ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্মৃতির সংরক্ষণ

স্মৃতির সংরক্ষণ
×

দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো পটুয়াখালীর দুমকিতে সরকারি জনতা কলেজেও গণঅভ্যুত্থান স্মরণে শিক্ষার্থীরা আঁকেন গ্রাফিতি

হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৫ | ০০:১৮ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৫ | ১৩:৫৭

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে-পরে দেশের দেয়ালগুলো যখন রঙে ভরে ওঠে, তখনই আবার তা ঢেকে দিতে শুরু করে রাজনৈতিক পোস্টার, ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপন আর কোচিং সেন্টারের ব্যানার।
ঢাকার মৌচাক মোড়ে মুগ্ধর মুখচ্ছবিসংবলিত গ্রাফিতির ওপরে এখন লাগানো কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন। বনানী ফ্লাইওভারের পিলারে শহীদদের ছবির ওপর ঝুলছে ওয়াজ মাহফিলের পোস্টার। এই প্রবণতা ব্যথিত করছে নাগরিকদের, প্রতিবাদ উঠছে দেশজুড়ে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশেই চোখে পড়ে ক্যালিগ্রাফির সঙ্গে শহীদ আবু সাঈদকে নিয়ে আঁকা দেয়ালচিত্র। ভাস্কর্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহিদুল হক বলেন, ‘আন্দোলনের সময় আঁকা স্প্রে পেইন্টের গ্রাফিতিই ছিল আসল প্রতিবাদ। এখন যা আঁকা হচ্ছে তা নান্দনিকভাবে উন্নত, কিন্তু ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে পুরোনো গ্রাফিতিগুলো সংরক্ষণ করা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘চারুকলার বাইরের শিক্ষার্থীদের আঁকার হাত দেখে আমরা মুগ্ধ। ক্যালিগ্রাফি, কালার ম্যাচিং, লেয়ারিং–এসবের মান চারুকলার ছাত্রদের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে ভালো।’

এই আন্দোলনের সময় আঁকা দেয়াল লিখন সংরক্ষণে কাজ করছে কিছু সংগঠন ও গবেষক। দৃক তৈরি করেছে ‘পেইন্ট দ্য স্কাই, মেইক ইট ইয়োরস’ নামের সংকলন। প্যারিস থেকে প্রকাশিত হয়েছে বই– ‘গ্রাফিতি অব রেভলিউশন: বাংলাদেশ ২০২৪’, যার সম্পাদক লেখক ও সমাজকর্মী আবু জাফর জুবায়ের।

আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন বলেন, ‘যদি পশ্চিমা দেশে হতো, তাহলে দেয়াল কেটে নিয়ে জাদুঘরে রাখত। আমাদের দেশেও সরকার চাইলে এগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এগুলো জাতির স্মৃতি। এগুলো সংরক্ষণে নীতিমালা দরকার। সরকারের অনুমোদন ছাড়া এসব গ্রাফিতি কেউ মুছতে পারবে না– এমন নির্দেশনা থাকা উচিত।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন তাদের বিজ্ঞপ্তিতে গ্রাফিতি সুরক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে।

শুধু অপসারণ নয়, দরকার গ্রাফিতি সংরক্ষণের আইনি রক্ষাকবচ। দেয়ালগুলো হতে হবে সংরক্ষিত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ফিদা হাসান বলেন, ‘প্রতিদিন অবৈধ পোস্টার সরানো হয়, পরদিন আবার পোস্টার লাগানো হয়। শিক্ষার্থীদের আঁকা গ্রাফিতির ওপর এই অনাচার চলতে পারে না। শাস্তির ব্যবস্থাও দরকার।’

যদি রাষ্ট্র সঠিক উদ্যোগ নেয়, যদি নাগরিকরা দায়িত্ব নেয়, যদি রাজনৈতিক দলগুলো দেয়ালে আত্মপ্রচারের মোহ ত্যাগ করে– তবে এ দেয়ালচিত্রই হবে ভবিষ্যতের পাথেয়, যেখানে প্রজন্ম ইতিহাস শিখবে চোখে দেখে, অন্তরে গেঁথে।

শিক্ষার্থীরা বলছে, ‘এটা আমাদের দেশ। দেয়ালগুলোয় তখন আমরা তা-ই বলেছি, যা মনে এসেছে। এখন সে দেয়ালেই আমরা রেখে যেতে চাই আমাদের স্বপ্ন, আমাদের ভালোবাসা আর হারানো মানুষের স্মৃতি।’

৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন প্রজন্ম সেই দেয়ালগুলোকে সাজিয়ে তুলেছে আরেকভাবে। সেই স্মৃতি অন্তরে ধারণ করে এখনও অনেকে দেয়ালে আঁকছেন। সেই দেয়াল, যেটি একদিন ছিল ক্ষোভের ক্যানভাস, এখন হয়ে উঠেছে শ্রদ্ধা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের দেয়াল।

আরও পড়ুন

×