শীতের বিবর্তন
দিলশাদ আহমেদ
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলার ঋতুচক্রের সঙ্গে মানুষের জীবনযাপন, কৃষি ও সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই ঋতুচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ শীতকাল, যা আজ নিঃশব্দে ছোট হয়ে আসছে। ‘মাঘের শীতে বাঘ পালায়’–লোকজ এই প্রবাদ এখন যেন কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি। বাস্তবতা বলছে, শীত আর আগের মতো দীর্ঘ নয়, তীব্র নয় এবং নির্ভরযোগ্যও নয়।
দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়, যেখানে শীত একসময় আগেভাগেই হাজির হতো এবং দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকত, সেখানকার অভিজ্ঞতাই এই পরিবর্তনের স্পষ্ট সাক্ষ্য। আশ্বিন মাসে শীতের আভাস পাওয়া, ফাল্গুন পর্যন্ত কনকনে ঠাণ্ডা– এসব এখন স্মৃতিচারণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে কয়েক দিনের শৈত্যপ্রবাহের পরই শীত বিদায়ের ইঙ্গিত মিলছে। এটি নিছক আবহাওয়ার খামখেয়াল নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সুস্পষ্ট বার্তা।
এই পরিবর্তনের প্রভাব বহুমাত্রিক। শীতকালীন ফসল উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটবে; রোগবালাইয়ের ধরন পাল্টে যাবে; শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। কুয়াশা, শিশির ও ঠান্ডার ওপর নির্ভরশীল জীববৈচিত্র্যও পড়বে হুমকির মুখে। অর্থাৎ শীতের সংকোচন মানে শুধু একটি ঋতুর ক্ষয় নয়; সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই পরিবর্তনের পেছনে মানুষের ভূমিকাই প্রধান। নিয়ন্ত্রণহীন কার্বন নিঃসরণ, নির্বিচার নগরায়ণ, বন উজাড় ও পরিবেশবিরোধী উন্নয়ন প্রকল্প পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অথচ পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক পরিকল্পনা এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি।
শীত হারিয়ে গেলে আমরা হারাব আমাদের কৃষির স্বাভাবিক ছন্দ; স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার স্বস্তি; হারাব সংস্কৃতির একটি অনিবার্য অংশ। সময় থাকতেই তাই সচেতন হওয়া জরুরি। উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে উপেক্ষা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শীত থাকবে কেবল ইতিহাস আর গল্পের বিষয় হয়ে।
দিলশাদ আহমেদ: সমাজ-বিশ্লেষক
- বিষয় :
- শীত
