ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নদী

গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বছর

গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বছর
×

শেখ রোকন

শেখ রোকন

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৩ | আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ | ১২:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

গঙ্গা অববাহিকার ক্ষেত্রে নেপাল গুরুত্বপূর্ণ দেশ হলেও সেটাকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে। চুক্তি নিয়ে কোনো দ্বিমত বা বিরোধ তৈরি হলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে তৃতীয় পক্ষের যে সালিশি ব্যবস্থা রাখা হয়, গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রে সেটাও অনুপস্থিত।
 

বিদায়ী বছরটি যখন ‘নতুন বছর’ হিসেবে কড়া নাড়ছিল, তখন সমকালেই লিখেছিলাম ‘২০২৫ সালে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে ৫ চ্যালেঞ্জ’। এগুলো হলো– এক. গঙ্গা চুক্তির নবায়ন; দুই. তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি বা মহাপরিকল্পনা; তিন. ব্রহ্মপুত্রে চীন-ভারতের মেগাড্যাম; চার. ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প; পাঁচ. রাষ্ট্রীয় রক্ষাকবচের অহেতুক অভাব।

২০২৬ সালে এসেও চ্যালেঞ্জগুলো মোটামুটি অভিন্নই রয়ে গেছে। অবশ্য বিদায়ী বছরের মধ্যভাগে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি বা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আশার আলো দেখা গিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও কেউ কেউ বলছিলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসেই চীনা অর্থায়নে বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সমকালকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি আমরা তিস্তা প্রকল্পের কাজটা শুরু করে দিতে পারব’ (১০ আগস্ট ২০২৫)। তৎকালীন অপর উপদেষ্টা, সরকারে থাকা ‘ছাত্র প্রতিনিধি’ আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, জানুয়ারিতেই শুরু হতে যাচ্ছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ (১২ নভেম্বর ২০২৫)।

রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের কারও কারও দাবি ছিল, ২০২৬ সাল পর্যন্তও অপেক্ষা করা যাবে না। বিশেষত রংপুর অঞ্চলে বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’ গত বছর ফেব্রুয়ারি ও অক্টোবরে যেসব কর্মসূচি নিয়েছিল, সেখানে দাবি করা হয়েছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগেই কাজটি শুরু করতে হবে। তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বাসসকে বলেছেন, ‘সরকার যদি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে আগামী নভেম্বর মাসে নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু না করে, তবে তিস্তাপারের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। অচল করে দেওয়া হবে গোটা উত্তর অঞ্চল।’ (বাসস, ২৪ অক্টোবর ২০২৫)

আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা ও বিবেচনা সম্বল করে প্রবল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তখনই বলেছিলাম, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কাজ শুরুর কোনো সম্ভাবনা নেই। কেবল চীন যে ‘অনির্বাচিত’ সরকারের সঙ্গে এত বড় প্রকল্প নিয়ে বাজি ধরতে রাজি হবে না এমন নয়; যে রাজনৈতিক দলটি নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দাবিদার, সেই বিএনপিও সম্ভবত চাইবে না যে রংপুর অঞ্চলের জন্য বিপুল সম্ভাবনাময় এই প্রকল্পের রাজনৈতিক মুনাফা আর কারও ঘরে যাক। আগ্রহীরা এ বিষয়ে বিস্তারিত পড়তে পারেন আমার নিবন্ধ– ‘নির্বাচনের আগেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু সম্ভব?’ (সমকাল, ২৬ অক্টোবর ২০২৫)।

এই প্রেক্ষিত থেকে দেখলে, ২০২৬ সালকে ‘তিস্তা বর্ষ’ মনে হতেই পারে; কিন্তু বাস্তবে ২০২৬ সাল হতে যাচ্ছে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বছর। ১৯৯৭ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি এখন পর্যন্ত কার্যত একমাত্র কার্যকর সমঝোতা। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ফেনী নদী এবং ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কুশিয়ারা নদী নিয়ে যদিও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো পরিমাণ ও গুণগত দিক থেকে যেমন গঙ্গা চুক্তির সঙ্গে তুলনীয় নয়; তেমনই সমঝোতা স্মারক দুটি স্বাক্ষর পর্যন্তই শেষ। বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি মূলত তিস্তা চুক্তি নিয়ে অচলাবস্থার কারণে।

সন্দেহ নেই, পানি ভাগাভাগীর ক্ষেত্রে কার্যকারিতা সত্ত্বেও গঙ্গা চুক্তি নিয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ফারাক্কা ব্যারাজ পয়েন্টে প্রবাহ পরিমাপ করে তার ভিত্তিতেই ভাগাভাগী হয়। অথচ এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে গোটা নদীকে ‘সিঙ্গেল ইউনিট’ ধরে পানি বা প্রবাহ হিসাব করতে হয়। অন্যথায়, উজানে পানি প্রত্যাহার হলে ভাটির দেশের বলার কিছু থাকে না।
গঙ্গার ক্ষেত্রে বাস্তবেও সেটা ঘটেছে। যেমন, আমরা কেবল পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজের কথা জানি। কিন্তু ২০১৭ সালের মার্চে ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক ‘ভূমিধস’ প্রতিবেদনে আমাদের বন্ধু ও সহযোদ্ধা আবু বকর সিদ্দিক দেখিয়েছিলেন, আরও উজানে বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ডে অন্তত ২৯টি ‘ছোট’ ড্যাম বা ব্যারাজ রয়েছে। ফারাক্কার পানি প্রত্যাহার ক্ষমতা যেখানে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার কিউসেক, এগুলোর সম্মিলিত পানি প্রত্যাহার ক্ষমতা সেখানে অন্তত দুই লাখ ৯২ হাজার কিউসেক। তার মানে, গঙ্গার ছোট ছোট ড্যাম ও ব্যারাজগুলো আলোচনার বাইরে থেকেই ফারাক্কার তিন গুণের বেশি পানি প্রত্যাহার করছে!

দ্বিতীয় মৌলিক প্রশ্নটি হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদনদীর পানিবণ্টন চুক্তি সাধারণত মেয়াদি হয় না, স্থায়ী হতে হয়। অন্যথায়, নির্দিষ্ট মেয়াদ পরপর নবায়নের প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। গঙ্গার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। যেখানে নির্দিষ্ট মেয়াদের পর চুক্তির বিভিন্ন ধারা প্রয়োজনে পর্যালোচনা হতে পারত, সেখানে খোদ চুক্তিটিই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

তৃতীয়ত, বৃহৎ নদীগুলোর ক্ষেত্রে চুক্তি হতে হয় বহুপক্ষীয়, অববাহিকার সবগুলো দেশকে নিয়ে; এটাই আন্তর্জাতিক আইন ও রেওয়াজ। কিন্তু গঙ্গা অববাহিকার ক্ষেত্রে নেপাল গুরুত্বপূর্ণ দেশ হলেও সেটাকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে। চুক্তি নিয়ে কোনো দ্বিমত বা বিরোধ তৈরি হলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে তৃতীয় পক্ষের যে সালিশি ব্যবস্থা রাখা হয়, গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রে সেটাও অনুপস্থিত।

২০২৬ সালের ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব মৌলিক প্রশ্নের সুরাহা কেবল নয়, বাংলাদেশকে চুক্তিটির নবায়নও সম্ভব করে তুলতে হবে। প্রশ্নটি কেবল কারিগরি নয়, রাজনৈতিকও। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারত যখন ‘সুবর্ণ অধ্যায়’ পার করছিল, তখনই গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে প্রতিবেশী দেশটি নানা যদি, কিন্তু, তবে অবতারণা করেছিল। মনে আছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরপরই এ ব্যাপারে কথা উঠেছিল ভারতে। দেশটির বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল প্রতিষ্ঠিত ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ লিখেছিলেন, ‘পানিবণ্টনের ইস্যুতে ২০২৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি নতুন করে মনোযোগ টেনে নেবে। কেবল অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহ নয়, বরং সেগুলোর পানি ঘাটতি বণ্টনের মধ্যেও সমাধান খুঁজে পেতে হবে।’ 

বলা বাহুল্য, ভারতের বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতিষ্ঠিত থিঙ্ক ট্যাঙ্কে প্রভাবশালী কূটনীতিকের ওই নিবন্ধের সারমর্ম উদ্ধারের জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। পরবর্তী সময় ভারতীয় নদী গবেষকদের কারও কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপে বুঝেছি, ভারত তখনই চাইছিল যে গঙ্গা চুক্তিটি আগের মতো হুবহু নবায়ন না করতে। নানা ছুতায় বাংলাদেশকে প্রাপ্য পানি বরং কম দিতে। এখন তো পরিস্থিতি আরও কঠিন। খোঁজ নিয়ে যতদূর জেনেছি, গঙ্গা চুক্তি নবায়নে আমাদের প্রতিবেশী দেশটির অত ‘গরজ’ নেই। গত দেড় বছরে অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের পক্ষে ইস্যুটি যতবারই তোলা হয়েছে, ভারতের দিক থেকে ‘কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চলছে’ জাতীয় গৎবাঁধা উত্তর দেওয়া হয়েছে। ফলে, মেয়াদ শেষের আগেই চুক্তিটির নবায়ন ২০২৬ সালে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে মূলত কাদের? সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বড় কোনো ‘অঘটন’ না ঘটলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল মনে করছে, বিএনপি ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে ডিসেম্বর মাসে যখন যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশ ফিরছিলেন, তখনই আন্তর্জাতিক অনেক মিডিয়া তাঁকে ‘ভাবি প্রধানমন্ত্রী’ আখ্যা দিয়েছিল। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে দলটিকে অপ্রস্তুতও মনে হয় না। নভেম্বর মাসেই গঙ্গা অববাহিকার কয়েকটি জনপদে দলটিকে ‘আমাদের গঙ্গা-পদ্মা, আমাদের অধিকার’ এবং ‘ন্যায্য পানিবণ্টনে হোক সমাধান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে মতবিনিময় সভাও করতে দেখা গেছে। কিন্তু বিষয়টি বহুলাংশে কূটনৈতিক। অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও সভা-সমাবেশ নিঃসন্দেহে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখবে; কিন্তু মূল কাজটি করতে হবে কূটনৈতিকভাবেই।

এ ক্ষেত্রে প্রথম করণীয় হচ্ছে, আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ নিশ্চিত করা। রংপুর অঞ্চলে পালিত কর্মসূচির সময়ই লিখেছিলাম ‘তিস্তা নিয়ে বিএনপি আরও যা করতে পারে’ (সমকাল, ২ মার্চ ২০২৫)। সেখানে বলেছিলাম, ‘দুই দিনের কর্মসূচির সমাপনীতে তারেক রহমান তিস্তা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক আইন কাজে লাগানোর কথাও বলেছেন। আমরাও অনেক দিন ধরে বলে আসছি, বাংলাদেশের উচিত জাতিসংঘ পানি প্রবাহ সনদ ১৯৯৭ অনুস্বাক্ষর এবং জাতিসংঘ পানি সনদ ১৯৯২ স্বাক্ষর করা। মুশকিল হচ্ছে, গত প্রায় তিন দশকে সব রাজনৈতিক দলই বিরোধী দলে থাকতে ভাটির দেশের এসব রক্ষাকবচ ব্যবহারের কথা বলে। ক্ষমতায় গিয়ে ভুলে যায়।’ 

আশার কথা, অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে ১৯৯২ সালের জাতিসংঘ পানি সনদ স্বাক্ষর করেছে। এখন এর বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করতে হবে নতুন সরকারকে। এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হওয়ার পরপরই লিখেছিলাম, ‘জাতিসংঘ পানি সনদ: নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ব্যবহারিক প্রশ্ন’ শীর্ষক নিবন্ধ লিখেছিলাম (সমকাল, ৪ মে ২০২৫)।

আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচবিষয়ক এই পরামর্শ গঙ্গা চুক্তির নবায়নের ক্ষেত্রে তো বটেই, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার অভিন্ন সব নদী বিষয়েও প্রযোজ্য। কিন্তু গঙ্গা চুক্তির সময়োচিত নবায়নের জন্য এর বাইরেও আসন্ন সরকারের জন্য নতুন বছরে দ্বিতীয় আরেকটি করণীয় রয়েছে; ভারতের দিক থেকে ‘কারিগরি পর্যায়ে’ আলোচনার যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে, সেই ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। কারণ, এটা নতুন কোনো চুক্তি হচ্ছে না; তিন দশক আগে স্বাক্ষরিত এবং তিন দশক ধরে কার্যকর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে মাত্র। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা; কারিগরি চাপন-উতার নয়। সেটা খোলাখুলিও বলতে হবে। 

এই খোলাখুলি বলা বা দরকষাকষির প্রশ্নেও সামনে আসে তৃতীয় করণীয়। অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন বিষয়ে বিশ্বের অন্যান্য চুক্তির দিকে তাকালে স্পষ্ট হবে, কেবল ‘নদীর পানি’ বণ্টন আলোচনায় ভাটির দেশের জন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করা কঠিন। কারণ, নদীর পানি মানেই ভাটির দেশের অনিবার্য নির্ভরশীলতা; বিশেষ যেখানে বহুপক্ষীয় চুক্তি বা আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ নেই। সে ক্ষেত্রে ব্যবহার হতে হয় পারস্পরিক নির্ভরশীলতার অন্যান্য ইস্যু। প্রতিবেশী যে কোনো দেশেরই পারস্পরিক যে নির্ভরশীলতা থাকে, সেগুলোকে ‘ট্রেড অফ’ করতে হয়। দুর্ভাগ্যবশত, ভারতের সঙ্গে নদীবিষয়ক আলোচনায় বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাগুলো আগে কখনও কাজে লাগায়নি। 

সন্দেহ নেই, সবচেয়ে ভালো অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা; নদীর পানিবণ্টনের বদলে সুফল ভাগাভাগি। মেকংয়ের ক্ষেত্রে কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম যেভাবে অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেছে, সেটা গঙ্গার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, ভারত, নেপালও করতে পারে। কিন্তু অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার পূর্বশর্ত অববাহিকাভিত্তিক অধিকার। দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় স্থায়ী চুক্তি বা আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ ছাড়া সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা কীভাবে সম্ভব? 


লেখক: নদী গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল

আরও পড়ুন

×