ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস

বাঘ বাঁচলে বাঁচবে দেশ

বাঘ বাঁচলে বাঁচবে দেশ
×

ফাইল ছবি

আশিকুর রহমান সমী 

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৫ | ০০:১১ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৫ | ১৪:০২

খুব বেশি আগের কথা নয়; আজ থেকে ৮০ বা ১০০ বছর আগেও গোটা বাংলাদেশে ছিল বাঘের অস্তিত্ব। সময়ের হেরফেরে আজ শুধু সুন্দরবনে টিকে আছে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১২৫টি বাঘ। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম আর মৌলভীবাজারের লাঠিটিলায় বাঘের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যদিও কালেভদ্রে তাদের দেখা মেলে। পুরো ১০০ বছর আগেও পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা ছিল লক্ষাধিক; এখন মাত্র তিন হাজার ৯০০। এর মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিন হাজার দুইশর মতো। 

আমাদের এই অঞ্চলে যে বাঘ পাওয়া যায়, তার নাম ‘বেঙ্গল টাইগার’। এটি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমারে বিস্তৃত। সংখ্যাগত দিক দিয়ে এটি সর্বোচ্চ। আইইউসিএনের তথ্যমতে, পৃথিবীতে এই বাঘ বিপদাপন্ন এবং বাংলাদেশে মহাবিপদাপন্ন প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত। বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশসহ ভারতেরও জাতীয় পশু। এ ছাড়া বাঘ আইকনিক প্রাণী হিসেবে পরিচিত। এটি ফ্ল্যাগশিপ, কিস্টোন, আমব্রেলা প্রাণী নামেও পরিচিত। মানে এই বাঘের সঙ্গে বনের অন্যান্য পরিবেশের সুস্থতা নির্ভর করে। বাঘ সুরক্ষিত হলে, বনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ভালো থাকবে। বাঘের সংখ্যার সঙ্গে ওই এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ভারসাম্য নির্ভর করে।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, আমাদের দেশসহ গোটা পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতিতে বাঘ সংরক্ষণের জন্য ১০ বছরের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সঙ্গে মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে ২৯ জুলাই ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত হয়। 
বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বর্তমানে বাঘের সবচেয়ে বড় সমস্যা চোরাশিকার ও আবাসন ধ্বংস। গত ১০০ বছরে ৯৫ শতাংশ আবাসস্থল নষ্ট হয়েছে বাঘের। সুন্দরবনের বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ। পাশাপাশি বানর ও শূকর। প্রায়ই হরিণ চোরাচালানের খবর দেখা যায় পত্রিকার পাতায়, যা বাঘের খাদ্য সংকটের জন্য দায়ী। গত ২০ বছরে সুন্দরবনে ৪২টি বাঘের মৃত্যুর খবর জানা গেছে। 

সুন্দরবন বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ঢালের মতো বাংলাদেশকে রক্ষা করছে। এর ফলে রক্ষিত হচ্ছে বাংলাদেশের অস্তিত্ব। সুন্দরবনের নাম নিলেই প্রথমে মনে পড়ে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের কথা। বাঘ এই বনকে রক্ষা করে আসছে। না হলে তো কবেই উজাড় হয়ে যেত এই বন। এদিক থেকে বাঘ আমাদের সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী। রক্ষা করছে সুন্দরবনের বনভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ। বাস্তুতন্ত্রের সমতা রক্ষায় বাঘের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা।

আমরা যদি বাংলাদেশের অন্যান্য বনভূমির দিকে এমনকি উপকূলীয় বনের দিকেও তাকাই, যেমন– বরগুনা, নোয়াখালী, ভোলা এলাকার কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাহলে দেখব বিগত সময়গুলোতে বনের একটি অনেক বড় অংশ উজাড় হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে মানুষ বসতি তৈরি করেছে, পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন পরিবেশকে নষ্ট করছে। কারণ, সেখানে বড় কোনো বন্যপ্রাণী নেই, যারা আমব্রেলা বা কিস্টোন স্পেসিজ হিসেবে কাজ করে। ফলে মানুষের নিয়মিত আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই কোনো বন্যপ্রাণী দ্বারা। এ কারণে অদূরদর্শী পর্যটন খাত খুব সহজে ওইসব এলাকায় বিস্তার লাভ করে। নষ্ট হয় প্রাকৃতিক পরিবেশ। বাঘের ওপর যেহেতু পুরো সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থা নির্ভর করে, সেহেতু সুন্দরবন থেকে যদি বাঘ হারায়, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অনেকটা বিনষ্ট হবে, হরিণের সংখ্যা বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে প্যারাবনের ওপর। বাড়বে অন্যান্য প্রাণীর চোরাশিকার, বনে বাড়বে বনসম্পদ আহরণ, পাশাপাশি বন উজাড় হবে। এক পর্যায়ে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে আমাদের সুন্দরবন।

লেখক:  বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×