ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আফরিদার জীবিত জগত

আফরিদার জীবিত জগত
×
×

মানস চৌধুরী

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

আফরিদা তানজিম [জন্ম: ২১ অক্টোবর ১৯৯৭–মৃত্যু: ১৫ জানুয়ারি ২০১৮]–এর     চিত্রকর্মের সাথে আমার পরিচয় ঘটে খানিকটা আকস্মিকভাবে, খানিকটা প্রাযুক্তিক সুবিধাতে। সাইবার প্রযুক্তির কালে তিনিও তাঁর কিছু চিত্রকর্ম আপলোড করতেন বটে, প্রধানত ফেসবুকে, তবে তাঁর আপলোড করবার পদ্ধতি বা ধারাবাহিকতা ঠিক যশোপ্রার্থীদের মতো নিয়মিত, সংগঠিত ছিল না। ‘ইচ্ছা হলো, দিলাম’ ধরনের ছিল সেগুলো। কিন্তু তারও আগে তাঁকে আমি চিনতাম বা জানতাম কবি রহিমা আফরোজ মুন্নীর মেয়ে হিসেবে। এটাকেই ওই আকস্মিকতা বললাম। এমন নয় যে সকল চিত্রকরের মা কবি হয়ে থাকেন, কিংবা সকল কবিকেই আমি চিনি। কিংবা যেসব কবিকে আমি চিনি তাদের সন্তানদের বিষয়ে একটা আলাদা আগ্রহ নিয়ে ফেসবুকে দেখি। সেই অর্থে ‘মুন্নীর মেয়ে’ হিসেবে আফরিদার একটা পরিচয়, অন্তত একটা নির্দিষ্ট মহলে, ছিল। এই পরিচয়ে তিনি গৌরব বোধ করতেন, নাকি অসুবিধা, সেটা তাঁর সাথে আলাপের আগ্রহ আমার ছিল। সেই আলাপ আর করা যায়নি।
আফরিদার সাথে আমার আলাপ হয়েছিল অন্য বিষয়ে। আলাপ বলতে চ্যাটালাপ। ফেসবুকের ইনবক্সে। আমার বিবেচনায় খুবই কর্কশ আলাপ ছিল সেটা। এবং কর্কশতাটা আমার তরফে। আমি পরে কয়েকবার ভাবতে বসেছি যে, এই আলাপটা যে আমার কর্কশ লাগে সেটা আফরিদার আকস্মিক পরিণতির কারণে কিনা। এগুলোর সহজ কোনো ফয়সালা হয় না। আমার বেলাতেও হবে না। অন্তত আমার জীবিতকাল অবধি। আফরিদার একটা চিত্র প্রদর্শনী সাব্যস্ত হয়। তিনি নিজেই এতে উৎসাহী ছিলেন নাকি রহিমা বা আর কেউ তাঁকে উজ্জীবিত করেছিলেন, সেসব নিয়েও আমার জিজ্ঞাসা ছিল। জিজ্ঞাসাগুলো করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু প্রদর্শনীটার সংগঠন নিজ গুণেই আমার জন্য অত্যন্ত আগ্রহের ছিল। হচ্ছে কলাকেন্দ্রে যেটা গ্যালারি হিসেবে আমার কেবল পছন্দেরই নয়, বরং এর পরিচালক ওয়াকিলুর রহমান আমার অত্যন্ত পছন্দের চিত্রকলা-সংগঠক। আর আফরিদা একজন অনবদ্য চিত্রকর যে ছিলেন সেটা আমি তাঁর প্রথম কয়েকটা কাজ দেখেই সিদ্ধান্তে এসেছিলাম। আমার যা ও যতটুকু বুঝ আরকি! 
ইনবক্সে আমাকে আফরিদা তাঁর এক্সিবিশনের ক্রোড়পত্রের (বা মতান্তরে ক্যাটালগ) জন্য লিখতে বললেন। আমি যে তাতে সম্মানিত হয়েছি তা বললাম। আমার যতদূর মনে পড়ে, তাঁর সাথে চ্যাট করতে করতেই আমি সেটা লিখে পাঠালাম ওকে। এইসব লেখা দীর্ঘ করবার পক্ষপাতী না আমি। যা লিখব তা আমি জানতামই যেন। আমার এই গতিতে তাঁকে কিছুটা বিস্মিত শোনাল সম্ভবত। তিনি তখন এটা বড় করে লিখতে বললেন। আমি জানতে চাইলাম এতে সুবিধা কী। তিনি বললেন, তাহলে দৈনিকে দেওয়া যাবে। আমিও বললাম, দৈনিকে তো সেধে সেধে লেখা দেবার অভ্যাস না আমার। তিনিও একটা বড় পত্রিকার নাম করে বললেন, ওটা অত বড় সমস্যা হবে না। তিনি পারবেন হয়তো। পত্রিকার ডেস্কের সাথে মানুষের এই ‘মিষ্ট’ সম্পর্কের কথা আমি জানি। কিন্তু এ কথা আফরিদা আমাকে আশ্বাসের মতো করে বলাতে আমি একটুও খুশি হতে পারিনি। আমি তাঁকে বেশ কিছু কাঠখোট্টা কথা শুনিয়ে দিয়েছি যে পত্রিকার ডেস্কের সাথে যোগাযোগের ভিত্তিতে প্রকাশকে আমি কীভাবে দেখি। এই হম্বিতম্বির পর লেখা বড় করেছিলাম কিনা আমার একটুও মনে পড়ে না। আমি ইনবক্স চেক করতেও চাই না। তবে আফরিদার সাথে এটা নিয়ে মুখোমুখি আলাপ করব তাই ভেবেছিলাম। সেটা অতিশয় সম্ভব ছিল, কারণ পরের সপ্তাহেই তাঁর এক্সিবিশন।
১২ জানুয়ারিতে এক্সিবিশন শুরু। ২০১৮ সালের কথা হচ্ছে। শুরুর দিন আমি এসেছিলাম কিনা মনে নেই। অনেক কিছুই স্মৃতিধূসর হয়ে গেছে। আমি এসে থাকলেও আফরিদার সাথে উদ্বোধনের দিন বসে বসে আলাপের কোনো সুবন্দোবস্ত থাকবার কথা নয়। আমি শুরুর দিনে তাঁর সাথে আমার ইনবক্স-যুদ্ধটা আলাপ করতে চাইওনি। ২৭ তারিখ পর্যন্ত চলবার কথা। ফলে একদিন এসে ওকে পাকড়াও করে বসব গ্যালারির কোনো দিকে। কলাকেন্দ্রে তখন একটা ছোট্ট সুন্দর ব্যালকনিও আছে বটে। এসব কোনো ভাবনারই কোনো অর্থ থাকল না। কারণ, ১৫ জানুয়ারিতেই তিনি পৃথিবী থেকে স্বেচ্ছায়-স্বনির্মাণে-সজ্ঞায় বিদায় নিয়েছেন। 
পরেরবার যখন আমরা কলাকেন্দ্রে সমবেত হয়েছি, সেই এক্সিবিশন তখন চলছে, আমরা আফরিদার জন্য শোক করতে জড়ো হয়েছিলাম। আমি আশৈশব, স্বেচ্ছামৃত্যুর সপক্ষ মানুষ। কিন্তু অস্বীকার করব না যে, আফরিদার এই মৃত্যুর পর সংগঠিত মাথার আলোচক থাকতে আমার সমস্যা হয়েছে। অনেক সমস্যা হয়েছে। সায়ান যখন গাইছিলেন, তাঁরই লেখা একটা গান, তখন ওই প্রদর্শনী ঘরের কারোরই মনে হয় ইহজগৎ, চিত্রকলা, সংকেত, অর্থের কোনো ব্যাকরণ মেনে ভাবনা আর সম্ভব হয়নি।
এই চিত্রকর অনবদ্য। সেটা উল্লেখ করবার সময় তাঁর বয়স আমি বিবেচনায় রাখবার পক্ষপাতী ছিলাম না। কারও ক্ষেত্রেই থাকি না। তিনি নবীন ছিলেন, সেটা ঘটনাচক্রীয় মাত্র। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে দুর্ঘটনাটা ঘটল, তা হচ্ছে চিত্রকর আফরিদাকে নিয়ে আলাপটা সেভাবে গড়েই উঠল তিনি স্বেচ্ছামৃত্যু নেবার পর। আমার ধারণা, এটা যে কোনো চিত্র-পর্যালোচকের জন্য গভীরভাবে ভারী। এই পরিস্থিতিটা পর্যালোচকরা চাননি। রাজীব দত্ত লিখেছিলেন। মনিরুল হক লিখেছিলেন। ‘ব্রাদার অন ল্যাপটপ’ ছবিটাকে প্রধান বিবেচ্য করে ফরহাদ মজহার লিখেছিলেন। সকলেই লিখেছিলেন আফরিদার মৃত্যুর পরপরই। রাজীব দত্ত ও মনিরুল হক লিখেছিলেন পত্রিকায়। ফরহাদ মজহার লিখেছিলেন সম্ভবত ফেসবুকেই। ‘ব্রাদার অন ল্যাপটপ’ একটা ভূতুড়ে ও ভীতিকর ছবি। বিষয়বস্তুর জটিলতা ও বহুমাত্রিকতা যদি বাদও দিই, কেবল কলম দিয়ে ওই পর্যায়ের কাজই ভীতিকর।  কলম আফরিদা লাগাতার ব্যবহার করেছেন। কিন্তু কলমেই থাকেননি। চারকোল, এক্রিলিক, প্যাস্টেল, মার্কার, রঙিন কলম সবই সমানে ব্যবহার করেছেন। বেশ কিছু কোলাজও বানিয়েছেন। রাজীব দত্ত তাঁর রচনায় শিল্পী আফরিদাকে অস্থির আবিষ্কার করেছিলেন। আর তাঁর ফয়সালা ছিল এই অস্থিরতা এমনকি মাধ্যমগত ট্রিটমেন্টেও ছিল আফরিদার। চিত্তাকর্ষক হলো যে, আফরিদার আত্মপ্রতিকৃতিতে সাধারণভাবে তিনি অস্থির নন। তিনি, নিরাসক্ত, উন্মুখ, ফার্সিক্যাল, সিনিক্যাল, কোথাও কোথাও চাহনিতে পেনেট্রেটিভ। এমনকি সম্ভবত একটা দুটো ছবিতে তিনি নেহায়েত কিশোরী, যা তিনি বস্তুজগতে ছিলেন। কিন্তু অস্থির নন একদমই। এই প্যারাডক্সটা মনোযোগী দর্শককে ভাবাবে। যে চিত্রকর তাঁর বিষয়বস্তু, অর্থসৃষ্টি, প্রকরণ-সন্নিবেশন, হেঁয়ালিতে, অস্থির, এমনকি চিত্রমাধ্যমেও অস্থির, তাঁকে তাঁর আত্মপ্রতিকৃতিতে অস্থির দেখায় না। তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি মানে কিন্তু কম কাজ নয়। হয়তো আত্মপ্রতিকৃতিই তাঁর সবচেয়ে পরিমাণে বেশি কাজগুলোর মধ্যে পড়ে।  একটা কোলাজে তিনি ‘দ্য টু ফ্রিদাজ’কে ব্যবহার করেছেন। ফ্রিদা কাহলোর এই অতিপরিচিত কাজটার ওপর কোলাজ করেছিলেন নিজের একটা মুখ বসিয়ে। আফরিদার সাথে যা যা বিষয়ে কথা বলব ভেবেছিলাম তার মধ্যে ফ্রিদা কাহলোও ছিলেন। আমার জানতে সাধ হয়েছিল যে আফরিদা তাদের এই নামমিলকে কীভাবে দেখেন। কিংবা ফ্রিদা কাহলো যে ঘন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন সেটাকেই বা আফরিদা কীভাবে দেখেন। আফরিদার অস্তিত্ববাদী রাজনীতিটা বুঝবার জন্য স্বেচ্ছামৃত্যুর মতো বড় কিছু পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করাই লাগত না। তাঁর চিত্রকর্ম খোদ একটা বিশাল ইশতেহার এর জন্য। রঙে রঙে, মোটিফে মোটিফে, মানুষের বিগড়ানো চেহারা আর শান্ত-কোমল জন্তু-জানোয়ারের চক্ষুচাহনি আর উপস্থিতির মধ্যে। যন্ত্রের নাড়িভুঁড়ি, আর নাড়িভুঁড়ির যান্ত্রিক উপস্থাপন। উৎকট তীব্র পটভূমিতে এইসব বিপন্ন মানুষ আর শান্ত জন্তু-জানোয়ার মিলে আফরিদার চিত্রজগৎ খোদ এক বিশাল ইশতেহার– তাঁর অস্তিত্ববাদী রাজনৈতিক প্রবাহের। কিন্তু আমার আগ্রহ ছিল তাঁর কাছে শুনব নারীবাদ নিয়ে, শ্রমিক রাজনীতি নিয়ে। শ্রমিক ও নারীর এবং শ্রমিক-নারীর অস্তিত্ব নিয়ে তিনি কী ভাবেন তা শুনতাম। আগামীতে তিনি কী কী ভাববেন তার জন্য উস্কানিমূলক প্রশ্ন করতাম। 
সেসব হয়নি। কখনও হবেও না। স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে আফরিদা তাঁর বয়সকে মহাকালে স্থির করে দিয়েছেন। আকিয়ামত তা কুড়িতেই সীমিত হয়ে থাকবে। আর সম্ভবত, তাঁর চিত্রকর্মের পঠন ও সংমিশ্রণকে আমাদের জন্য আরও চ্যালেঞ্জিং, অথচ আরও জরুরি দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারিত করে গেছেন। 

আরও পড়ুন

×