গল্প ফুঁড়ে নায়কেরা
শিল্পকর্ম :: আনিসুজ্জামান সোহেল
কিযী তাহ্নিন
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
গল্পের শেষটুকু আবছা যত, গল্প লেখবার প্রক্রিয়ায় চরিত্রেরা লতায়-পাতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে তত। চরিত্রেরা তিরতির করে এগিয়ে যায়, স্পষ্ট হয়ে ওঠে গল্পের সমাপ্তি। তারপর আয়োজন শেষ আর লেখকের বিশ্রাম, বিরাম। চরিত্রদের বিশ্রাম নেই। তারা পাঠকের হাতের তালু থেকে আঙুলে, মগজে, আত্মায় অনুরণন তৈরি করে। লেখকেরা যদি দর্শকসারিতে বসেন তো দেখবেন পাঠকের হাত ধরে কিংবা নিজের তৈরি পথে চরিত্রেরা হাঁটছে সুদূর, বিপুল সুদূর। লেখকের নাগালের আড়ালে।
এই যেমন লাভলী চাচি, আমার মগজে বিরাজ করছিল, নাক বরাবর সুরসুর করছিল কত কত সময় ধরে, আমি নিজেও তার খোঁজ জানি না। শুধু এক ভর বিকেলে মনে হলো আরেকবার গিলে ফেলবার আগে, পুরোনো ফাল্গুনের হাওয়ায় মিলিয়ে দেওয়ার আগে তাকে এবার ছুঁতে হবে।
লিখলাম– আমাকে অতিক্রম করে যারা ভালো থাকতে চেয়েছে, তারাই আমার প্রেমিক ছিল। এইটা আমার কথা না, লাভলী চাচির কথা। লাভলী চাচি অবশ্য এমন ঝকঝকে করে কথাটা বলেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘শোন, অনেক ভাবছি প্রেমিক আসলে কারা? আমারে পাড়াইয়া মাড়াইয়া যারা ভালো থাকছে, এরাই প্রেমিক। সবগুলা বজ্জাত।’ লাভলী চাচি প্রেমের জন্য বিখ্যাত এক মানুষ। ওনার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রেম। কপালের ভাঁজ, ঠোঁটের তিনকোনা হাসি, স্টেপকাট কোঁকড়া চুল আর টুসটুসে লাল বরইয়ের মতো গাল দুটোর কথা বাদই দিলাম, উনার চোখের পাতার নাচানাচিটুকুতেও প্রেম। উনি যখন লম্বা রেখার মতো শরীরকে একটুও কুঁজো না করে হেঁটে হেঁটে যান, মনে হয় আস্ত প্রেম নড়েচড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ মনে হওয়া ছেলেমেয়ে সবার। এ মনে হওয়া বুড়ো তরুণ সবার। এমনকি লাভলী চাচির একটি সংসার আছে– এ সত্যটি তাদের প্রেমের রিনিকঝিনিক অনুভূতিকে কোনোভাবে মলিন করতে পারে না।
লাভলী চাচির সঙ্গে কোনো লৌকিকতায় আমার দেখা হয়নি, সশরীরেও না। কিন্তু তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে মগজে-মননে টুকরো টুকরো দৃশ্যকল্পে, এখানে সেখানে হুটহাট। আমি তাকে কত কত জানালা ভেঙে, শুকনো পাতার মতো কুড়িয়ে, বৈচিত্র্যময় সময় থেকে আঁজলা জলের মতো তুলে এনে নির্মাণ করেছি। লাভলী চাচি গল্পের ভাঁজে ভাঁজে এমন এক চরিত্র হয়ে ওঠে, যার ‘নামের সঙ্গে হেমন্তের বিকেলের মতো প্রেম প্রেম গন্ধ জুড়ে আছে। পাড়ার মেয়েরা তাকে ডাকে চোর বলে– অন্যের স্বামী চোর, ঘরভাঙানি, অন্যের সংসারের শান্তি চুরি করা বেটি ইত্যাদি ইত্যাদি। পুরুষেরাও তাকে ডাকে চোর বলে– হৃদয় চোর, মন চোর এমন চিনির মতো আদুরে নামে।’
‘লাভলী চাচির প্রেমিকেরা’ গল্পটি প্রকাশের দিন আমি যে কিঞ্চিৎ শঙ্কিত হইনি, তা নয়। লাভলী চাচিদের এ সংসার কচুরিপানার জলে আড়াল করে, তাদের শরীর ডুবে মরে সবার নিন্দা অভিযোগের কাদামাটি জলে। এমন চরিত্র গল্পের প্রধান হয়ে উঠলে মানুষ সে গল্প প্রত্যাখ্যান করবে, কেন নয়? কিন্তু গল্পের প্রকাশ পরবর্তী আলোচনা, অনুভূতি নিয়ে যেন আরেকটি আখ্যান লিখে ফেলা যেত।
আমার চরিত্রেরা মেদহীন, নির্লিপ্ত হোক, আমি তাই চাই। লাভলী চাচিও তাই। তার চরিত্র নির্মাণের কারণ ছিল– জানান দেওয়া, লাভলী চাচিরাও সমাজে আছেন, তারাও বাঁচেন এবং মরেন। কিন্তু পাঠকেরা তাদের অনুভূতি ও বিশ্লেষণের মাপকাঠিতে লাভলী চাচিকে পৌঁছে দিলেন অন্যখানে, অন্য কোথাও, আমি যেখানে তাকে রেখে আসিনি। লাভলী চাচিকে উদযাপন করলেন পাঠকেরা। ভুল প্রেমে, ভুল দোষে, ভুল সময়ে আক্রান্ত সব মানুষেরা নাকি আসলে লাভলী চাচি।
আমি লিখেছিলাম কিংবা লিখতে চেষ্টা করেছিলাম নির্লিপ্ত বয়ানে, লাভলী চাচি এবং তার স্বামীর বিবাহবহির্ভূত প্রেমের গল্প। কেউ তাতে দোষী নয়, সাজাপ্রাপ্ত নয়। শুধু গল্পটা জানানোই তো কাজ ছিল। ‘চাচি আর চাচা দুজনের প্রেমই সামনে এসেছিল। বিয়ে নাকি প্রেম, তাও আবার অবৈধ প্রেম। কোনটা? শেষমেশ বিয়েই টিকল। চাচার ছুকরি প্রেমিকা চাচাকে ফেলে চলে গেল। চাচিও চাচার কাছে থেকে গেল। অন্য প্রেমকে বিদায় দিয়ে তারা সংসারটাই বেছে নিল। দিন গেল, মানুষের কেন যেন চাচির প্রেমটার কথাই মনে থাকল। চাচারটুকু ভুলে গেল।’ কিন্তু পাঠকেরা অনেকেই সহমর্মিতা প্রকাশ করলেন, সংযোগ তৈরি করলেন শেষ লাইনটুকুর সঙ্গে– ‘মানুষের কেন যেন চাচির প্রেমটার কথাই মনে থাকল। চাচারটুকু ভুলে গেল।’
লাভলী চাচিদের প্রেমের গল্প সচেতনভাবে সমাজ-সংসার এক তীক্ষ্ণ তীরের মতো শান দিয়ে জমিয়ে রাখে, সময়ে তা দিয়েই আঘাত করবে বলে। সে বোধ যেন পাঠকের কাছে আবার স্পষ্ট হলো। আমিও হয়তো আড়ালে সে ধারণা গুঁজেই দিয়েছিলাম। তবে এত তীব্রভাবে কী?
লাভলী চাচির পা দুটো পদ্মফুলের মতো, গোলাপি আলো মাখা। লাভলী চাচি নিজের বর্ণনায়, ‘এই দেখ আমার পা দুইটা কী সুন্দর। কিন্তু প্রেম ভাঙার পর যদি দেখতি। প্রত্যেকবার ফেটে ময়লা হয়ে পায়ের যা অবস্থা হয়। নিজেরই ঘিন্না লাগে। যত্ন নেই না যে তখন। আবার নতুন প্রেম হলে ভ্যাসলিন মাখি, ঝামা দিয়ে ঘষি। গোলাপ জলে পা ডুবাই। মন খুশি থাকে তো তখন। হি হি।’
গল্পের শেষ দৃশ্যে পাঠকেরা জানতে পারে যে কোনো জটিল অসুখে না প্রেমের অভাবে মৃত্যু হয়েছে লাভলী চাচির, তার পদ্মের মতো পা দুটো কুঁচকানো শুকনো যত্নহীন। সেই মৃত্যু পাঠকেরা তাদের মতো করে গ্রহণ করলেন– প্রেমহীনতা, নির্দয় এক সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে। আমি এক নিছক মৃত্যুই দেখিয়েছিলাম, এক প্রেমময় মানুষের মৃত্যু। এবং বুঝলাম গল্প ছাপিয়ে লাভলী চাচি সবার হয়ে উঠলেন। বইমেলা কিংবা চায়ের আড্ডায় অচেনা পাঠকেরা আমায় যতবার এসে বলেছেন– ‘লাভলী চাচির প্রেমিকেরা’ কি আপনি লিখেছেন? আমি মুখে হু বলেছি, হেসেছি। কিন্তু মনে মনে এও বলেছি, ‘লাভলী চাচি তো আমার গল্প ফুঁড়ে উড়ে গেছে কবে, আলোতে হাওয়াতে।’
যে চরিত্র এ জগৎ সংসারে উপেক্ষিত অবহেলিত, সাহিত্যে স্থান পেলে মহৎ হয়ে ওঠে, আকর্ষণীয়ও। তাই এ সমাজের লাভলী চাচির মুক্তি হয়েছে সাহিত্যে, পাঠকের হাত ধরে। আমি এক নিতান্ত সাদামাটা গল্প বলিয়ে হিসেবে লাভলী চাচির বিশালতার ভার বহন করেছি সলজ্জে সগৌরবে।
আমি যে সময়ে লিখতে এসেছি, চারপাশের ডামাডোলে লেখকেরা যেন নিশ্চুপ। অথচ সুদূর অতীতেও এমন হট্টগোল ছিল, সাহিত্যের নিজস্ব স্বরও ছিল, ছিল প্রতিবাদের ভাষা, দাঁড়াবার জায়গা। আমাদের সময়ে সাহিত্যের নিজস্ব স্বর নাকি খানিকটা ম্লান। কিছু দায় সময়ের, আমাদেরও। অনুযোগ আছে, সময়ের চাপে চ্যাপ্টা হয়ে আমরা নিছক লেখক হয়ে থেকেছি, সময়কে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু পুরোটা কি সত্যি? যে সময়ের রোদ, ঝড়, খরা লেখকের শরীরে মনে লাগে, তার ছায়া গল্পেও তো পড়ে। গল্প সময়কে ছুঁয়ে যায়, ধারণও করে। কতটা গভীরভাবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। যে সময় কিংবা সীমানার গল্পই লিখুক না কেন, লেখকেরা সে গল্পের মাঝে তো নিজ সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেন।
যেমন– ‘সম্পূর্ণ রঙিন সিনেমা’। গল্পটার সময়কাল অতীত। কিন্তু যে টানাপোড়েন, বোধ আর অস্তিত্ব সংকট, তা আমার সময়েরই। গল্পটা লিখেছিলাম কালিন্দা নামের এক গ্রামে বাস করা মকবুলকে নিয়ে। সে আমার কল্পনায় বাস করা চরিত্র। আমি গল্পে তার ঠোঁট, নাক, দরাজ কণ্ঠ এঁকে দিয়েছিলাম আর গল্পের প্রয়োজনে ফিরিয়ে নিয়েছিলাম তার দৃষ্টি। মকবুল অন্ধ। কিন্তু এক অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী। সে সময়কে পড়তে পারে। সারাদিন সিনেমা কিংবা চুলকানি নিরাময়ের মলমের ক্যানভাসিং করে বাজারে এসে যখন বসে, এলাকার মানুষ ঘিরে ধরে। সময় জানতে চায়– দিনে, রাতে। অন্ধ মকবুল সময় বলে দিতে পারে যখন ইচ্ছে তখন। ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে নিলে দেখা যায় সময় ঠিকঠাক। অথচ অন্ধ মকবুলের কোনো ঘড়ি নেই।
নির্লিপ্ততা মকবুলের চরিত্রের অংশ, লেখক হিসেবে সাধ্যি ছিল না আমার মকবুলকে অন্য কোনো রূপে প্রকাশের। গল্প আমাকে সেদিকেই ধাবিত করেছে। মকবুল তাই ভীষণ সহজে সব কৌতূহলের উত্তর দেয় এভাবে– ‘খোদার হিসাব পরিষ্কার বুবু, সবাইকে কিছু না কিছু দেখার ক্ষমতা দিসে। তোমরা দেখ দুনিয়া, আমি দেখি সময়।’
গল্প এগিয়ে যায়। গ্রামে আসে বিদেশি চিকিৎসকের দল আর রওশন সার্কাসের দল। বিদেশি দলের দাতব্য চিকিৎসার অংশ হয়ে ওঠে মকবুল। তার এক চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবার আশা জাগে। আশা জাগে গ্রামের মানুষেরও তাদের গ্রামের অন্ধ মকবুল দেখতে পাবে, তার একটা সংসার হবে। কেমন রূপকথার মতো হবে মকবুলের জীবন। রাত হলে চলে সার্কাস পার্টির আয়োজন আর গানের পালা। বাঁশির হুহু ভাঙনের সুর ছাপিয়ে মকবুল জানালায় দাঁড়িয়ে শোনে সে গীত–
‘কেউটে হবা?
চড়াই পাখি?
সোনা রঙা মাটি?
এ জনম না চিনলে মানুষ কেমনে হবা খাঁটি?’
এরপর আমার হাতে কিচ্ছু ছিল না। কী ভীষণ পাঞ্জা লড়েছি আমরা, আমি আর মকবুল। শেষটুকু মকবুল ঠিক করে নেয় গল্পের। আমি অসহায়।
‘শেষ দৃশ্যের মতো, বাক্সবন্ধের সময় হয়েছে। সার্কাস দল রঙিন সাজ বাক্সে গুছিয়ে ফেরার প্রস্তুতি নেয়। বিদেশি দল বাক্স বন্ধ করে ফেরার জন্য, সঙ্গে নিয়ে যাবে মকবুলকে। একসময়ের বাক্সবিহীন মকবুল ও নতুন কেনা টিনের বাক্সে গুছিয়ে নেয় টুকটাক সব। চোখওয়ালা মানুষ হওয়ার জন্য তার এ যাত্রা। বাক্সবন্ধ করে চলে গিয়েছিল বিদেশি ডাক্তারের দল, সার্কাসের দল। চলে যায় মকবুলও। চলে যাবার দিন সকালে, মকবুলকে খুঁজে পাইনি বিদেশি ডাক্তারের দল। মকবুল নেই, নেই তার টিনের বাক্স। কালিন্দায় কেউ খুঁজে পায়নি তাকে। মকবুলকে ছাড়া ফিরে গিয়েছিল বিদেশি দল। লোকমুখে শোনা যায়, অন্ধ মকবুল এখন দি গ্রেট রওশন সার্কাসে খেলা দেখায়, সময়ের হিসাব বলে দেওয়ার সেই খেলা। খেলা দেখায় গ্রামে গ্রামে, শহরে শহরে। বাউল হয়ে? কিংবা পথিক হয়ে? কালিন্দা গ্রামে সে আর কখনও ফেরেনি।’
আমি ভারী হৃদয়ে মকবুলকে তার গল্পের পথ বেছে নিতে দিয়েছি, সাহায্য করেছি বলা যায়। আমি মকবুলকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করতে পারতাম, কিন্তু মকবুল গল্পে বেড়ে উঠেছে তার নিজস্ব বোধ, অস্তিত্ব, মেধায়, সে স্বতন্ত্র পথ খুঁজে নিয়েছে। সে আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মকবুলের দৃষ্টি ফিরলে গল্পটা সত্যি হত, গল্পটা মকবুলের হয়ে উঠতো না।
জীবনের চেয়ে জটিল এক জীবনের খোঁজই হয়তো সাহিত্যের কাজ। এ ভাবনা পোক্ত হলো আমার “মসলার কৌটা” লেখবার পরে। গল্পটি মূলত দুজন মানুষের গল্প, মনিকা এবং আম্মা, গল্পের কথকের আম্মা। মা-মেয়ে এক বাসায় থাকে। কথক তার মাকে বর্ণনা করে এভাবে - “আমার মায়ের একটা অদৃশ্য রেলগাড়ি আছে। যে রেলগাড়ি আর কেউ দেখতে পায় না। সেই রেলগাড়িতে সময়মতন উঠতে না পারলে আম্মার গন্তব্য হারিয়ে যাবে যেন। আম্মাকে দেখলে মনে হয় সারাদিন ধরে সেই অদৃশ্য রেলগাড়ির পেছন ছুটছে, ধরতে পারছে না, গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না, পা পিছলে পড়ে যাচ্ছে। প্রতিটি কাজে তাড়াহুড়া, শুরুর আগেই শেষ করতে হবে, কোথায় যেন পৌঁছাতে হবে তাকে! অথচ আম্মার তেমন কোথাও যাওয়ার নেই। আম্মার কোন কাজে খুঁত থাকা যাবে না। কাজটি নিখুঁত হলো কিনা সেটা তার নিজস্ব মাপকাঠিতে যাচাই করা হবে। আমি আপনি রায় দিলে হবে না। এবং বাড়ির প্রতিটা কাজ তার নির্ধারিত সময়ের মাঝে শেষ করতে হবে। কোন এক না-দেখা ট্রেন ধরতে হবে যে। আমি আম্মাকে নিয়ে এমন করে ভাবি জানলে সে আমাকে ঝাড়ুর বাড়িতে আস্ত রাখবে না। কিন্তু এই যে এখন, নুরজাহান আপাকে দিয়ে রান্নাঘরের তাক থেকে প্লাস্টিকের কৌটা হাড়িপাতিল নামিয়ে সাবান পানি দিয়ে ডলে ডলে পরিষ্কার করাচ্ছে, এর মাঝে নুরজাহান আপাকে হাত পরিষ্কার করে ধুয়ে-মুছে টেবিলে দুপুরের খাওয়া বেড়ে দিতে হলো, এবং আবার সে রান্নাঘরের তাক ঘষাঘষিতে ফিরে গেল। আমি আর আম্মা দুপুরের খেতে বসলাম, এবং আম্মা অস্থির হয়ে উঠলো, “নুরজাহান কাপড় ধুবা কখন, আমার ঘরটা ঝাড়ু দিবা কখন?, বৃষ্টি আসে নাকি দেখ, বারান্দার শুকনা কাপড় আনো তাড়াতাড়ি। কই আনো না ক্যান?”
সে বাসায় মনিকার উপস্থিতির সূত্রে গল্প দানা বাঁধে। মনিকা আম্মার বন্ধুর মেয়ে। সদ্য বিয়েভাঙা মনিকার এ শহরে ভাড়াবাড়ির চক্করে পড়ে মায়ের পুরোনো বন্ধুর বাড়িতে কিছুদিনের আশ্রয়ের খোঁজে আসে। কথক মনিকাকে দেখেছে এভাবে - “এরকম দেখতে মেয়েদের নামই বোধহয় মনিকা হয়। ঝিরিঝিরি রেশমের মতন কাঁধ ছোয়া লেয়ার কাট চুল, হাসলে ভরা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ঝিনুক দাঁতের হাসি খেলে। সিনেমায় এমন মেয়েদের দেখতে পাওয়া যায়, এরা সামনে আসলে অন্তরে খই ফোটে, ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠে - মনিকা ও মাই ডার্লিং। আমার মতন প্রিন্টেড লিলেন কাপড়ের কামিজ-সালোয়ার পরা তেলতেলে চুলের মেয়েরা এদের দিকে তাকিয়ে থাকি, আর এসব ভাবি। মনিকা সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আর আমি এসবই ভাবছি।”
মনিকার দৃঢ় ব্যক্তিত্বের বিপরীতে আম্মার এই নড়বড়ে সংসারকে নিজের করে রাখবার সংগ্রাম আর রান্নাঘর কেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতি গল্পের মূল সুর। গল্প জুড়ে রয়েছে মসলার কৌটা। মনিকার মসলার কৌটা। নানা রঙের স্বাদের ঘ্রাণের মশলায় ঠাসা কৌটাগুলো মনিকার অস্তিত্ব জানান দেয় গল্পে বারবার। শেষে এসে সেই মসলার কৌটোগুলো ভেঙে পড়ে, কিংবা আম্মা ভেঙে ফেলে। মনিকাকে ছাড়তে হয় আশ্রয়, নতুন ঘরের সন্ধানে। চলে যাওয়ার আগে মনিকা বলেছিল, “ মসলার কৌটোগুলো ফেলে কেন যে বারবার চলে যেতে হয়!”
আমি ভেবেছিলাম মনিকার গল্প হয়ে উঠবে “ মসলার কৌটা”। মসলার কৌটার পাঠকেরা আমাকে কতভাবে জানিয়ে গিয়েছে, “আপনি আমার মায়ের গল্প লিখলেন!” আমি প্রথম কয়েকবার বলতে চেয়েছিলাম, গল্পটা তো আসলে মনিকার ছিল ....”, বলিনি। কেউ যখন এসে বলল, “কেমন করে লিখলেন আমার মায়ের গল্প?” বুঝি, মায়েদের শঙ্কা অস্তিত্ব মমতা গ্রথিত “ মসলার কৌটা”র আম্মার মাঝে। আম্মা গল্পের সীমানা ছাড়িয়ে “আমাদের মা” হয়ে উঠল, কখন! কে জানে!
সে উত্তর জানি না দেখে আমি সাহিত্যের অলিগলিতে পথ হাঁটি নিখাদ কৌতূহলে। দুপুরবেলা আসনপিঁড়ি হয়ে বসে পাতারঙা নদীর ছায়ায় দেখি চরিত্রেরা ওই যে প্রান্তরে, ছায়ার পথে। আমার গল্প ফুঁড়ে তারা কেমন নিজ গল্পের নায়ক।
- বিষয় :
- গল্প