অ্যান কারসন ও তাঁর কবিতা
বিষণ্ন মদির ভালোবাসা
আবদুস সেলিম
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩১ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
অ্যান কারসন (Anne Carson) যদিও একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, অনুবাদক এবং একজন ধ্রুপদ সাহিত্যের অধ্যাপক, তিনি মূলত কবি রূপেই অধিক পরিচিত। ৭৬ বছর বয়সী এই কানাডীয় কবি এবারের (২০২৬) সাহিত্য নোবেল বিজেতা।
আবেগে সংযত অথচ বুদ্ধিদীপ্ত কবিতা লিখতে তিনি পারঙ্গম এবং এর প্রধান কারণ, যুক্তিসংগতভাবেই তাঁর ক্লাসিক বা ধ্রুপদপ্রীতি ও দুর্বলতা। বলা হয়ে থাকে কার্লসনের রচনাতে কবিতা ও গদ্যের সীমারেখা চিহ্নিত করা যায় না। তাঁর লেখা একটি উপন্যাসকেও অনেক সময় কবিতার মতোই পাঠ করা সম্ভব। তাঁর কাছে ফরম আবেগের ধারক মাত্র নয়, ফরম আবেগের অংশও বটে– তাঁর সাহিত্যে ফরম এবং আবেগ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বলেই তাঁর গদ্য এবং কবিতার ভেতর কোনো বিভাজন করা সম্ভব নয়। তবে আমার নিচের অনূদিত কবিতার সবগুলোই কবিতা আকারে বা ফরমে রচিত, এবং আমার এই নির্বাচন কার্লসনের কবিতার একটি ভিন্ন দিক উন্মোচনের উদ্দেশ্যে। তাঁর কবিতা, তা সে গদ্য বা কাব্য ফরম, যে ফরমেই রচিত হোক, তাঁকে বিশেষায়িত করে একজন অসম্পূর্ণ, অব্যক্ত, আবেগ-অনিশ্চিত কবি রূপে। তাঁর কবিতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু একটিমাত্র নির্দিষ্ট সম্পন্ন ব্যাখ্যা দিতে চায় না। পাঠক হিসেবে আমরা সম্মুখীন হই নানা শূন্যস্থান, আকস্মিক চেতনার পরিবর্তন, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং অমীমাংসিত প্রশ্নের। আর এইসব মিলিয়েই প্রস্তুত হয় এক রহস্যঘন কাব্যভাষা। অনূদিত পাঁচটি কবিতাতে সেই রহস্য স্পষ্ট, যে রহস্য কার্লসনের কবিতাকে এক অনন্য উচ্চমাত্রা দিয়েছে। অনুবাদে গদ্য কবিতা সংযোজন না করার– যদিও তেমন কবিতা, প্রলুব্ধ হয়ে, আমি অনুবাদ করেছিও– পেছনে আমার মূল উদ্দেশ্য হলো, কাব্য ফরমে রচিত কবিতাতে অ্যান কার্লসনের ব্যতিক্রমী চরিত্রটিকে স্পষ্ট করা। সুধী পাঠকরা সেটা স্পষ্ট ধরতে পারবেন, বিশেষ করে তাঁর পঙ্ক্তিগুলো অসম্পন্ন স্থানে ভেঙে ফেলা এবং সেই সাথে আকস্মিক বিরাম চিহ্ন ব্যবহার করার কারণে–ফলে তাঁর বক্তব্য অসম্পন্ন থেকে যায় বলে ধারণা জন্মায়। পাঠকরা আপাতদৃষ্টে তাৎক্ষণিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও বক্তব্যের এক মুক্ত-ব্যাখ্যার সুযোগ পান যেটি যে কোনো শিল্পীর একান্ত নান্দনিক কাঙ্ক্ষা। প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে অ্যান কার্লসনের সাহিত্যকর্মের স্বতন্ত্র শৈলী, কণ্ঠস্বর, চিত্রকল্প বা সর্বোপরি ব্যক্তিত্ব দেয় কোন কাব্যপ্রতিভা? আমার মতে, কার্লসনের কাব্যশক্তির উৎস হচ্ছে তাঁর ধ্রুপদপাঠ ও জ্ঞান, আঙ্গিক নিরীক্ষা এবং আবেগের সূক্ষ্ম ও সুস্পষ্ট ইঙ্গিতকে সুচারুরূপে গেঁথে দেওয়ার ক্ষমতা। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে কার্লসনের সাহিত্যাকৃতির অনুবাদ প্রাসঙ্গিক হতে পারে দুটি কারণে– প্রথমত তাঁর সাহিত্যকর্ম অনুবাদকদের একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় এই প্রান্তিকে যে অনুবাদের কাজ হলো উৎসভাষা ও লক্ষ্যভাষার মধ্যবর্তী দূরত্বকে কী প্রকারে আড়াল করে পাঠকের কাছে বোধগম্য করা যায়। এ কাজটি কার্লসনের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় কারণটি হলো– তাঁর একান্ত কাব্যতত্ত্ব যে, সাহিত্য/কাব্যভাষার নান্দনিকতাকে আধুনিক করতে ধ্রুপদ শব্দ ও বাক্যবিন্যাসের সমসাময়িক প্রয়োগ একটি কার্যকর অনুষঙ্গ, সেই বিষয়টিকে অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা পাঠক এবং লেখকদের কাছে পরিচিত করা।
সেই ছোট্ট বিষণ্ন মদির ভালোবাসা
চোখমুদে তোমার সাথে সারারাত কাটাতে আমার দারুণ লাগে।
কী কপাল আমার– এই তো তুমি
নক্ষত্রের পথ পেরিয়ে হাজির!
আমি তো এসেছি
মন আর চিত্ত জোড়া লম্বা পথ পায়ে হেঁটে
আর
তুমি তো এখানে
হাঁটু মুড়ে পথের ধারে সারাইবাক্স রেখে
কী যেন মেরামতে ব্যস্ত।
আমাকেও একটা পৃথিবী দাও,
আমি নিজেই তো পৃথিবী ছিলাম,
তুমি তাকে দখল করে রেখেছো।
(মূল: O Small Sad Ecstasy of Love)
ব্রুকলিনের ঘর
এই
ঢিমে
দিন
চলমান
এই ঘরময়
আমি
শুনি
তার
দিনচক্রের
সচলতার শব্দ
এক পরিবর্তমান ঝিলিক
কড়িকাঠের
ওপর
আমার গভীরে
স্পর্শ করে
এক যৌনাত্মক
নীলহলুদ
আসক্তি
সময়ের কাঁটা
এগিয়ে চলে
প্রশস্ত
প্রান্তরে
আমার অপরাহ্ণে।
(মূল: Room in Brooklyn)
প্রচারণা নগরী
তোমার মৃত্যুর পর।
দিনগুলো সব ঝোড়ো ছিল।
প্রতিদিন।
আমাদের চারধারে দেয়ালের মতো।
আমরা একসাথে হেঁটেছিলাম।
পাশে মুখ ফিরিয়ে উচ্চকণ্ঠে কথা বলতেবলতে।
রাস্তায় চলতেচলতে।
ব্যাপারটা কোনো কাজে আসেনি।
আমাদের পরস্পরের দূরত্বটা।
বেশ অচিন হয়ে গেছিল।
মাঝের ফারাকটা কেমন সুনসান।
কিন্তু তবুও কেমন জানি অনড়।
এবং মলিন আর বেদনাবিধুর।
অনেকটা দুই দাঁতের ফোকর যেমন।
বুড়ি মহিলাদের মতো।
যে মহিলাকে তুমি জানতে।
বহু বছর আগে।
যখন সে ছিল।
প্রাসাদের আগুনের মতো শরীর বেয়ে ঝরে পড়া এক সুন্দরী।
(মূল: Apostle Town)
প্রেমনগরী
মেয়েটা ত্রস্তে এলো।
ভেজা ভুট্টার মতো।
সোনালি বেণি।
পিঠজুড়ে ছড়ানো।
(মূল: Love Town)
বাবার পুরোনো নীল কার্ডিগান
এখন রান্নাঘরের চেয়ারের পেছনে ওটা ঝুলছে
আমি যেখানে সব সময়ই বসি, আগেও অমন-ই ঝুলত
ঐ রান্নাঘরের চেয়ারের পেছনে যেখানে বাবাও বসে থাকত।
যখনই ওখানে আসি ওটা আমি গায়ে দিই,
যেমন বাবাও দিত, বুটজুতো থেকে
বরফকণা ঝাড়তেঝাড়তে।
অমি ওটা প’রে অন্ধকারে বসে থাকি।
আমি জানি, বাবা এমনটা করত না।
চাঁদের দেশ থেকে হাড়ভাঙা শীত আকাশ ভেঙে পড়ে।
তার জীবনযাত্রা ছিল একেবারে তার একান্ত।
কিন্তু আমি টের পেতাম কখন বাবা
তার গভীরে জীবনের নিয়মের বাঁকে অস্থির হয়ে পড়ত।
আমি প্রতিদিন এসে দেখতাম বাবা দাঁড়িয়ে গাড়িবারান্দায়।
গায়ে নীল কার্ডিগান গলা অবধি বোতাম আঁটা।
খারাপ লাগত জুলাইয়ের গরমের কারণে নয়
আসলে তার চাউনি দেখে–
মনে হতো এক বাচ্চাকে কোনো এক খালা সাতসকালে জামাকাপড় পরিয়ে
অনেক দূরে কোথাও যাবার জন্য তৈরি করেছে
হয়তো কোনো ট্রেনে চড়তে, কিংবা ঝোড়ো প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করতে
লম্বা সময় বসে তাকে কাটাতে হবে চেয়ারে
আর আঙুলের মতো লম্বা ছায়াগুলো
খড়ের গাদার ওপর দিয়ে ঝলকে পার হয়ে যাবে
পেছন ফিরে বসে থাকা
বাবা তখন হবে দিশেহারা।
(মূল: Father’s Old Blue Cardigan)
- বিষয় :
- গল্প