ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

অপমানে বিধ্বস্ত হয়ে কলম ধরি

অপমানে বিধ্বস্ত হয়ে কলম ধরি
×
×

হরিশংকর জলদাস [জন্ম: ১২ অক্টোবর ১৯৫৫]

হরিশংকর জলদাস

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

শৈশবের স্মরণীয় মুহূর্ত
টুনটুনি পাখি হত্যা করা। ছয়-সাত বছর বয়স তখন। ক্ষুদ্র পাখিটিকে হত্যা করে বড় কেঁদেছিলাম। চোখের জল ফেলতে ফেলতে মাটিচাপা দিয়েছিলাম। অপরাধবোধ ছেড়ে যায়নি আমায়। বহুবছর পর নাতনির (দৌহিত্রী) নাম রেখেছি টুনটুনি।
সাহিত্যের প্রতি কখন প্রথম আগ্রহ
সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি তখন। আমার কাছে সাহিত্য মানে গল্পকাহিনি। বাড়িতে মহাভারত ছিল—কাশীদাসী মহাভারত। পড়া শুরু করি। মজে যাই। তখন থেকেই সাহিত্যের প্রতি টান জমে। আর লোকসাহিত্যগুলো শুনতাম ঠাকুরাদি পরানেশ্বরীর কাছে। ধীরে ধীরে সাহিত্যপ্রীতি মনে দানা বাঁধতে থাকে। এ তো গেল অধ্যয়নের ক্ষেত্রে। নির্মাণের ক্ষেত্রে ভিন্ন গল্প। সেখানে লুকিয়ে আছে সামাজিক অপমান। পঞ্চাশ পেরোনো হরিশংকর অপমানে বিধ্বস্ত হয়ে কলম ধরে। 
আড্ডা-তর্কের সঙ্গী যারা
দুটো জীবন আমার। গ্রামজীবন আর শহরজীবন। গ্রামে যখন থাকি পাড়ার বয়সী-কমবয়সী জলদাসরা আমার আড্ডার সঙ্গী। শহরের সঙ্গী-শিক্ষিত-মার্জিতরা সব সময় আড্ডা দেয় না; মাঝেসাঝে আড্ডা হয়। তখন সঙ্গী বয়সীরা। গ্রামীণ আড্ডায় আমার শৈশবজীবন থাকে। থাকে বঙ্গোপসাগরের নোনাজলে ডুবসাঁতারের বৃত্তান্ত। শহুরে আড্ডায় শুধুই কৃত্রিমতা। 
ভাবাদর্শকে প্রভাবিত করেছে যে গ্রন্থ, যে ব্যক্তি, এবং যেভাবে
রামসুন্দর বসাক প্রণীত ‘আদি বাল্যশিক্ষা’ আমার ভাবাদর্শকে প্রভাবিত করেছে। সত্তর দশকের আগে যাদের বর্ণপরিচয় ঘটেছে, তাদের অপরিহার্য বইটির নাম ‘আদি বাল্যশিক্ষা’। মানবজীবনের প্রায় সকল তথ্য-সত্য এই বইতে লিপিবদ্ধ আছে। বলা যায়, বাঙালির সংক্ষিপ্ত জীবনবেদ এই গ্রন্থটি। 
প্রভাবিত করেছে এমন ব্যক্তি অনেক। প্রথমে বাবা যুধিষ্ঠির জলদাসের দ্বারা প্রভাবিত হই। পরে জীবনের নানা বাঁকে নানা ব্যক্তিত্ব তাদের লেখা এবং জীবনাচরণ দিয়ে প্রভাবিত করেছেন। 
প্রথম প্রকাশিত বই ও বইটি ঘিরে স্মৃতি
‘জলপুত্র’ উপন্যাস। ৫৫ বছর বয়সে লিখিত। ২০০৭ সালে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার ঈদসংখ্যার জন্য নবীন ঔপন্যাসিকদের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি আহ্বান করা হয়। দেশ-বিদেশ থেকে প্রাপ্ত অনেক পাণ্ডুলিপির মধ্যে এটি প্রথম স্থান লাভ করে। এরপর ২০০৮ সালে এটি গ্রন্থাকারে মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়। ‘জলপুত্র’-এর আগে একটি ছোটগল্পও লিখিনি। কী করে লিখতে হয়, তাও জানতাম না। একদিন আবেগতাড়িত হলাম। ‘জলপুত্র’ লিখলাম বটে, তবে এটা যে উপন্যাস হয়েছে বুঝতে পারিনি। প্রকাশের পর পাঠকরা যখন পড়তে শুরু করেছে, বুঝতে পারলাম কিছু একটা হয়েছে। ‘জলপুত্র’ উপন্যাসটি ২০১২ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার লাভ করে। 
প্রিয় লেখক যারা, এবং যে কারণে প্রিয়
প্রিয় লেখক তো অনেক। লিখে কি শেষ করা যাবে? দু-একজনের নাম বলছি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, মাহমুদুল হক, ওবায়েদ হক, আবুল ফজল (রোজ অরজ), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রচেত গুপ্ত, রবিশঙ্কর বল, মঈন শেখ এবং আরও অনেকে। সেই অনেকের মধ্যে আছেন নির্মলেন্দু গুণ, শহীদ কাদরী, আবুল হাসান প্রমুখ। এই কবি লেখকরা বাঙালি জীবনের কথা লেখেন বলে তারা আমার প্রিয়। 
এখন যা লিখছি, পড়ছি, অনুবাদ করছি–
লিখছি উপন্যাস—কস্তুরীগন্ধী যুবতীর। আরেকটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছা খুব। লবণচাষিদের নিয়ে। মহামূল্যবান খাদ্যের নির্মাতারা।
পড়ছি অনেক। দুচারটার নাম—হরিপদ ভৌমিকের ‘মাছতুতো বাঙালি’, টম স্ট্যান্ডেজের ‘ছয় গ্লাসে পৃথিবীর ইতিহাস’, ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়ের ‘চাণক্য’, সিরাজ সালেকীনের ‘চুল: সমাজ, সংস্কার, অভিব্যক্তি’। আমি শুধু একটি বই পড়ি না, একসঙ্গে অনেক বই পড়তে শুরু করি। সময়, স্থান, আবহাওয়া ভেদে বইগুলো পড়তে থাকি। 
অনুবাদ করি না।
মানুষের যে গুণ সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে
সত্যকথন। সত্য বড় কঠিন। সবাই সত্য কথা বলে না। কখনও কখনও বলে। সর্বদা সত্য কথা বলার লোক বর্তমানে নেই বললেই চলে। যারা বলেন তাদের পূজা করি আমি। 
নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি ও সীমাবদ্ধতা
শক্তি: ভুল করলে দোষ স্বীকার করে নেওয়া। সবাই নিজের ভুল স্বীকার করেন না। তার জন্য হিম্মত লাগে। সেই আত্মশক্তি আমার আছে। 
সীমাবদ্ধতা: দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে না পারা। চোখের সামনে কী বিপুল অন্যায় সংঘটিত হচ্ছে প্রতিদিন। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। করতে পারি না কিছুই। এই বেদনা নিত্যদিন কুরে কুরে খায়। এর চেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা আর কী থাকতে পারে? 
প্রিয় উক্তি
মানুষ ক্ষমতা আর মমতার কাছে বন্দি। 

আরও পড়ুন

×