অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স গবেষণাগার
গবেষণাগারে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ড. মো. তানভীর রহমান
তানিউল করিম জীম
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৪ | ২২:২২ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৪ | ১৯:০৫
বর্তমানে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় শীর্ষ ১০টি সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। অদূর ভবিষ্যতে সামান্য জ্বর বা সর্দি-কাশিতেই আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে শুধু এ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের জন্য। সাম্প্রতিক ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে প্রায় ১.২৭ মিলিয়ন মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী করা হয়েছিল। ২০৫০ সালের মধ্যে এর ফলে বছরে প্রায় ১০ মিলিয়ন পর্যন্ত মৃত্যু ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশ সবকিছুই জড়িত। তাই বর্তমান বিশ্বে ওয়ান হেলথের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দিন দিন দেশে যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহারের ফলে সেটি মানুষ, পশু-পাখি এবং পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই ভয়াবহতা জানার জন্য এবং এর প্রভাব দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে ২০১০ সালে কাজ শুরু করেছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি অনুষদের মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. তানভীর রহমান। দীর্ঘ ১৪ বছরের গবেষণায় তাঁর শতাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স-সংশ্লিষ্ট। ড. তানভীর তাঁর গবেষণার মাধ্যমে বিশ্বসেরা ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বিশ্বের প্রথম সারির চিকিৎসা ও বিজ্ঞানবিষয়ক নিবন্ধ প্রকাশনা সংস্থা ‘এলসেভিয়ার’-এর যৌথ জরিপে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞানীদের প্রকাশনা, এইচ-ইনডেক্স, সাইটেশন ও অন্যান্য সূচক বিশ্লেষণ করে তালিকাটি প্রস্তুত করা হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে গবেষণা শুরুর বিষয়ে ড. তানভীর বলেন, ‘বিদেশে আমার স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি করার সময় জিনোম সিকুয়েন্সিং, বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার ভিরুলেন্স জিন শনাক্তকরণ এবং মলিকুলার পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেইন শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন জটিল ও ব্যয়বহুল কাজ শিখেছিলাম। উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে এসে আমি লক্ষ্য করলাম, গ্রামীণ পর্যায়ে গবাদি পশু-পাখির চিকিৎসায় পল্লি চিকিৎসকরা অবাধে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করে চলেছেন; যা একজন ভেটেরিনারি ডাক্তার ও অণুজীব বিজ্ঞানী হিসেবে আমার কাছে বিপৎসংকেত হিসেবে মনে হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে আমি চেষ্টা করছিলাম বাংলাদেশে এসব কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়ার। তবে যন্ত্রপাতি ও আর্থিক সহযোগিতার অভাবে পুরোপুরিভাবে কাজটি শুরু করতে পারিনি। এরপর আমার নিজস্ব চেষ্টা এবং বাকৃবির মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগের সহায়তায় মোহাম্মদ তানভীর রহমান (এমটিআর) নামে ল্যাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে কাজ শুরু করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যার কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। প্রতিটি মানুষ, প্রাণী এ সমস্যায় জর্জরিত এবং পাবলিক হেলথের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু।’
বাংলাদেশে এ গবেষণা কার্যক্রমকে আরও যুগোপযোগী করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা-সংক্রান্ত সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে বলেও জানান এ গবেষক। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো– যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালির পেরুজিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, চীনের গুয়াংজি ভেটেরিনারি রিসার্চ ইনস্টিটিউট, দক্ষিণ কোরিয়ার কাংওয়ান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির চেরা ডায়ালগিস্টিক, নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য ও সমাজ ইনস্টিটিউটের বিশ্ব স্বাস্থ্যকেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিভাগ, জার্মানির মিউনিখের কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কানাডার অটোয়ার কৃষি ও কৃষি খাদ্য বিভাগ।
শিক্ষার্থীরা জানান, গবেষণার স্বার্থে এমটিআর ল্যাবে প্রতিনিয়ত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, পরিযায়ী পাখি, শোভাবর্ধনকারী পাখি, বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য, মাছ, ছাদবাগানের মাটি, শাকসবজি, বন্যপ্রাণী, চিড়িয়াখানার প্রাণী, গো-খাদ্য এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ল্যাবে নিয়ে এসে যেসব জীবাণুর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স দেখায় সেসব জীবাণুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণের কাজ করা হয়। এ ছাড়া ল্যাবে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বহনকারী জিন শনাক্ত করা হয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অণুজীবের শনাক্তকরণে ব্যাকটেরিয়ার পূর্ণাঙ্গ জিনোম এবং মেটা জিনোম সিকুয়েন্সিং করা হয়েছে; যা দেশে এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
অধ্যাপক ড. তানভীর প্রতিনিয়ত স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি গবেষণা ল্যাবে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ করে দেন। যেখানে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই ল্যাব ওয়ার্ক ও পেপার পাবলিকেশনের হাতেখড়ি হয়। ল্যাবের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী এবং গবেষণা সহকারী রনি ইবনে মাসুদ বলেন, ‘উচ্চশিক্ষার যাত্রায় নিজেকে এগিয়ে রাখতে, গবেষণায় দক্ষতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এমটিআর ল্যাব আমাদের সেই সুযোগ করে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত আমরা যুক্ত হচ্ছি বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমে। উচ্চশিক্ষা যাত্রার শুরুতেই গবেষণা কাজের হাতেখড়ি এবং বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ শুধু আমাদের আত্মবিশ্বাসই বাড়াচ্ছে না, সেই সঙ্গে আমাদের সুযোগকে অবারিত করে দিচ্ছে।’
ড. তানভীর রহমান স্বপ্ন দেখেন, আগামী দিনে তাঁর এমটিআর ল্যাবটি একটি রেজিস্ট্যান্স অ্যানালিসিস এবং জিনোমিক সার্ভিলেন্সের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে বিশদ আকারে গবেষণা হবে। তিনি মনে করেন, গবেষণার জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে শুধু ক্যারিয়ারের দিক থেকেই শিক্ষার্থীরা লাভবান হয় না; বরং ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন ঘটনা সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে জীবনকে অধিকতর সহজ ও সুন্দর করে তোলার দক্ষতাও অর্জন করে।
- বিষয় :
- গবেষণা
- অ্যান্টিবায়োটিক
