ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

আমারই চেতনার রঙে

পায়ের নিচে মাটি ও চারপাশে মানুষ

পায়ের নিচে মাটি ও চারপাশে মানুষ
×
×

শিল্পকর্ম :: মনিরুল ইসলাম

সুশান্ত মজুমদার

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

কথাসাহিত্যের অন্যতম অনুষঙ্গ চরিত্র। মানুষ ছাড়া কথাসাহিত্য হয় না। লেখক যখন মানুষকে নিয়ে লেখেন, সেই মানুষ সমাজে বাস করে, লেখকের আশপাশে বাস করে, লেখকের ভেতরে বাস করে। লেখালিখির অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, আমাকে আলাদা করে চরিত্র তৈরি করতে হয় না। যেসব মানুষকে আমি দেখেছি, যাদের সাথে মিশেছি এবং সার্বক্ষণিকভাবে দেখতে পেয়েছি, আমার বাস্তবতার ভেতরে যে মানুষগুলো বসবাস করে, তারা সবাই লেখকের চেনা মানুষ, দেখার মানুষ। তারা দৈনন্দিন যে জীবনযাপন করছে, তা আমি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি।
এ করতে গিয়ে আমি এমন এমন চরিত্রের খোঁজ পেয়েছি, সাধারণ মানুষ, অসাধারণ মানুষ, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত কিংবা হঠকারী দরিদ্র, সব মানুষকেই আলাদা করে খুঁজতে বা তৈরি করতে হয়নি। কারণ, আশপাশেই তারা বসবাস করত এবং আমার পরিবেশের মধ্যেই তারা ছিল। আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় একটি চরিত্র হলো, আজ থেকে বহু আগে, তখন বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়নি, উনসত্তরের গণআন্দোলনেরও আগে আমাদের পূর্ব বাংলায় কৃষক বিদ্রোহ ও আন্দোলন ছিল, যাকে আমরা বামপন্থি রাজনীতি বলি। সেই বামপন্থি রাজনীতির বিষয়বস্তু ছিল কৃষকদের আন্দোলনের মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহরকে ঘেরাও করা। যেহেতু আমাদের সমাজটা ছিল আধাসামন্ততান্ত্রিক ও কৃষিনির্ভর দেশ এবং কৃষকদের নিয়েই কাজ হতো, তাই আমাদের অঞ্চলের দুটি ঘাঁটি ছিল, একটা বিষ্ণুপুর, আরেকটা বাহিরদিয়া।
এখানে বামপন্থিদের সংগঠন ছিল এবং আমি নিজেও এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলাম বলে তা জানতে ও দেখতে পাই। কৃষকদের নিয়ে সংগঠন করা হতো, নিয়মিত তাদের বোঝানো হতো এবং সংগঠিত করা হতো। সেখানে এক বামপন্থি কর্মীর নাম ছিল জুবায়ের (মোহাম্মদ জুবায়ের) ডাকনাম নুমা। এই জুবায়ের পরবর্তীকালে কলেজ জীবনে আমারই ক্লাসমেট হলো। ধাপে ধাপে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলেও জুবায়ের বাম রাজনীতির একজন সাংগঠনিক কর্মী হিসেবে গ্রাম্য অঞ্চলে থেকে মানুষের সাথে মিশে তাদের রাজনৈতিক জ্ঞান দিত।
কিন্তু দেখা গেল, এই বামপন্থি রাজনীতির সবচেয়ে বড় একটা ত্রুটি ছিল, তারা মতাদর্শগতভাবে কখনও ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেনি। ঐক্যবদ্ধ না থাকার কারণে পরস্পরের প্রতি সন্দেহপ্রবণতা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে তাদের ‘ইনার কিলিং’ শুরু হলো, একে অন্যকে হত্যা করবে, ধ্বংস করবে এবং সংগঠনের নেতৃত্ব গ্রহণ করবে। এ সবকিছুর প্রভাব আসছিল চারু মজুমদারের রাজনীতি থেকে। পশ্চিমবঙ্গের যে নকশাল আন্দোলন, তার রাজনৈতিক প্রভাব পূর্ব বাংলার বিভিন্ন পয়েন্টে এসে পড়েছিল; সেখানে যা ঘটছিল, আমাদের এখানেও তাই ঘটছিল।
এই জুবায়েরকে মারার জন্য তার সাথেই যুক্ত এক রাজনৈতিক বন্ধু চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে সফল হয়নি। এরপরে ১৯৭১ সাল এলো, এলো মুক্তিযুদ্ধ... মুক্তিযুদ্ধে নুমা অসীম সাহসের পরিচয় দেয় এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
সে সময় আমাদের বাগেরহাট ছিল মহকুমা, জেলা হয়নি। বাগেরহাটের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান শহরটাকে পাকিস্তানের পক্ষে ঘাঁটি বানিয়ে ফেলেছিল। বাগেরহাটের পাশ দিয়ে নদী চলে গেছে, নদীর ওইপারে মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল এলাকা, যা ফরিদপুরের কাছাকাছি মধুমতী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শহরটার অবস্থা তখন অনেকটাই ক্যান্টনমেন্টের মতো হয়ে উঠেছিল।
নুমা কৃষ্ণপদ নামের তার এক ঘনিষ্ঠ সঙ্গীকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে বাগেরহাট শহরে প্রবেশ করে এবং শান্তি কমিটির ওই চেয়ারম্যানের বাড়ির পাশেই অবস্থান নেয়। পরদিন চেয়ারম্যান যখন প্রচুর সাঙ্গোপাঙ্গ ও পাকিস্তান আর্মি নিয়ে বের হতে যায়, তখন নুমা তাকে অতর্কিতে আক্রমণ করে। এই আকস্মিক আক্রমণে সবাই স্তম্ভিত হয়ে যায়। তার কাছে যে স্টেনগান ছিল, তা দিয়ে সে আক্রমণ চালায়; নুমা ও তার সঙ্গীরা গুলি করে শত্রুকে আহত করার পর দ্রুত দৌড়ে শহরের বাইরে নদী পার হয়ে সেফ সাইডে চলে আসে। বাগেরহাটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট ও শান্ত এই ভৈরব নদ আবার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে পরিচিত।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। নুমা আবার কলেজে গিয়ে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নে নাম লেখালেও ধীরে ধীরে বাস্তবতার কারণে, সাংসারিক চাপে এবং বৃদ্ধ বাবা-মার টানে রাজনীতি থেকে আস্তে আস্তে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। একসময়ে তিনি রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে ঢাকায় আসেন এবং একটি এনজিওতে চাকরি নেন। বর্তমানে তিনি একটি এনজিওতেই কর্মরত আছেন। তিনি এখন প্রায় প্রবীণ, আমার বয়সই হবে, আমার চেয়ে বড়জোর দুই-এক বছরের বড়।
এই চরিত্রটিকে কেন্দ্র করে আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একাধিক উপন্যাস লিখেছি। সমকালেও নুমাকে নিয়ে উপন্যাস ছাপা হয়েছে। নুমা আমার অত্যন্ত প্রিয় একটি চরিত্র, যে এত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ করেও জীবনে কিছুই পায়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা যারা মফস্বলে বা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন, তাদের কোনো প্রাপ্তি নেই। একটা ভাতার টাকা দেয়, তাও অনিয়মিত এবং সময়মতো দেয় না।
নুমা কখনোই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারি চাকরি বা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। অথচ তাঁর সেই সুযোগ ছিল। আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই, তবে নুমা তাদের মধ্যে একজন বেঁচে থাকা মানুষ। নুমা কখনোই আমাকে বলেননি যে তাঁকে নিয়ে কিছু লেখো; বরং নিজের ভেতরের তাড়না থেকেই তাঁকে এই চরিত্রের রূপ দিয়েছি। কোনো কাল্পনিক বা অতিরিক্ত অনুষঙ্গ ব্যবহার না করেই তাঁকে বাস্তব জীবন থেকে তুলে এনেছি।

এমন আরেকটি ঘটনার কথা বলি। একবার এক সাধারণ মানুষকে নিয়ে ঘটনা ঘটেছিল। মওলানা ভাসানী রোডসংলগ্ন আমার বাসার ভেতরে একটা টিনের ঘর ছিল। আমি একদিন কোথাও যাওয়ার সময় হঠাৎ বৃষ্টি পড়ায় দৌড়ে একটা দোতলা বিল্ডিংয়ের নিচে আশ্রয় নিই। সেখানে দেখলাম এক বৃদ্ধ, জরাজীর্ণ ও দরিদ্র মানুষ, যিনি রাস্তাঘাট থেকে কিছু কুড়িয়ে এনেছেন, চেহারা মলিন অবস্থায় সেখানে বসে আছেন। তিনিও বৃষ্টির কারণেই সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
আমি খুব মনোযোগের সাথে তাঁকে দেখতে লাগলাম এবং পরে তাঁর সাথে কথা বললাম। তিনি জানালেন, তাঁর বাড়ি বরিশালের দিকে। তাঁর ছেলে ও ছেলের বউ তাঁকে বয়সের ভারে সংসারের বোঝা মনে করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। তাই তিনি লঞ্চে করে ঢাকায় এসে ফুটপাতে ও বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন কাটাচ্ছেন। বৃষ্টির সময় তিনি ওই জায়গাটায় আশ্রয় নেন। আমি তখন টের পেলাম ভেতরের রান্নাঘর থেকে রান্নার সুবাস আসছে...
ওই বৃদ্ধ লোকটির কথা যদি বলি, তিনি ক্ষুধার্ত এবং নির্বাক হয়ে উশখুশ করছিলেন। রান্নার ওই গন্ধ তাঁকে আরও বেশি ক্ষুধার্ত করে তুলছিল। এক পর্যায়ে তাঁর বুক থেকে বেরিয়ে এল, ‘মুই খামু’ (মানে আমি খেতে চাই)। এটাকে আমার তৈরি করতে হয়নি, আমি এটিকে নিয়ে একটা গল্প লিখি। ওই দরিদ্র লোকটিও জানে না যে আমি তাকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছি।
পল্টনের গাজী ভবন হওয়ার সময়, যখন কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে, তখন চতুর্থ তলা থেকে ঢালাই করার সময় একজন শ্রমিক পড়ে যায় এবং মারা যায়। এখন গাজী ভবনের যারা স্বত্বাধিকারী, তারা এই নিহত যুবকের আত্মীয়স্বজন, মানে তার বউ, একটা বাচ্চা, একটা ছোট ভাই ও বাবাকে বরিশালের চরমৈশন্দী থেকে ডেকে পাঠাল। সিদ্ধান্ত হলো, সামনে আইএফআইসি ব্যাংকে তাঁর স্ত্রীর নামে একটা অ্যাকাউন্ট করে দেওয়া হবে এবং কিছু টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে সেই শিশুটি বড় হলে প্রতি মাসে যে ইন্টারেস্ট পাবে, তা দিয়ে তাদের সংসার চলে। আর ছোট ভাইকে এখানে গার্ডের চাকরি দিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু শ্বশুর এসে এর বিরোধিতা করলেন কেন? কারণ, বউয়ের বয়স কম, যদি সে অন্য কোথাও বিয়ে বসে, তবে এই টাকার কী হবে? তাদের ভেতরের অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে কোন্দল শুরু হলো। আমি সামনে বসে এই ঘটনাটি দেখলাম এবং একটি গল্প লিখলাম, যার নাম ‘চরমৈশন্দীর মানুষ’। আমার একটি গল্পের বইয়ের নামও ‘চরমৈশন্দীর মানুষ’।
আরেকটি গল্প, ‘মহিমা কোথায়?’ এটি ছাপা হয়েছিল ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায়। আমি চামেলীবাগে থাকি। চামেলীবাগের যে রাস্তায় আমি থাকি, বিকেল হলেই সেই রাস্তা জনবিরল হয়ে যায়, অন্ধকার থাকে, ঠিকমতো রোডলাইট জ্বলে না, আর ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে যায়। আমি নাতির জন্য ফুটপাত থেকে একজোড়া মোজা কিনে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় জমে থাকা পানি পেরিয়ে হেঁটে আসছি। আসার সময় হঠাৎ শুনতে পেলাম, ওপর থেকে, একটি বিল্ডিংয়ের দোতলা থেকে কে যেন ডাকছে, ‘মহিমা, ও মহিমা!’ আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। এত সুন্দর নাম মহিমা, নিশ্চয়ই কোনো মেয়ের নাম! আমি দেখতে চাইলাম সে কি খুকি, কিশোরী, কোনো বধূ নাকি? কিন্তু মহিমাকে দেখতে পেলাম না।
পরদিন আমি মহিমাকে দেখার জন্য ওই জায়গায় গেলাম। ওই জায়গায় কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি ভাসমান ছোট বাজারও বসে। হাঁটতে হাঁটতে সামনে গিয়ে দেখি, বিপুল বিক্রমে প্রায় যুদ্ধ করার মতো করে একটি পুরোনো বিল্ডিং ভাঙা হচ্ছে আর একটি নতুন বিল্ডিং উঠছে। পুরোনো বিল্ডিং ভাঙার ইটপাটকেল চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, এগুলো আবার বিক্রিও হয়। হঠাৎ আমি দেখি, ইটের স্তূপের ভেতরে সবুজ রঙের বাংলাদেশের পতাকার মতো কী যেন একটা পড়ে আছে। হ্যাঁ, আমি ইটপাটকেল সরিয়ে দেখি ওটা সত্যি একটি বাংলাদেশের পতাকা! যারা বিল্ডিং ভাঙছে কিংবা যারা ইট ফেলে গেছে, তাদের কেউ এই পতাকাটি খেয়াল করেনি। ইটপাটকেলের নিচে চাপা পড়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের পতাকাটি তখনও অক্ষত ছিল, একটুও ছিঁড়েনি। আমি সেটি কুড়িয়ে বের করলাম। ঠিক সেই সময়ই ওইখান থেকেই আবার আওয়াজ আসছে, ‘ও মহিমা, মহিমা’ বলে ডাক। আমার কাছে মনে হলো, মহিমা তো এই বাংলাদেশের পতাকাটিই! এই যেন পতাকারই ডাক আসছে। আমাকে বানাতে হয়নি, এটা তো বাস্তব। আমি এই গল্পটি কিছুদিন আগে একজনকে বলেছি, গল্পটি ‘কালি ও কলম’-এ ছাপাও হয়েছে। আপনি লক্ষ্য করুন, এই চরিত্রটিকে আমি সশরীরে দেখিনি, শুধু ডাক শুনতে পেয়েছি; কিন্তু কল্পনায় মহিমাকে কোথায় নিয়ে গেলাম? বাংলাদেশের পতাকা দেখে মনে হলো, এটাই তো মহিমা, যা এখনও অক্ষত আছে।
আমি আপনাকে বলি, যেমন ধরেন, আমার একটিও প্রেমের গল্প নেই। সত্যি! আমার কাছে মনে হয়েছে প্রেমের গল্প লেখা খুব কঠিন। হতে পারে যারা লেখেন, তাদের জন্য সহজ; কিন্তু আমার কাছে গল্পের রসদ জোগায় আমার বিরাজমান বাস্তবতা, পায়ের নিচের মাটি এবং চারপাশের মানুষগুলো। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত যাদের দেখছি, তাদের প্রত্যেককেই আমার কাছে গল্পের চরিত্র বলে মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, ওদের কথা একটু লিখে দিলেই বুঝি গল্প হয়ে যায়। সত্যি তাই! এর ফলে চরিত্র নির্মাণের জন্য আমাকে কখনও কাল্পনিক গল্প বা কাহিনির আশ্রয় নিতে হয়নি।
যেমন ধরেন যে চরিত্রটাকে আমি দেখিনি, তাকে আমি মহিমার রূপ দিলাম। আবার রাস্তা দিয়ে আমি বছরখানেক আগে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, এখন তো দেখা যায়, ফুটপাতে মোটরসাইকেলও চলে, তাই না? পেছন দিক থেকে এসে এক যুবক আমাকে ধাক্কা দিল এবং ধাক্কা লাগায় আমার চশমাটা পড়ে ভেঙে গেল। সে পেছন থেকে শুধু বলল, ‘সরি!’ ব্যস, এক ‘সরি’ শব্দ দিয়েই সে তার দায়িত্ব শেষ করল, আর আমাকে চশমা মেরামত করতে হলো! দুপুরবেলা কোত্থেকে যেন বিভিন্ন জায়গা থেকে প্লাস্টিক বা লোহার চেয়ার নিয়ে এসে এই যুবকরা চারপাশ থেকে আড্ডা দেয়। পেছনে একটা ব্যাংক আছে, আর এদের এই নিয়মিত উপস্থিতির কারণে পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটাই ওই জায়গা থেকে চলে যায়। এই জায়গারই এক যুবক, সে ওই এলাকার নেতা। সে একটা মেসে সাবলেট থাকত, মানে এক রুমে দুই-তিনজন মিলে যেভাবে থাকে। রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে ঘুরে বেড়াত, ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব তো আমি লক্ষ্য করেছি।
সেই যুবক কালক্রমে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগ পেয়ে এখন এলাকার বড় ‘নেতা’ বনে গেছে, সাথে আছে অনেক শিষ্যবর্গ। সে চামেলীবাগে একটি ফ্ল্যাট কিনেছে এবং তার বারান্দার ফুলের টবগুলো দেখাশোনা করার জন্য দুজন সহচর বা আস্তানা রয়েছে। শান্তিনগর বাজার থেকে প্রতিদিন তার জন্য বিনা পয়সায় বাজার আসে, ওটা আসলে এক ধরনের চাঁদাবাজি।
তা, একে নিয়ে লিখতে হলে বা যখন লিখি, তখন কি আমাকে বানিয়ে লিখতে হয়? কিন্তু কী হয়েছে? হয়তো তাদের নামধাম আমি ব্যবহার করিনি, কিন্তু আমি আসলেই এদেরকে নিয়ে লিখেছি। এ কাণ্ডও ঘটছে।
আবার আমি এমন অবস্থাও দেখেছি গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, ঋণী। মুক্তিযুদ্ধই আমাকে লেখক বানিয়েছে। তা না হলে আমার এ রকম চোখ-কান বা মাথা কোনো কিছু খুলত না।
বাগেরহাটের একটা উপজেলায়, কচুয়া উপজেলার মঘিয়া ইউনিয়নে, একটি সাধারণ হিন্দু পরিবার থাকত। সেখানকার এক বৃদ্ধ ও তাঁর একমাত্র ছেলে। কিছু মাস্তান বাহিনী এসে ওই বৃদ্ধের বাগানের একটা বড় গাছ চাঁদা বাবদ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। ওই গাছটা বৃদ্ধ লোকটা জমিয়ে রেখেছিল, এই গাছ বিক্রি করে মেয়ের বিয়ে দেবে। যে গাছ কাটছে, তাদের দু-একজন আবার এই বাসার ছেলেটার সাথেই পড়াশোনা করত। লজ্জার কারণে তারা একটু গামছা দিয়ে মুখ আড়াল করার চেষ্টা করছিল।
ভিটেমাটির এই জমা-খরচ দিতে হচ্ছে, বৃদ্ধ বললেন যে কিছুই করার নেই। ভিটেমাটি রক্ষা করতে হলে ও টিকে থাকতে হলে এখানে এই খরচ দিতে হচ্ছে, তিনি দুঃখ করে কথাটি বললেন। সব ঘটনা আমরা একা দেখি না, সারা বাংলাদেশের সর্বত্রই হয়। 
আবার দেখেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে বা বিগত সরকারের আমলে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচার হয়েছে, তাই না? আমরা জানি, হয়েছেও, কজনকে ফাঁসি কাঠেও ঝুলতে হয়েছে। আমার এক চরিত্র, গ্রামে যাওয়ার পর সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমনে বাবু, এসব হবে?’ সে চরিত্রটা বিশ্বাসই করতে পারছে না। সে আমার চেয়ে বয়সে বড়, নিজেও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
কেন এমন হলো? একজন মুক্তিযোদ্ধার নাতি বিয়ে করছে একাত্তরের এক দালালের নাতনিকে। তাদের প্রেমের বিবাহ, পরিবার থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। এই বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার মনে তখন সন্দেহ জাগে, মুক্তিযুদ্ধ করা একটা পরিবার একাত্তরের দালাল পরিবারের মেয়েকে কীভাবে বিয়ে করে? তাহলে তাদের বিচার হওয়া নিয়ে সে আমার কাছে সন্দেহ প্রকাশ করে। এবং এই সন্দেহ তো বাস্তব। আমরা তো গুটিকয়েক লোককেই সামনে চিনি, যাদের নামধাম জানি; কিন্তু হাজার হাজার এমন মানবতাবিরোধী অপরাধী তো রয়ে গেছে, যাদের কিছুই হয়নি। এটা নিয়ে আমি গল্প লিখেছি।
যা দেখলাম, জানলাম, শুনলাম, পড়লাম, এগুলো সবই অভিজ্ঞতার অংশ। সেই অভিজ্ঞতা যখন লিখতে হবে, মানে আমি যখন কোনো স্টোরি বা কাহিনি লিখব, কথাসাহিত্য রচনা করব, তখন লিখতে গেলে কতগুলো বিষয়-উপকরণ প্রয়োজন হয়।
যেমন ধরেন, দুধ থেকে সাদা রংটাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি কখনোই বিষয়বস্তুকে লিপিকৌশল, যাকে আমরা ভালো বাংলায় ‘আঙ্গিক’ বলি, তার থেকে আলাদা করা যাবে না। এজন্য আঙ্গিক নিয়ে লেখককে ভাবতে হয়, লিখতে হয় এবং লেখার সময় তাকে সচেষ্ট ও সচেতন থাকতে হয়। আপনি লক্ষ্য করবেন, বাংলা সাহিত্যের যারা উল্লেখযোগ্য, ব্যতিক্রমী ও শক্তিমান লেখক, প্রত্যেকেরই লেখার ভাষা আলাদা। তারা নিজেরাই তো কথাসাহিত্যে নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছেন, তাদের আঙ্গিক আলাদা।
আপনি বিভাজন-উত্তর যুগের কথা বাদ দেন, আমাদের বাংলাদেশের কথাই আসেন। আপনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, মাহমুদুল হক, কায়েস আহমেদ, এই সমস্ত শক্তিমান লেখকের সবার যেমন বিষয় আলাদা, তেমনি প্রত্যেকের ভাষা আলাদা, তাদের আঙ্গিক নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হয়নি। তারা উপযুক্ত লিপিকৌশল তৈরি করতে পেরেছেন বলেই আজ বেঁচে আছেন। কারণ, শুধু স্টোরি বা শুধু কাহিনি কিন্তু টিকে থাকে না। 
কাহিনি যার ওপরে নির্ভর করে থাকে, যেমন একটা বিল্ডিং তৈরি করতে হলে মজবুত সব বিষয়-উপকরণ দিতে হয়, এই উপকরণও কিন্তু আলাদা করে ভাবার কিছু নেই, লিখতে গেলেই তা চলে আসে এবং এ বিষয়ে একটু সচেতন থাকলেই যথেষ্ট। আমিও সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকার চেষ্টা করেছি। 

আরও পড়ুন

×