আহমদ রফিক : গবেষণাই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে
আহমদ রফিক (১৯২৯-২০২৫)
সাইফুজ্জামান
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলে গেলেন ভাষাসংগ্রামী, কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক আহমদ রফিক। ২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দীর্ঘ রোগভোগের পর ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ৯৬ বছর বয়সে তিনি মারা যান। আহমদ রফিকের জন্ম ১২ সেপ্টেম্বর ১৯২৯ সালে, সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি ১৯৪৭ সালে নড়াইল হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা, ১৯৪৯ সালে মুন্সীগঞ্জের সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ১৯৫৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন।
চিকিৎসক হয়েও তিনি সারাজীবন কাজ করেছেব গবেষণায়। বহুমাত্রিক তথ্য ও তত্ত্ব তালাশ করেছেন। মেডিকেল কলেজে পড়ার সমর বামপন্থি রাজনীতিতে তিনি জড়িত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। দুই বছরের আত্মগোপন শেষে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার কারণে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি, যদিও এমবিবিএসের ফলে তাঁর স্থান ছিল মেধা তালিকায়। ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে নিয়ে আসে ইতিহাসের পাদপ্রদীপের আলোয়। ১৯৫২ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে তিনি ছিলেন অগ্রণী। মিছিলে থেকেছেন; ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করেছেন পাকিস্তানি পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে। প্রথম শহীদ মিনার তৈরি হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে। এ স্তম্ভ নির্মাণে (১০ ফুট উঁচু, ৬ ফুট চওড়া) অসামান্য অবদান রাখেন আহমদ রফিক।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা সম্প্রসারণে তাঁর তাত্ত্বিক অবস্থান অমোচনীয়। ভাষা আন্দোলন, সমাজসেবা, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ বিষয়ে তিনি বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে রচনা করেছেন অনেক গ্রন্থ। নিজের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার পাশাপাশি বিদেশি ভাষা ও জ্ঞানেও বাঙালিকে বিশেষভাবে দক্ষ হতে হবে– বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। মাতৃভাষা বাংলায় মেডিসিন ও অ্যানাটমির টেক্সট তৈরি করেছেন আহমদ রফিক।
আহমদ রফিক মূলত কবি। তাই তো তিনি উচ্চারণ করেন ‘দেশ খুঁজেছি, মানুষ খুঁজেছি/ শতকের পর শতক শেষ/ ভূখণ্ড ঘিরে ভাষাও পেয়েছি/ তবু জোটেনি কল্যাণী দেশ।’ ষাট দশক থেকে ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণায় তিনি মনোযোগী হন। গ্রন্থ রচনা, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে সাংগঠনিক ধারায় তিনি যুক্ত থেকেছেন।
তাঁর দৃষ্টি নৈর্ব্যক্তিক। পর্যবেক্ষক হিসেবে যা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর, তা তিনি করেছেন দায় থেকেই। ১৯৫৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে। তিনি সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির জগতে সার্বক্ষণিক অবস্থান নিয়ে সারাজীবন তাঁর অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা ও কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর হাতে সমালোচনা সাহিত্যঋদ্ধ হয়েছে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনে পাকিস্তান সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর বিরোধিতা ও রবীন্দ্র স্মরণে আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনার ও গবেষণায় অগ্রবর্তী ছিলেন আহমদ রফিক। তিনি রবীন্দ্র চর্চাকেন্দ্রের মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধানে ছিলেন নিবেদিত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতি তাঁর আগ্রহ সর্বজনবিদিত। নানাজনকে দুই হাতে সাহায্য করেছেন। সমস্ত অর্থ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ডকে দান করেছেন। তাঁর লেখালেখিই ছিল উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম।
নিঃসন্তান এই মানুষকে মৃত্যুর আগে বহু বছর একাকী থাকতে হয়েছে। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অনেক দিন নিজে লিখতে পারেননি। তাঁকে সঙ্গীর সাহায্যে লিখতে হয়েছে। একটি উপন্যাস রচনা শুরু করেছিলেন, শেষ করতে পারেননি। ভাষা আন্দোলন জাদুঘরের উদ্যোক্তা ছিলেন আহমদ রফিক।
বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৯), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিল্প সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্রপদক (২০১১), একুশে পদক (১৯৯৫) সম্মাননায় তিনি ভূষিত হয়েছেন। ১৯৯৭ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য উপাধি দেওয়া হয় তাঁকে।
ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখি করেছেন। আজীবন গবেষণা ও সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তিনি যুক্ত থেকেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: নির্বাসিত নায়ক (১৯৬৬), বাউল মাটিতে মন (১৯৭০), রক্তের নিসর্গে স্বদেশ (১৯৭৯), বিপ্লব ফেরারী তবু (১৯৬৯), পড়ন্ত রোদ্দুরে (১৯৯০), তাজী কবিতা (১৯৯৮), ভালোবাসা ভালো নেই (১৯৯৯), নির্বাচিত কবিতা (২০০১), মিশ্র অনুভূতির কবিতা (২০১০), এক গুচ্ছ রাজনৈতিক কবিতা (২০১০); ছোটগল্প গ্রন্থ: অনেক রঙের আকাশ (১৯৬৬)। প্রবন্ধ গবেষণামূলক গ্রন্থ: শিল্প সংস্কৃতি জীবন (১৯৫৮), নজরুল-সংস্কৃতি জীবন (১৯৫৮), আরেক কালান্তর (১৯৭৭), বুদ্ধিজীবীর সংস্কৃতি (১৯৮৬), রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ (১৯৮৭), ছোটগল্প: পদ্মাপর্বের রবীন্দ্রনাথ, একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস (১৯৮৮), ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য (১৯৯১), ভাষা আন্দোলনের কিছু স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা (১৯৯৩), এই অস্থির সময় (১৯৯৬), জতিসত্তার আত্ম অন্বেষা, বাঙালি বাংলাদেশ (১৯৯৭), রবীন্দ্রভুবনে পতিসর (১৯৯৮) প্রভৃতি।
আহমদ রফিকের অনন্তের যাত্রা শান্তিময় হোক। গবেষণার জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
সাইফুজ্জামান: প্রাবন্ধিক ও জাদুঘর কর্মকর্তা
- বিষয় :
- আহমদ রফিক
