‘আমরা শুধু মানুষটার খোঁজ জানতে চাই’
স্বামী পারভেজ হোসেনের ছবি হাতে ফারজানা আক্তার
ফারজানা আক্তার
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৯ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ১৩:২৪
আমার স্বামী পারভেজ হোসেন ছিলেন বংশাল থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে তাঁকে গুম করা হয়। সঙ্গে ছিলেন আরও চারজন।
প্রতিদিনের মতো সেদিন সকালবেলা তিনি কাজে বের হন। আমাকে দুপুর ২টার দিকে ফোন দিয়ে বলেন, তিনি আসছেন। তাঁর বন্ধুর ছেলের জন্মদিনে যাওয়ার জন্য আমাকে তৈরি থাকতে বললেন। আমি বললাম, ‘কী করেন আপনি?’ জানালেন, ‘আমি শাহবাগে আছি। মুরগির খিচুড়ি খাইতেসি।’ তখন আমি অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। বললেন, ‘তুমি খাইবা?’ আমি বললাম, ‘না, আমি খাব না।’ তিনি জোর করলেন, ‘না, তোমার জন্য নিয়ে আসি।’ আমার জন্য নাকি খিচুড়িও নিয়েছিলেন। সেখানে ছয়জন ছিলেন। চারজনকে তুলে নিয়ে গেছে। বাকি দুইজন আমাকে পরে কথাগুলো বলেছেন। আমার স্বামীসহ দুটি গাড়িতে শাহবাগ থেকে একেক গাড়িতে দুইজন করে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়ির সামনে যিনি বসেছিলেন, তাঁর ডিবি কোট পরা ছিল।
তাঁর আসার কথা ছিল, আসেননি। বিকেল ৪টার দিকে আমি ফোন দিই। দেখি মোবাইলটা বন্ধ। ৬টায় মাগরিবের আজানের পর আমার ফোনে আবার একটা কল আসে, ওকে নাকি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সঙ্গে আরও যে দুইজন ছিলেন, তারা এলাকায় এসে বলেছেন। পরে আমি আর জানি না কী হয়েছে। অন্তঃসত্ত্বার কারণে কোথাও যেতে পারিনি। পরদিন যে তিন পরিবারের লোক ডিবিতে গেছেন, তাদের কোনো কিছু বলেনি ডিবি অফিস থেকে। পরে আমি ডিবি অফিসে যাই। সেখানে ওরা বলল যে, আমার স্বামী ওদের কাছে নেই। কুকুরকেও হয়তো এর চেয়ে বেশি দাম দেওয়া হয়। এখানে আমি যে একটি মানুষ এখানে দাঁড়িয়ে বলছি, আমার স্বামী এখানে আছে কিনা–তারা কোনো রেসপন্স করেনি। বাংলাদেশে গর্ভবতী মায়েদের অনেক সম্মান করা হয়। ওরা আমাকে কুকুর বলেও মনে করেনি।
আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরপর একটা লোক এসে বললো, ‘আপা, আপনি যদি আরেকটু দাঁড়ান, তাহলে আমাদের চাকরি থাকবে না। ওপর থেকে অর্ডার, আপনাকে এখান থেকে সরে যেতে হবে।’ রাত ১০টার দিকে আমি চলে আসি। পরে সবাই বলছিল, ডিবি আদালতে দিয়ে দেবে। তখন আমি কোর্টে প্রতিদিন সকাল বেলা যাই, বিকেল বেলায় বাসায় আসি। এরকম করতে করতে ১০ দিন হয়ে যায়। এরপর অনেকে বলল একটা জিডি করতে। জিডি করতে গেলাম থানায়। আমার জিডি নেওয়া হয়নি। পরে আমার দেবরকে দিয়ে একদিন পর কোনো বাহিনীর নাম উল্লেখ না করে একটা জিডি করি।
আরও চার-পাঁচ দিন পর আমার স্বামীর সঙ্গে গুম হওয়া সোহেল ভাইয়ের বাবা বললেন, ‘বউ পারভেজ যে নিখোঁজ, ওর জিডির ফটোকপি আর একটা ছবি নিয়া আসো।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যেতে হবে? পল্টন পার্টি অফিসে। কেন? চাচা বললেন, ‘ওরা তো গুম। ওদের কাগজগুলা জমা দিমু।’ ওইদিনই আমি প্রথম ‘গুম’ শব্দটা শুনি। আমি গুম শব্দটা বুঝিনি। তখন আমার আরেকটা বাচ্চার বয়স ৩ বছর। ওকে কী যত্ন করব-অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আমি কী ভালো-মন্দ খাবো, কী করব না করব, সব ভুলে গেছি! শুধু আমার একটাই কাজ ছিল–স্বামীকে খুঁজে বের করতে হবে।
‘মায়ের ডাক’-এর সঙ্গে আমি ২০১৪ সাল থেকেই যুক্ত হয়েছি। প্রেস ক্লাবে প্রথম একটা সম্মেলন যখন হয়, তখন আমাকে ফোন করা হয়। এভাবে দিন গুনতে গুনতে প্রায় ১২ বছর হয়ে গেল। শুধু দিনই যায়। আমি আমার লোকটাকে খুঁজে পাই না। এখন ৫ আগস্টের পর সবার সব পরিবর্তন হচ্ছে। সবাই ভালো আছে শুধু আমরা ভালো নাই।
আমার মেয়ের নাম আদিবা ইসলাম রিধি। ছেলেটার নাম আরাফ হোসেন। ছেলে তো বাবাকে দেখেইনি। আমি আমার দুই বাচ্চা নিয়ে আমার বোনের বাসায় সংসারে থাকি। কোনো কষ্টই এর কাছে তুচ্ছ। আমরা শুধু মানুষটার খোঁজ জানতে চাই।
- বিষয় :
- গুম
- গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন
- মায়ের ডাক
