শিক্ষাবঞ্চনার মানচিত্রে হাওর
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাষ্ট্র যখন উন্নয়নের গল্প শোনায় তখন হাওরাঞ্চল প্রায়ই থাকে প্রান্তে। কখনও বাঁধ ভাঙার সংবাদে, কখনও ফসলহানির হিসাবেই সীমাবদ্ধ। উন্নয়নের যে কোনো আলোচনায় শিক্ষা একটি মৌলিক শর্ত। শিক্ষা ছাড়া অবকাঠামো টেকে না, অর্থনীতি স্থিতিশীল হয় না, সামাজিক ন্যায়ও প্রতিষ্ঠিত হয় না। একসময় বলা হতো, তথ্যের অভাবই শিক্ষাবঞ্চনার প্রধান কারণ। আজ যখন প্রযুক্তি মানুষের হাতের মুঠোয়, তখনও যদি একটি অঞ্চলের শিশু বিদ্যালয়ের পথ খুঁজে না পায়, তবে সেটি নিছক প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের ব্যর্থতা। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা সেই ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
সরকারি পরিসংখ্যান শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির একটি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক চিত্র তুলে ধরলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তা সমর্থন করে না। বহু প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়মিত শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ৬০ শতাংশের নিচে। একটি বড় অংশ শিক্ষার্থী অনিয়মিত, আবার অনেকেই একসময় পুরোপুরি ঝরে পড়ে। এই অনুপস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা ও জীবিকা সংকটের সরাসরি ফল।
হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবার কৃষিকাজ, মৎস্য আহরণ কিংবা দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। এই জীবিকা অনিশ্চিত এবং মৌসুমনির্ভর। ফলে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়। বিদ্যালয় তাদের কাছে প্রয়োজনের তালিকার একেবারে নিচে নেমে যায়। রাষ্ট্র যখন শিশুশ্রম বন্ধের কথা বলে, তখন এই বাস্তবতার মোকাবিলায় কার্যকর বিকল্প দিতে ব্যর্থ হয়।
শিক্ষার অভাব দারিদ্র্য সৃষ্টি করে, আবার দারিদ্র্য শিক্ষাকে দূরে সরিয়ে দেয়, এই দুষ্টচক্র ভাঙার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বাস্তবে দেখা যায়, হাওরাঞ্চলের শিশুদের জন্য নেওয়া উদ্যোগগুলো খণ্ডিত, বিলম্বিত এবং অনেক ক্ষেত্রে কাগুজে। ফলে এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম শিক্ষাবঞ্চনার ভার বহন করে চলেছে। দারিদ্র্যের আরেকটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ রূপ হলো পুষ্টিহীনতা। বহু শিশু অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে বিদ্যালয়ে আসে। এই বাস্তবতায় মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি কোনো দয়ার কর্মসূচি নয়; এটি একটি শিক্ষাগত প্রয়োজন। পুষ্টিকর খাবার শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহিত করে, ঝরে পড়া কমায় এবং শেখার সক্ষমতা বাড়ায়। তবু এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা হাওরাঞ্চলের শিশুদের জন্য এক ধরনের নীরব বৈষম্যই সৃষ্টি করছে।
উপবৃত্তি কর্মসূচিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। দরিদ্র পরিবারের বাস্তবতায় এই অর্থ প্রায়ই শিক্ষাসামগ্রীর পরিবর্তে দৈনন্দিন খরচে ব্যয় হয়। এতে উপবৃত্তির উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। সহায়তার ধরন পুনর্বিবেচনা না করলে কেবল অর্থ বিতরণ করে শিক্ষার সংকট মোকাবিলা করা যাবে না।
প্রশিক্ষণ ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে শ্রেণিকক্ষে। এই অবস্থায় শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার জরুরি।
রাসেল আহমদ: সাংবাদিক
[email protected]
- বিষয় :
- হাওর
