জেলেদের জীবন নিয়ে উদাসীনতা
তানিয়া আক্তার
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাষ্ট্রীয় নীতিতে জেলেদের জন্য নানা প্রকল্পের কথা বলা হয়–ভিজিএফ কার্ড, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন চাল বিতরণ, বিকল্প কর্মসংস্থানের। বাস্তবে এসব সহায়তা অনেক সময় সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকৃত জেলেরা তা থেকে বঞ্চিত হন। মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা একদিকে জেলেদের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও, অন্যদিকে এটি তাদের জীবিকা সংকটে ফেলে। নিষেধাজ্ঞা সময়ে যে চাল বা ভাতা দেওয়ার কথা তা অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত বা অনিয়মিত। ফলে জেলেরা বাধ্য হন আইন ভাঙতে; এবং মাছ ধরতে। তখন আবার তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানির শিকার হন।
জেলে পরিবারের নারীদের অবদান স্বীকার একদম অদৃশ্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়। জেলে নারীরা মাছ শুকানো, জাল বোনা, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নানা কাজে যুক্ত থাকেন। পাশাপাশি সংসার, সন্তান লালন-পালন সব দায়িত্বও তাদের কাঁধে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি বা সহায়তা তাদের জন্য নেই। নারী জেলেদের জন্য প্রশিক্ষণ, ঋণ বা স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও প্রায়
অনুপস্থিত। জেলেদের এখনও সমাজে অনেক ক্ষেত্রে অবহেলার চোখে দেখা হয়। সামাজিক অনুষ্ঠান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের মতামত গুরুত্ব পায় না। অনেক সময় জেলেরা ভূমিহীন হওয়ায় ভোটার হয়েও প্রভাবহীন নাগরিক হিসেবে থেকে যান।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জেলেদের নিয়ে পরিকল্পনা থাকলেও তার বাস্তবায়ন অন্তত ধীর ও ত্রুটিপূর্ণ। জেলেরা দেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখছেন, তাদের জন্য কোনো বিশেষ জীবন বীমা বা দুর্ঘটনাজনিত সহায়তার স্থায়ী কাঠামো নেই। তারা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে মাছ ধরলেও লভ্যাংশের সিংহভাগ চলে যায়
মধ্যস্বত্বভোগী বা আড়তদারদের পকেটে। সরকার নির্ধারিত কোনো বাজার ব্যবস্থা না থাকায় জেলেরা পানির দরে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হন। তাছাড়া দেশে এখনও কয়েক লাখ প্রকৃত জেলে নিবন্ধনের বাইরে। ফলে তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জেলেদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কেবল সাময়িক চাল বিতরণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি এবং বাস্তবমুখী পরিকল্পনা। জেলেদের জন্য ন্যায্য বাজার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তাদের মাছ সরাসরি বাজারে বিক্রির সুযোগ করে দিতে হবে, যাতে মহাজননির্ভরতা কমে। মহাজনদের দাদন থেকে মুক্তি দিতে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলেদের জন্য ‘ঝুঁকিবীমা’ বাধ্যতামূলক করা এবং দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ক্ষেত্রে পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নিতে হবে। জেলেদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে হিমাগার স্থাপন করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জন্য প্রশিক্ষণ ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
তানিয়া আক্তার: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- জেলে
