ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্দোলনে বন্ধুত্ব

আন্দোলনে বন্ধুত্ব
×

শিল্পকর্ম :: দেবাশিস চক্রবর্তী

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৫ | ০০:২২ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৫ | ১৭:৫৮

আন্দোলন, রক্ত, প্রতিবাদ– সবকিছুর ভেতর দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সম্পর্কের নাম বন্ধুত্ব। আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবসের আগের দিন সেই সম্পর্কটিকে ফিরে দেখা যাক আন্দোলনের ময়দান থেকে। লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত
--------------------------------------------------------------------

আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস আসে প্রতি বছর বন্ধুত্ব উদযাপনের আহ্বান নিয়ে। এদিন বলা হয়– ‘বন্ধুরা আমাদের জীবন করে রঙিন’ কিংবা ‘বন্ধু মানেই নির্ভরতার নাম’। কিন্তু কেউ কি কখনও ভাবে, এই বন্ধুত্ব যখন গড়ে ওঠে চোখের জলে, রক্তে, কিংবা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ভেতর– তখন তার রূপ কেমন হয়? বন্ধুত্ব তখন আর কেবল কোনো আবেগের নাম থাকে না, বরং হয়ে ওঠে সাহস, প্রতিরোধ আর গণমানুষের পাশে দাঁড়ানোর রাজনৈতিক প্রত্যয়।

২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন বা ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান– এসব কেবল রাজনৈতিক অধ্যায় নয়, বন্ধুত্বেরও এক নির্দিষ্ট পরীক্ষা। এ সন্ধিক্ষণেই তো বন্ধুরা লড়েছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়েছে রাজপথে, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে গুলির মুখে।

কেউ আহত বন্ধুকে সরিয়ে নিতে গিয়ে নিজেই গুলিবিদ্ধ হয়েছে। কেউ বন্ধুদের জন্য পানি নিয়ে ছুটে গেছে রোদপোড়া রাজপথে– ফিরে এসেছে শরীরে বুলেটের ছাপ নিয়ে। আন্দোলনে বিজয়ের পরও বন্ধুত্ব থেমে থাকেনি; বরং শহীদ বা আহত বন্ধুদের স্মরণে দেয়ালজুড়ে আঁকা হয়েছে গ্রাফিতি, লেখা হয়েছে স্লোগান– তাদেরই বন্ধুর হাতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি বন্ধু হয় না
বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার পরই অনেক শিক্ষার্থী শুনে থাকেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বন্ধু হয় না’। সিনিয়রদের মুখে বা কারও আত্মজৈবনিক দীর্ঘশ্বাসে সে কথা বহুবার উচ্চারিত হয়। এটি যেন এক প্রজন্মের উদ্বেগ– আজকের তরুণদের আত্মবিশ্বাস ও সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। সম্পর্ক গড়ার আগে সন্দেহ: সে কি সত্যিই বন্ধু? নাকি সুযোগসন্ধানী কেউ?
এ সংশয় যেমন ছিল, তেমনি ছিল ছোটবেলায় পড়া ঈশপের সেই গল্পটিও– ভালুক এলে কে পাশে থাকে আর কে পালিয়ে যায়, তা দিয়েই চেনা যায় প্রকৃত বন্ধুকে। আজকের নগরজীবনে সেই ‘ভালুক’ হয়ে এসেছে আন্দোলন।

‘ভালুক’ এসেছে আন্দোলনের মুখোশে
আন্দোলনে অনেকেই শুধু বন্ধু হয়ে ওঠেনি– বন্ধুর জন্য জীবন বাজি রেখে নেমেছে রাজপথে। আন্দোলনকারী কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, তারা বন্ধুরা মিলে এ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। তাদের অনেকেই গুরুতর আহত। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রবিন জানান, ‘কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবিতে যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্দোলনে নামে, তখন মনে হয়েছিল সরকার সহজেই তা মেনে নেবে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমন, এমনকি প্রাণহানির পর আমরা-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আর বসে থাকতে পারিনি। আমরাও রাজপথে নেমে পড়ি। আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আমি আহত হই। আমার এক বন্ধু রাবার বুলেটে চোখে গুরুতর আঘাত হয়। হাসপাতালে নিতে নিতে তার রক্তে আমার শার্ট ভিজে যায়। সে চোখে আর আলো ফিরবে না– জানি। কিন্তু সেদিন তাকে বলেছিলাম: তোর এই ত্যাগ বৃথা যাবে না। বন্ধুর রক্ত ছুঁয়ে আমি শপথ করেছিলাম– দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না।’
নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সম্পন্ন মহাপাত্র বলেন, ‘আন্দোলনে সাহস জুগিয়েছে আমার বন্ধুরাই। যারা বহুদিনের পরিচিত ছিল, আবার অনেক নতুন বন্ধুও পাওয়া গেছে রাজপথে। আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছি। আহতদের আর্তনাদ আমাদের দ্রোহে পরিণত হয়েছে।’

এ সময়টায় বন্ধুত্বের সংজ্ঞা যেন নতুন করে লেখা হচ্ছিল। আগে বন্ধুত্ব মানে ছিল– একসঙ্গে চা খাওয়া, সিনেমা দেখা, রাতে মেসে বসে গল্প করা। কিন্তু সেই আন্দোলনের দিনগুলোয় বন্ধুত্ব মানে হয়ে দাঁড়ায়– বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো, নির্যাতনের মুখে প্রতিবাদ করা, গুলির মুখে বুক পেতে স্লোগান তোলা।

জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থী জামিল হোসেন সিয়াম বলেন, ‘আন্দোলনে বন্ধুত্বের এই জোট ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের দেয়াল ভেঙে তৈরি হয়েছে নতুন বিশ্বাস। আন্দোলন থেকেই অনেক নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, যাদের অনেকেই বন্ধু হয়ে ওঠে। নতুন ও পুরোনো বন্ধুরা একসঙ্গে একই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ায় মনোবল ক্ষুণ্ন হওয়ার কোনো জায়গা ছিল না; বরং আমি ব্যক্তিগতভাবে আরও সাহসী হয়ে উঠেছি। আন্দোলনে আমিসহ অনেক বন্ধুবান্ধব আহত হয় এবং অনেককেই অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়, দেওয়া হয় মিথ্যা মামলা। তবে আমরা হাল ছাড়িনি। আহতদের আর্তনাদ আমাদের দ্রোহে পরিণত হয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না– এই জায়গায় আমরা সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের দিন পনেরো পর হঠাৎ খবর এলো– ‘সবাইকে হল ছাড়তে হবে।’ স্বাভাবিক ছুটির মতো নয়, এই ছিল এক চাপা আতঙ্কের বিদায়। বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করার সময়– আবার দেখা হবে তো? না, সবার সঙ্গে আর দেখা হয়নি। কেউ আহত, কেউ গুম, কেউ কারাবন্দি। ইন্টারনেট বন্ধ, চারদিকে দমবন্ধ পরিস্থিতি। কিন্তু ঠিক তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বন্ধুত্বের প্রকৃত চেহারা। 

যার সঙ্গে মাসে একবারও যোগাযোগ হতো না, সেই পরিচিত মুখটি ফোন করে বলে, ‘ঠিক আছিস তো?’ বা ‘সাবধানে থাকিস।’ এই একটি প্রশ্ন যেন সেই বহু বছরের অনিশ্চয়তাকে মুছে দেয়! বন্ধুত্ব তখনই চেনা যায়, যখন কেউ কাঁধে হাত রাখে।

আন্দোলন চলাকালে অনেকেই আহত হয়েছিল, আটক হয়েছিল, হয়রানির শিকার হয়েছিল। কিন্তু একজন আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ১০ জন দৌড়ে গিয়েছিল তার পাশে। কেউ আটক হলে তার মুক্তির দাবিতে সবাই ফেসবুকে, টুইটারে সরব হয়েছিল। 

যে শান্ত-নিরীহ ছেলেটা কোনোদিন সভা-সমাবেশে যেত না, সে ছেলেটিই গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিয়েছিল– ‘আমার ভাইয়ের মুক্তি চাই। এখনই চাই।’

ছোটরাও শিখেছে কীভাবে পাশে থাকতে হয়
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও এ আন্দোলনে কাঁধ মিলিয়েছে। গত বছর বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির পরীক্ষার হলে শহীদ আহনাফের আসনে তার বন্ধুরা ফুল রেখে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। যেন বন্ধুটি পরীক্ষায় নেই ঠিকই কিন্তু হৃদয়ে আছে।

গত বছর ১৮ জুলাই শহীদ হওয়া বন্ধু ফারহান ফাইয়াজকে স্মরণ করে তার বন্ধু ওয়াকিফ ফাহমিদ লিখেছে, “১৫ তারিখ আমার পোস্টে ফারহান ‘প্রাউড অব ইউ’ লিখেছিল। কিন্তু ১৮ তারিখ সে আমাদের প্রাউড করে চলে গেল। তার রক্ত আমাদের বন্ধুদের সমগ্র স্মৃতি ছুঁয়ে গেছে। আমরা কেউ তাকে ভুলব না।’’

বন্ধুত্বের মানে
একসময় বন্ধুত্ব মানে ছিল একসঙ্গে চা খাওয়া, গল্প করা, সিনেমা দেখা। কিন্তু আন্দোলনের সময় স্লোগান দেওয়া, গুলির মুখে বুক পেতে দাঁড়ানোও বন্ধুত্ব। তরুণ প্রজন্ম প্রমাণ করেছে– সোশ্যাল মিডিয়ায় বেড়ে ওঠা বলে তাদের বন্ধুত্ব ফাঁপা নয়; বরং এই বন্ধুত্ব এমন সম্পর্ক, যা চোখের আড়াল হলেও চেতনায় জ্বলে থাকে।

প্রজন্ম বদলে যাবে, কিন্তু এ আন্দোলনকে মনে রাখবে পরের প্রজন্ম। প্রকৃত বন্ধুত্বের উদাহরণে উঠে আসবে এ আন্দোলনের চিত্র। বন্ধুত্বের কোনো বয়স হয় না, ছোট কিংবা বড়বেলার কোনো ভেদাভেদ হয় না; তারই বিশ্বাস মনে গেঁথে যাবে পরবর্তী প্রজন্মের। যখন কেউ বলবে, এখন আর তেমন বন্ধুত্ব হয় না, তখন এ প্রজন্ম বলতে পারবে– হয়, খুব হয়। এমন বন্ধুও হয়, যে পিঠ দেখিয়ে পালায় না, বরং গুলির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে– ‘বুকের মধ্যে ভীষণ ঝড়; বুক পেতেছি, গুলি কর।’

আরও পড়ুন

×