ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আমাজনের আয়নায় তিকুনা

আমাজনের আয়নায় তিকুনা
×

নৃত্যরত তিকুনা আদিবাসী দল

 মহুয়া রউফ

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪০ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৫ | ১৬:১৬

হোস্টেল আলদেইয়া, মানাউস, ব্রাজিল। অভ্যর্থনা ডেস্কের ছেলেটির নাম ব্রানো। সে এমন সহাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির মতো ঝরঝর করে ইংরেজিতে কথা বলতে শুরু করল, আমার বুকের ভেতর বসন্তের বাতাস বয়ে গেল। এদিককার মানুষ ইংরেজি খুব কম বলে। পর্তুগিজ বললে আমি গেয়ে উঠতাম, ‘তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি।’ 

নিশ্চয়ই আমাজন দেখতে এসেছ?  তোমার ধারণা সঠিক। আমাজন আদিবাসীদের প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা আছে। আমি কি চাইলে আমাজনের কোনো আদিবাসী পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারব ক’দিন? না, তারা সে অনুমতি দেবে না। তবে তিকুনা আদিবাসী পাড়ায় থাকতে পার কয়েক ঘণ্টা। আমি ট্যুর এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা করে দেব। কাল সকাল ৮টায় তৈরি থেকো। গাড়ি এসে তোমায় নিয়ে যাবে।

ব্রানোর কথায় আমি সন্তুষ্ট। সকালে গাড়ি এলো। আমায় নিয়ে গেল একটি নদীর ঘাটে। ঘাটে গাড়ি থামতেই আমায় আরেক অচেনা গাইড ঘাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি দূর থেকে দেখছি ঘাটে অনেক স্পিডবোট। কথা বলার উপায় নেই কোনো। গাইড ইংরেজি বোঝে না। এ নদীর নাম রিও নিগ্রো। নদীতীরে মানাউস শহর দাঁড়িয়ে আছে। 

আমার সামনে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। স্পিডবোটে সবে উঠেছি। এই গাইড আরেকজনের কাছে আমার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে উধাও। বোটে উঠতে যাব; কিন্তু থমকে গেলাম। বোটের স্টিয়ারিং ধরে আছে এক দীর্ঘকেশী নারী। কোনো নারী মানুষ পারাপারের স্পিডবোটের চালক হয়–আমি এমন আগে দেখিনি। বিস্ময়ে তাকিয়ে রয়েছি সেই নারীর দিকে। বুঝলাম, এটি ব্রাজিল। অসাবধানতায় নিজ আসনে বসতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়েই যাচ্ছিলাম।

মনোমুগ্ধকর আর অভিযাত্রায় ভরা সকাল। আমাজনের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে দেখার আশায় আমি ব্যাকুল। নদী প্রথমে শান্ত। পানির ওপর রোদের আলো পড়ছে। পানি তো নয়, যেন চকচকে কালো আয়না। পানি গভীর কিন্তু আমার চিত্ত ভয়শূন্য। দূরে দুপাশে ঘন সবুজ অরণ্য। 

বোট এগিয়ে চলেছে। আমার গালে বাতাস আর পানির ঝাপটা এসে পড়ছে। বোটের ইঞ্জিনের খটখট গর্জন কানে লাগছে। দূরের গাছপালার মধ্য থেকে ভেসে আসছে পাখির ডাক। নাম জানি না, কিন্তু ডাকগুলো যেন কোথাও শুনেছি–পুরোনো কোনো রূপকথার গল্পে! গাইড বলল, নৌকা এখন আমাজন নদীতে এসে পড়েছে। কী যেন লাফিয়ে উঠল পানি থেকে! সবাই চিৎকার দিয়ে উঠল–‘ডলফিন’। ডলফিন যেন একটু হাসি দিয়ে আবার পানির নিচে মিলিয়ে গেল।

এক স্পিডবোটে আমরা জনা পঞ্চাশেক। আমাদের নৌকা ভিড়ল পারে। দূর থেকে দেখছি কোমরে পাতা পেঁচিয়ে কয়েকজন পুরুষ আধেক শরীর ঢেকেছে। এ পাতার পোশাক বলে দিচ্ছে আমরা আমাজনের তিকুনা আদিবাসী পাড়ায় এসে পড়েছি। 

চারদিকে মুগ্ধতা। ঘন বন। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, এখানে কারও বসতি আছে। নৌকা থেকে নেমে গাইডকে অনুসরণ করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। একটু ভেতরে গিয়েই দেখি একটি সুবৃহৎ বৈঠকখানা। চারদিক উন্মুক্ত, শুধু ওপরে পাতা আর পলিথিনের ছাউনি। বৃত্তাকারে বসার ব্যবস্থা আছে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়ছে এমন এক তিকুনা পুরুষ তাঁর শরীরের প্রায় সমান উচ্চতার বাঁশি নিয়ে হাজির বৈঠকখানার কেন্দ্রে। তিনি তাঁর বাঁশিতে সুর তুললেন। হয়তো আমাদের স্বাগত জানাচ্ছেন।

ইসরাফিল যেদিন শিঙায় ফুঁ দেবেন, সেই দৃশ্য দেখতে কেমন হবে আমি জানি না। তবে আজকের এ শিঙা ইসরাফিলের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে আমায়। ইসরাফিলের সুর ধ্বংসের, আজকের এ সুর ধ্বংসের নয়, প্রেমের, আমন্ত্রণের। আমরা তাঁর অতিথি।

একদল তিকুনা নারী-পুরুষ রং নিয়ে এগিয়ে এলো। আমাদের রাঙাতে চায়। এ রং নেওয়ার জন্য অর্থমূল্য দিতে হবে আমাদের। আমরা পর্যটকরা ঝাঁকের কইয়ের মতো দ্রুত এগিয়ে গেলাম তাদের কাছে। আমি চোখের চশমা খুলে একটা কাঠের বেঞ্চিতে বসে পড়লাম। তিকুনা তরুণ আমার মুখে রঙের কাব্য লিখতে শুরু করেছে। এ ‘রং যেন মোর মর্মে লাগে!’ আমরা যখন আমাজন রঙে মোহগ্রস্ত, তখন হেলে-দুলে নৃত্য করতে করতে এগিয়ে আসছে একদল আদিবাসী নারী-পুরুষ। আমরা দ্রুত আসন গ্রহণ করলাম। আমাদের ঘিরে একদল বাদ্য বাজাচ্ছে। আরেক দল নেচে চলছে। নারীরা গলায় পরেছে পুঁতির মালা। সে মালা বুক পর্যন্ত নেমে গেছে। এটি শরীরের ঊর্ধ্বাংশের একমাত্র পোশাক। কোমরে বেঁধেছে পশমের ঝালর। দেখতে ঘাগরার মতো। 

পুরুষরা কোমরে বেঁধেছে বড় ও মজবুত বনজ পাতা। একটি বেল্টের মতো কিছু একটার সঙ্গে গেঁথে কোমরের চারপাশে বেঁধেছে। পাতাগুলো ছিঁড়ে না। ওরা যখন হাঁটছে, পাতাগুলো তখন নাচছে। তাদের কাছে এই পাতার পোশাক প্রকৃতির, পরিচয়ের, সংস্কৃতির। তারা গাছ থেকে ফল পেড়ে খায়, গাছের পাতা দিয়ে গড়ে পরিধান। এ সমাজে এটি মর্যাদাপূর্ণ পোশাক। এটি স্বাভাবিকতা। এটি ঐতিহ্য। শরীর এখানে লজ্জার নয়, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতার। নারী-পুরুষ মাথায় বসিয়েছে পাখির পালকের তৈরি বাহারি রঙের মুকুট। 

আমাজনে ছিল গ্রিক পুরাণে বর্ণিত একটি নারী জাতি। তারা ছিল যোদ্ধা, দক্ষ শিকারি, তীরন্দাজ। তাদের শারীরিক শক্তি, অশ্বচালনার দক্ষতা এবং যুদ্ধশিল্প ছিল ভুবনবিখ্যাত। আমার মনে হচ্ছিল, আমার সামনে গ্রিক পুরাণের আমাজন নারীকে দেখছি। আমি একদল নারীর তেজ, দক্ষতা আর শক্তির নৃত্য উপভোগ করেছি।

গ্রিক পুরাণের আমাজন নারীরা ছিল পুরুষবিবর্জিত। তারা নিজেদের রাজত্বে পুরুষদের স্থান দেয়নি। তাদের সমাজে পুরুষ নিষিদ্ধ ছিল। আজকের আমাজন জঙ্গলের এই তিকুনা আদিবাসী পাড়ায় পুরুষ আছে, বহাল তবিয়তেই আছে। গ্রিক পুরাণের আমাজন নারীরা কেবল তাদের কন্যাদের লালন-পালন করত। পুত্রদের পিতাদের কাছে ফিরিয়ে দিত এবং শিশুপুত্রদের অল্প বয়সে স্বল্প সময়ের জন্য সঙ্গে রাখত। সেই নারীরা পুরুষদের সঙ্গে অতটুকুই মেলামেশা করত, যাতে শুধু বংশবৃদ্ধি করা যায়। আজকের আমাজন জঙ্গলে নারী-পুরুষ, পুত্র-কন্যাশিশু কাছাকাছি গায়ে গায়ে থাকে।

তারা চক্রাকারে নেচেছে সাপের ভঙিতে। ঘুরে ঘুরে একই ঢঙের পুনরাবৃত্তি চলেছে–একসঙ্গে পা ঠুকিয়ে শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে। একদল দাঁড়িয়ে ড্রাম, নানা ঢঙের বাঁশি আরও নাম না জানা কিছু বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে যাচ্ছিল।

ধীরে ধীরে কিছু পর্যটক নৃত্যরতদের সঙ্গে যোগ দেন। এক আমাজন পুরুষের ইশারায় আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম। তিনি তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আমার দিকে। তিনি ডাকছেন আমায় তাঁর সঙ্গে নৃত্য-ছন্দে একাকার হতে। আমি এ সুযোগ হেলায় হারাব কেন! যদি এ হাত ধরে হয়ে যেতে পারি গ্রিক পুরাণের দেবী, তবে মন্দ কী! আমি এগিয়ে গেলাম। তাঁর হাত ধরলাম। তাঁর পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে তিকুনা আদিবাসীদের সুরে-ছন্দে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি তখন আর এই জগতের কেউ নই। আমি গ্রিক পুরাণের আমাজন নারী।

আরও পড়ুন

×