অর্ধশতাব্দীর পূর্ণতা-অপূর্ণতা
দাম্পত্য গৃহবিবাদ ইত্যাদি
মুনীর এইচ এম
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৪ | ০০:৪১
ঊনপঞ্চাশ পার করে পঞ্চাশতম বছরে পদার্পণ করেছে আমাদের যৌথ জীবনের পথচলা। এই চলার পথটি কেমন? খুব মধুময়? না-ও হতে পারে, সহজ উত্তর কারও জানা আছে কিনা জানি না। বাজারে গিয়ে মাংস কিনতে গিয়ে বলি, হাড্ডি ছাড়া ভালো মাংস দাও। আবার খেতে বসে চাই, আমাকে একটু হাড়অলা মাংস দাও। আসলে আমরা কেমনটি চাই? চেতনাসম্পন্ন মানুষের সংসারে মতবিরোধ, কলহ অনিবার্য।
গত মাসের প্রথম দিকের কথা, ভেবেছিলাম কয়টি দিন নিরিবিলি কোথাও একা থেকে আসি। তাহলে গ্রামের বাড়ি ভালো হবে। টাটকা বাতাস, ক্ষেতের শাকসবজি– সব টাটকা। কিন্তু এক্কেবারে খালি বাড়ি, আমার থাকা-খাওয়ার কী হবে? ওষুধ বের করে দেবে কে? ঠিক আছে, ময়মনসিংহে চলে যাই– কোন বিবেচনায় পরে এটিও বাদ। শেষে স্থির করি, ঢাকাতেই ছোট বোনের ধানমন্ডির বাসাই ভালো হবে। অভিপ্রায়ের কথা স্ত্রীকে বলি এবং সাধার জন্যই বলি, তুমিও চলো। ‘না, আমি যাব না, তোমার বোনের বাড়ি একাই যাও।’ তো, পরশু শনিবারে যাব। সে তখন শনিবার এলে বলে, ‘বুধবারে যাও।’ বুধবার এলে বলে, ‘পরের সপ্তাহে যাও।’ এভাবে মাসের শুরু থেকে শেষে পৌঁছে গেছি। শেষে একদিন পান্নাকে বলি, আমাকে একটা ব্যাগে কয়টি জামাকাপড়, ওষুধ গুছিয়ে দে। কাল যাব, গাড়ি লাগবে না উবার ডেকে যেতে পারব। সকাল বেলায় দেখি কোনো ছোট ব্যাগ নয়, বড় একটা স্যুটকেস রেডি, আমি একা নই, পান্নাসহ তিনজন, সকালে নয়, যাত্রা হয় বিকালে, ভাড়া গাড়িতে নয়, নিজেদের গাড়িতে। সবই সে মেয়েদের বলে রেডি করেছে, প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে, বাসায় কেমনে চলবে সব বন্দোবস্ত করেছে। ছোট বোনের বাসায় তিন দিন থেকে এলাম, বন্ধু যোবায়েরের বাসায়ও যাওয়া হলো।
ঝগড়া তো হয়ই, তারপর? ঝগড়ায় কে কবে হারতে চায়? হুমায়ূন আহমেদ বলত, গুলতেকিন ঝগড়ায় কোনো দিন ওর সঙ্গে পারে না। কতদিন আমার সামনে ওদের ঝগড়া হয়েছে। ওরা ঝগড়ায় ছিল নিম্নকণ্ঠ, থেমে থেমে ঝগড়া চলত। হুমায়ূন কিছু লেখালেখি করল, গুলতেকিন ঘরের কাজ করল, এমন কী খাওয়া-দাওয়া করল, অতিথি কেউ এলে বিদায় হলো; তারপর আবার শুরু বা অসমাপ্ত জায়গায় ফিরে যাওয়া। ঝগড়া করার জন্য আগের পুরান কথা সব মনে রাখতে হয়। শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম। পুরান কথা তোলার ব্যাপারে গুলতেকিন নাকি হুমায়ূনের সাথে পারত না।
আমার স্ত্রীর কিছু মনে থাকলেও আমার আবার পুরান কথা কিছু মনে থাকে না। আমার সবচেয়ে কষ্ট হয় তখন, যখন কোনোক্রমে যদি ও পরাজিত হয়ে যায়, আমি জিতে যাই। ঠিক জানি না, কষ্টটা পরাজয়ে না অনুশোচনায়, তবে ওর কষ্টের অনুভব চেহারায় অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট। খুব বিমর্ষ এবং তা বেশ স্থায়ী হয়, যা ক্রমাগত আমাকে দগ্ধ করতে থাকে। আমার বাবার ডায়েরিতে লেখা দেখেছি, আমার মা নাকি কখনো হারতে জানে না। আসলে ব্যাপার ছিল, ‘বাবা ওয়াজ অলওয়েজ অন দ্য রং সাইড’। মা কখনও ঝগড়া শুরু করত না, বাবাই হুটহাট উচ্চ স্বরে চেঁচামেচি করত। মা থাকত নিশ্চুপ, মুখে মুখে কোনো কথা বলত না। কাজ-কর্ম সেরে অবসরে উকিলের মতো ধরত, বাবা বেচারা উকিলের সঙ্গে পারত না। গত ঊনপঞ্চাশ বছরের অধিককাল ধরে মান ভাঙানোর উদ্যোগ বরাবর কিন্তু আমাকেই গ্রহণ করতে হয়। v
[লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে]
- বিষয় :
- দাম্পত্য
