ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

জার্মান বন্ধুর প্রতি

জার্মান বন্ধুর প্রতি
×
×

আলবেয়ার কামু [৭ নভেম্বর ১৯১৩-৪ জানুয়ারি ১৯৬০]

আলবেয়ার কামু

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

আলবেয়ার কামুর খোলা চিঠি ‘জার্মান বন্ধুর প্রতি’। নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে কামুর মানবিক মূল্যবোধের দার্শনিক লড়াইয়ের স্মারক এটি প্রথম চিঠি। কামুর ‘রেজিস্ট্যান্ট, রেবেলিওন অ্যান্ড ডেথ’ প্রবন্ধগ্রন্থের অন্তর্গত চিঠিটির উল্লেখযোগ্য অংশ পত্রস্থ হলো।            ভাষান্তর সুমন মজুমদার

তুমি বলেছিলে, দেশের মহত্ত্বের জন্য মূল্য দিতে হয়। কারণ মহত্ত্বই শেষ কথা। আসলে আমরা এমন এক পৃথিবীতে আছি, যেখানে হয়তো সমস্ত কিছুর অর্থ হারিয়ে গেছে। তবে আমরা জার্মান তরুণরা সৌভাগ্যবান, কারণ জাতির ভাগ্যেই আমরা একটি অর্থ খুঁজে পেয়েছি। আর সেজন্যই সবকিছু বিসর্জন দিতে হবে।   
ঠিক সে জায়গাতেই আমাদের পথ আলাদা হয়ে গিয়েছিল। অথচ সে সময় আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। আমি কিন্তু তোমাকে বলেছিলাম, পৃথিবীর সবকিছু একটিমাত্র লক্ষ্যের অধীনেই পরিচালিত হবে, তা আমি বিশ্বাস করি না। এমন কিছু জিনিস আছে, যার কোনো ক্ষমা নেই। বিশ্বাস করো, আমি আমার দেশকে ভালোবাসতে চাই, একই সঙ্গে ন্যায়বিচারকেও। আমি দেশের জন্য কোনো মহত্ত্ব চাই না, বিশেষ করে যে মহত্ত্বের জন্ম রক্ত আর মিথ্যার গর্ভে। তারচেয়ে ন্যায়বিচারকে জীবন্ত রেখেই আমি দেশকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। 
তুমি এ কথার প্রতিবাদ করেছিলে। বলেছিলে, তাহলে তুমি তোমার দেশকে ভালোবাস না!  
সেটা অবশ্য পাঁচ বছর আগের কথা। সেই থেকে যে আমরা বিচ্ছিন্ন, সেভাবেই আছি। অবশ্য এই সময় তোমার কাছে সংক্ষিপ্ত মনে হতে পারে। মনে হতে পারে জ্বলজ্বল করতে করতে দ্রুত বয়ে যাওয়া কিছু। কিন্তু আমার কাছে তা নয়, শুধু বলতে পারি দীর্ঘ বছরগুলোতে একদিনও এমন যায়নি, যখন তোমার কথা মনে পড়েনি।  
“তুমি তোমার দেশকে ভালোবাস না!” আজ যখন তোমার কথাগুলো মনে হয়, আমার বুকের ভেতর কেমন একটা দমবন্ধ লাগে। না আমি আমার দেশকে ভালোবাসিনি। যদি আমাদের ভালোবাসার বস্তুর ভেতরের অন্যায় চিহ্নিত করা দেশকে ভালোবাসা না হয়, যদি এই জেদ ধরাটাই দেশকে ভালোবাসা না হয়, তাহলে মনে করো সেটাই। ভালোবাসার পাত্রটিকে যে অবশ্যই আমাদের মনের মধ্যে তার সবচেয়ে যে সুন্দর প্রতিচ্ছবিটি আছে, সেটার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে হবে।  
সেটা পাঁচ বছর আগের কথা। ফ্রান্সের বহু মানুষই সেদিন আমার মতো করে ভেবেছিল। তাদের কেউ কেউ তার মধ্যে জার্মান ভাগ্যের বারোটি কালো চোখের মুখোমুখি দাঁড় করানোর মাধ্যমে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল কোনো এক প্রাচীরে। আর সেই মানুষগুলো, যারা তোমার মতে ভালোবাসত না, তারা নিজেদের দেশের জন্য এমন কিছু করেছে—যা তুমি তোমার দেশের জন্য কখনোই করতে পারবে না। এমনকি তুমি তোমার জীবন একশবার উৎসর্গ করলেও তাদের ত্যাগের ধারেকাছে যেতে পারবে না। কারণ তাদের বীরত্ব এতই মহৎ ছিল যে, এর জন্য সবার আগে নিজেদেরই জয় করতে হয়েছিল। 
এখানে কিন্তু আমি দুই ধরনের মহত্ত্বের কথা বলছি। আমি তোমাকে এমন এক বৈপরীত্যের কথা বলছি, যার আলোয় তোমার চোখ খুলে দেওয়া আমার কর্তব্য।
সম্ভব হলে খুব দ্রুত আমাদের দেখা হবে। কিন্তু তারপর, আমাদের বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাবে। তুমি তখন পরাজয়ের শোকে আচ্ছন্ন থাকবে। অতীতের জয় করেছিলে তার জন্য কোনো গ্লানি থাকবে না। বরং সমস্ত শক্তি নিয়ে তুমি এক হাহাকারের আকুলতায় ভাববে সেদিনের কথা। আজ আমি আত্মিক দিক থেকে এখনও তোমার খুব কাছাকাছি। নিঃসন্দেহে তোমার শত্রু, তবু সামান্য হলেও তোমার বন্ধু। কারণ আমি তোমার কাছে কিছুই লুকাচ্ছি না। কাল সব শেষ হয়ে যাবে। তোমার জয় যে প্রাচীর ভেদ করতে পারেনি, তোমার হার সেটারই তারই পতন ঘটাবে। আমি তোমার জন্য সত্যের এমন একটি পরিষ্কার ধারণা রেখে যেতে চাই, যা আমার দেশের ভাগ্যে শান্তি বা যুদ্ধ কোনোটিই তোমাকে দেখতে শেখাবে না। অন্ততপক্ষে, আমরা একে অপরের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত বা একে অপরের প্রতি উদাসীন হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত। 

কোন ধরনের মহত্ত্ব আমাদের টিকিয়ে রেখেছে, আমি তা তোমাকে বলতে চাই। তবে এর অর্থ এটা না যে, কোন ধরনের সাহসিকতাকে সাধারণত আমরা কুর্নিশ করি সেটা তোমাকে শেখানো। আর তা কোনোভাবেই তোমার বা তোমাদের ধরনের নয়। কারণ, বছরের পর বছর কেবল সহিংসতারই প্রস্তুতি নিয়ে যখন তোমার কাছে হিংস্রতা কোনো কিছু ভাবার চেয়ে সহজ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই হিংস্রতা দেখানোও যে এমন বড় কিছু না, সেটা তোমাকে শেখাতে চাই। 
বিশ্বাস করো, ঘৃণা ও সহিংসতা যে নিজের ভেতর থেকেই সম্পূর্ণ অর্থহীন, এ কথা নিশ্চিতভাবে জেনেও নির্যাতন আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোটা কম কথা নয়। যুদ্ধকে ঘৃণা করেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার যে অনুভূতি, আকুলতা ধরে রেখেই সবকিছু হারানোর বেদনা মেনে নেওয়া কিংবা দারুণ উন্নত কোনো সভ্যতা গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা বুকে ধারণ করেও ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা, অনেক বড় ব্যাপার। এভাবেই আমরা তোমাদের চেয়েও আমরা অনেক বেশি কিছু করি, কারণ আমাদের নিজেদের ভেতর থেকেই সেই শক্তির রসদ জোগাড় করতে হয়। তোমাদের হৃদয়ে বা বুদ্ধিতে জয় করার মতো কিছুই ছিল না, কিন্তু আমাদের ছিল। শুধু একটি সামরিক জয় নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আমাদের আরও অনেক কিছু জয় করতে হয়েছিল। আর সবার আগে জয় করতে হয়েছে, তোমাদের অনুকরণ করার প্রলোভন। 
আমাদের সত্তার মধ্যে এমন কিছু অংশ সব সময়ই থাকে, যা প্রবৃত্তির কাছে, বুদ্ধিমত্তার প্রতি অবজ্ঞার কাছে এবং কর্মদক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধার কাছে নতি স্বীকার করে। তবে এই মহৎ গুণগুলোও একসময় হয়তো আমাদের কাছে ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। আমরা নিজেদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে লজ্জিত বোধ করি। আমরা তখন হয়তো এমন কোনো আদিম সমাজ কল্পনা করি, যেখানে সত্যকে অবলীলায় আর খুব সহজে অর্জন করা যায়। 
ঠিক এ ধরনের কল্পনা মানুষকে কোথায় গিয়ে নামায় তা দেখিয়ে দেওয়ার জন্যই তো তোমরা সেখানে উপস্থিত আছো। যদি আমি ইতিহাসের কোনো অন্ধ নিয়তিতে বিশ্বাস করতাম, তাহলে ধরেই নিতাম, বুদ্ধিমত্তার পরাধীন ক্রীতদাসদের মতো তোমরা একটা জীবন্ত তিরস্কার হিসেবেই আমাদের পাশে আছ। অথচ জানো, তখন আমাদের মন আবার জেগে ওঠে এবং আমরা স্বস্তি বোধ করি।
কিন্তু বীরত্বের ধারণার প্রতি আমাদের যে সংশয় ছিল, তাকেও জয় করতে হয়েছিল। আমি জানি, তুমি মনে করো বীরত্ব আমাদের কাছে অচেনা। কিন্তু ভুল ভাবছ। আসলে ব্যাপারটা হলো, আমরা বীরত্বকে যেমন স্বীকার করি এবং আবার অবিশ্বাসও। আমরা তাকে স্বীকার করি কারণ ইতিহাসের দশ শতাব্দী ধরে আমরা যা কিছু মহান, তার সবকিছুর সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। আবার আমরা তাকে অবিশ্বাস করি, কারণ বুদ্ধিমত্তা দশ শতাব্দী ধরে আমাদের স্বাভাবিক ও সহজ হওয়ার শিল্প আর আশীর্বাদ শিখিয়েছে। তোমাদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমাদের সবার আগে মৃত্যুর দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াতে হয়েছিল। আর সে কারণেই আমরা ইউরোপের বাকি সব দেশের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছিলাম। তলিয়ে গিয়েছিলাম মিথ্যার অতলে, কিন্তু সত্যের অনুসন্ধান ছাড়িনি। এ কারণেই শুরুতে হয়তো আমরা পরাজিত হয়েছিলাম। কারণ যখন তোমরা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে, ঠিক সে সময়েও আমরা হৃদয় দিয়ে বিচার করছিলাম যে, ন্যায়বিচার আমাদের পক্ষে আছে কি না। 

আরও পড়ুন

×