প্রবীণদের অবহেলা নয়
শায়লা নাজনীন
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সড়কে হেঁটে যাওয়া এক বৃদ্ধকে দেখলেই আমরা হয়তো চোখ ফেরাই। বাসে উঠলে তাঁর জন্য সিট ছেড়ে দিতে অনেকেই দ্বিধা বোধ করি। পরিবারের ভেতরেও ছবিটা খুব ভিন্ন নয়। একসময় যেসব মানুষ পরিবার নামের বৃক্ষকে জল, মাটি, আলো দিয়ে বড় করেছেন; বয়সের শেষ প্রান্তে এসে তারাই হয়ে ওঠেন অপ্রয়োজনীয়। এ যেন সময়ের নির্মম পরিহাস। যখন শক্তি ছিল, তারা ছিলেন প্রয়োজনীয়; যখন শক্তি ফুরিয়ে এলো, তারা হয়ে গেলেন বোঝা।
আমাদের সমাজে প্রবীণদের অবহেলার চিত্র আজ আর বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি সাধারণ ও প্রায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠা দৃশ্য। একসময় বাড়ির কর্তা ছিলেন যারা, আজ তাদের কথা যেন কেউ শুনতেই চায় না। জীবনের অভিজ্ঞতা, সংগ্রামের ইতিহাস তাদের ভেতরে জমে থাকে। কিন্তু সে ইতিহাস জানার আগ্রহ আজকের সমাজে কয়জনের? বরং তাদের বক্তব্যকে অনেকেই ‘পুরোনো ধ্যান-ধারণা’ বলে একপাশে সরিয়ে দেয়।
আজকাল পরিবার কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে। যৌথ পরিবার ভেঙে এখন ছোট ছোট একক পরিবার। কর্মব্যস্ত জীবনের দৌড়ে সন্তানরা সময়ের অভাবে, কখনও উদাসীনতায় বাবা-মা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যায়। তাদের যে কোনো চাহিদা– তা হোক কথা বলা, একটু স্নেহ কিংবা স্রেফ পাশে বসে থাকা অনেক পরিবারের কাছে ‘অতিরিক্ত দাবি’ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে মনে করেন, মাস শেষে কিছু টাকা হাতে দিলেই দায়িত্ব শেষ। অথচ অর্থ নয়; প্রবীণদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সহানুভূতি; প্রয়োজন মমতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। আমাদের সমাজে প্রবীণদের চাওয়া খুব বড় নয়। তারা চান না বৈভব; শুধু একটু সান্নিধ্য আশা করেন।
কঠিন সত্য হলো জীবন বৃত্তাকার। আজ আমরা যারা শক্ত-সবল, চঞ্চল, আগামীকাল আমরাও যাব জীবনসায়াহ্নে। আমরাও চাইব কারও হাত আঁকড়ে দাঁড়াতে। সুতরাং প্রবীণদের অবহেলা করা মানে নিজের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। কারণ সময় কখনও ঋণ রেখে যায় না।
আজ যাদের আমরা ভুলে যাচ্ছি, কাল হয়তো আমরাও সেই ভুলে যাওয়া মানুষ হবো। এই জায়গায় এসে ‘সময়’ যেন বাস্তবের প্রতিশোধকারীর ভূমিকায় দাঁড়ায়। সমাজে প্রবীণদের প্রতি অবহেলা তাই নিছক দায়িত্বহীনতা নয়; এটি মানবিকতার ঘাটতি, সম্পর্কের শূন্যতা এবং আত্মার গভীরে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়।
শায়লা নাজনীন: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- প্রবীণ
