঐতিহ্যটা মেলাই। আমার গল্পে পাঠক সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। আমি সর্বজ্ঞ হলেও খুবই দ্বিধান্বিত। আমি নিজেকে গল্প লেখার ঐতিহ্যে স্থাপন করি না। আমার ঐতিহ্য গল্প বলার।’
গল্পের শুধু কাঠামো না, বিষয়বস্তু নির্বাচনেও তিনি চলে গেছেন বাংলার অন্তর্লোক ও গণমানুষের অন্তর্জগতে। নিজে আপাদমস্তক নাগরিক মানুষ। কিন্তু নাগরিক-ঠাট দ্বারা আক্রান্ত বলা যাবে না। তিনি নগর দিয়ে বাংলা বা বাংলাদেশকে চিন্তা করতেন না। তাঁর মানুষ ছিল বৃহৎ বাংলার মানুষ, গ্রামের মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ এবং মধ্যবিত্ত বাংলাদেশি। মানুষের সামাজিক অনাচার ও পীড়নের মধ্যে তিনি মনস্তাত্ত্বিক জায়গাটা উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন। তিনি গল্পটা লিখেছেন সমাজ ও মানুষ সম্পর্কে একজন বিদগ্ধ ভাষ্যকার হিসেবে তাঁর গৃহীত সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া হিসেবে।  
বিষয় নির্বাচনেও থেকেছেন সচেতন। বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে গল্প লিখেছেন। কিন্তু গল্পগুলো পূর্বনির্ধারিত না। তিনি পাঠককে বা আরেক অর্থে গল্পকে নিয়ন্ত্রণ না করে পাঠকের ওপর ছেড়ে দিয়ে গল্পের গতিপথ অনির্দিষ্ট করে তুলতে চেয়েছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘প্রথম থেকেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি দূরের কোনো পাঠককে লক্ষ্য করে লিখব না। আমার গল্পগুলো এতই জীবন থেকে নেওয়া যে সেগুলো মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজন। আমার পাঠক যদি আমার সঙ্গে থাকে তাহলে একসময় আমার গল্পে সে ঢুকে যেতে পারে। মালিকানাটা দাবি করতে পারে।’ 
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছোটগল্পের এই প্রবণতা বোঝার সুবিধার্থে একটা গল্প ধরে আলোচনা করতে পারি। ধরা যাক ‘একটি অসমাপ্ত গল্প’। এই গল্পটি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছোটগল্পের আখ্যানশৈলীর পাশাপাশি বিষয় উপস্থাপন ও দৃষ্টিভঙ্গির মৌল প্রবণতাকে চমৎকারভাবে ধারণ করেছে।    
গল্পটি শুরুই হয়েছে এভাবে, “এ গল্পটি বলতে গিয়ে আমার যে কী কষ্ট হয়! প্রেশার বেড়ে যায়। কতবার গল্পটি বলতে চেষ্টা করেছি, প্রধানত নিজের কাছেই। কী করব, আজকাল কারও ধৈর্য নেই গল্প শোনার। অমন সন্তের মতো মানুষ হাসনাত ভাই, সাহিত্য সম্পাদক, তিনিও বললেন আমাকে মাঝপথে থামিয়ে, ‘ও। গল্পটা মন্দ নয়।’ আমি তো অবাক। মাঝখান অব্দি গল্পটাতে কী আছে? আমি বেশ আহত হলাম। বুঝতে পেরে তিনি বললেন, ‘এ রকম গল্প প্রায়ই শোনা যায়।’ …আর হেলালকে বলতে গিয়ে তা আরও ফ্যাসাদ। সে বলল, ‘আমি এ রকম বিষয় নিয়ে একটা কবিতা লিখেছি’।” 
গল্পটা আলিমুজ্জামানের, শুরুর অংশটা না থাকলেও আলিমুজ্জামানের গল্পের কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তো গল্প লিখছেন না, বলছেন। বলা গল্পটাই যেন আমাদের লিখে শোনাচ্ছেন। এটা তাঁর কৌশল। আমরা সম্পাদক ও কবি আবুল হাসনাতকে চিনি বা হেলালকেও চিনি। আমরা নিজেরাও গল্পের পাঠক থেকে প্রত্যক্ষ শ্রোতার আসনে যুক্ত হয়ে যাই খানিক পরেই।
এই আখ্যানে ফিকশনের মধ্যে বাস্তব ঢুকে গেছে। আবার বাস্তবে ফিকশন ঢুকে গেছে। গল্পে লেখক নিজেও ঢুকে পড়েছেন। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পে নানাভাবে ঘটনাটি ঘটেছে। তবে তিনি উত্তরাধুনিক প্রবণতা থেকে এটি গ্রহণ করেননি, করেছেন গল্পের লোকায়ত ঐতিহ্য থেকে। ‘একটি অসমাপ্ত গল্প’-এর পরের অংশে সেটি আরও বেশি পরিষ্কার হয়। মূল গল্পে অর্থাৎ গল্পের প্রটাগনিস্ট আলিমুজ্জামানের গল্পে আমরা প্রবেশ করছি এভাবে: ‘আলিমুজ্জামান একটা দোনলা বন্দুক রাখে বাড়িতে। ভয় যে পাবেন, ঠিকই জানতাম, আলিমুজ্জামানের ভয়ে আপনি ভীত। কারণ তার হিট লিস্টে আপনিও আছেন। তার স্ত্রীর দিকে একদিন হলেও অপাঙ্গে তাকিয়েছিলেন, কারবালা মসজিদের পাশ দিয়ে যখন দশ নাম্বারের বাসে উঠতে যেত।…’
গল্পের এই অংশে গল্পের কথক মনোলগের ভেতর দিয়ে তাঁর শ্রোতার সঙ্গে কথা বলছেন। শ্রোতার জিজ্ঞাসা, অভিব্যক্তি কোনো কিছুই আমাদের অজানা থাকছে না। গল্পটি এ পর্যন্ত হাস্যরসাত্মক মনে হলেও সামান্য এগোলেই আমরা টের পাচ্ছি, মোটেও তা নয়। রীতিমতো দুর্বিষহ গল্প এটা। আলিমুজ্জামান পুলিশের দারোগা। মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার জন্য সে বখাটে ছেলেদের ধরে এনে আচ্ছামতো পিটিয়ে দেয়। এরপর থেকে মেয়ের সঙ্গী হিসেবে দেখা যেতে থাকে তার বড় ছেলেকে। বখাটে ছেলেরাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র না। এক সন্ধ্যায় থানার বাইরে চোর সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয় এক তরুণ। গণপিটুনির নেতৃত্বে সেই বখাটে বাহিনীর নেতা। পিটুনিতে মুমূর্ষু চোরকে থানায় নিয়ে আসা হয়। বিরক্ত আলিমুজ্জামান না দেখেই পুলিশকে বলে আরও কয়েক ঘা লাগিয়ে লকআপে নিতে। আলিমুজ্জামান তখনও জানে না মুমূর্ষু চোরটা আসলে তুষার, তারই পুত্র। 
তুষার কি বেঁচে থাকবে, নাকি থাকবে না? প্রশ্নটা তৈরি হতেই গল্পের কথক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একটু দম নেন। বুঝতে পারেন গল্পের শ্রোতা (পড়ুন পাঠক) নির্বাক হয়ে গেছে। পরিবেশটা ভারি ও বিষণ্ন হয়ে উঠেছে। এখানে এসে তিনি আরেকটা ট্রিক খাটালেন। গল্পের শেষটা তিনি ওপেন করে দিলেন। কেউ চাইলে তুষারকে মেরে ফেলতে পারে, কেউ চাইলে পারে বাঁচাতেও। গল্পকথকের আসনে বসে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলছেন: ‘তুষারের কী হল? আলিমুজ্জামানের কী হল? দুটি পরিণতির কথা বলি, যার যেটা ইচ্ছা বেছে নিন মর্জিমত, কী বলেন?’ বলে তিনি নিজেই দুটো পরিণতি বর্ণনা করে দিলেন। 
গল্পটি এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একজন অদৃশ্য শ্রোতাকে সঙ্গে নিয়ে গল্পটা শোনাচ্ছেন। আর তাঁর গল্প যেহেতু পূর্বনির্ধারিত কোনো আখ্যান না, তাই তিনি শ্রোতার অসন্তুষ্টি টের পেয়ে তাকেও যুক্ত করে নিলেন গল্পের পরিণতি পরিবর্তন কিংবা নির্ধারণে। গল্পকথক তাকে লক্ষ্য করে বললেন: ‘আপনার নিজস্ব একটা পরিণতি প্রস্তাব আছে? বলেন কী, ভাই, শিগগির দিন! এ পর্যন্ত আমার গল্প, তাতেও লোকজন শুনতে চায় না। এখন যদি আপনার পরিণতি তাদের মনে লাগে।’ 
গল্পের শ্রোতা এবার এই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেন নিজেকে। আমরা মনোলগের ভেতর দিয়ে জানতে পারি, আলিমুজ্জামানের ছেলেকে পেটানোর পেছনে আসল নাটের গুরু এই শ্রোতা নিজেই। গল্পকথক তখন প্রশ্ন করে, ‘কেন এত হৃদয়হীন আপনি, ভাই? ছেলেটা কী দোষ করেছে?’ 
দোষ আসলে ছেলের নয়, ছেলের বাবার। এই আলিমুজ্জামান একাত্তরের রাজাকার। শ্রোতার দুটি ছেলেকে ধরে নিয়ে গুলি করে মারে সে। সেই শোকে তাদের মা অর্থাৎ শ্রোতার স্ত্রী আত্মহত্যা করে। সেই প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে গল্পের সমাপ্তি বদলে যায়। গল্পের একেবারে শেষ বাক্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, এই গল্পে আরও দুজন শ্রোতা আছেন–আনিসুজ্জামান এবং হেলাল। তাদেরই একজন সবটা শোনার পর বলে ওঠেন: ‘ও! এ রকম গল্প কতই শোনা যায়।’ 
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সর্বাধিক পঠিত ও পাঠকপ্রিয় গল্প সম্ভবত ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’। এই গল্পেও সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের স্বকীয় আখ্যানশৈলীর স্বাক্ষর পাওয়া যায়। গল্পটির প্রথম অংশ শেষ হচ্ছে এইভাবে, ‘ইমান তাহলে কীভাবে বড় হল, তার দেখাশোনা কে করল, একথা জিজ্ঞেস করলেন? উত্তরটা, ভাই, আমার জানা নাই। হয়তো কোনো প্রতিবেশী, হয়তো কোনো আত্মীয়স্বজন।’ অর্থাৎ এ গল্পেও শ্রোতা সামনে আছে। এবং থেকে থেকে সে সক্রিয় হয়ে উঠছে। 
এ গল্পটিও করুণ স্বরের। একটা গল্পের মধ্যে আরেকটা গল্প চলে এসেছে। কোনটা মূল গল্প, সেই প্রশ্ন অমূলক। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গল্পের পিঠে গল্পগুলো এমন করে বলে যান, সেখানে কোনোটাই সাইড স্টোরি থাকে না, আবার কোনোটাই প্রধান গল্প হয়ে ওঠে না। অধিকাংশ সময় একটা গল্প থাকে স্বস্তির, কিছুটা হাস্যরসের খোরাক হিসেবে, কিন্তু তার সঙ্গে গেঁথে থাকে রক্তাক্ত এক পুথি। গল্পের উইট এবং হিউমার আমাদের মধ্যে হাস্যরস সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত ওই লাল পুথিটা আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে যায়। গল্প শেষ করার পরও তাই অনেকটা সময় ভার হয়ে থাকে মনটা। পরিণতিতে এসে অধিকাংশ সময় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কোনো কোনো চরিত্রের প্রতি পক্ষপাত দেখাতে চান না। যাকে হয়তো পাঠক গল্পের শুরু থেকে গ্রহণ করতে পারেনি, শেষে দেখা যাবে তার প্রতিও মায়া তৈরি হচ্ছে। 

আরও পড়ুন

×