এখনও তাদের প্রতীক্ষায়...
৫ আগস্ট বিগত সরকারের পতনের পর আবারও আশায় বুক বাঁধেন গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলো, মোশফিকুর রহমান জোহানের তোলা ছবির প্রদর্শনী থেকে
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ০১:০০ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৫ | ১২:৪৭
আজ ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গুমের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কী হয়েছে, সেই তথ্য উন্মোচন এবং ঘটনার সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে যখন বিভিন্ন মহল সোচ্চার; এমন এক বাস্তবতায় এবার দিবসটি পালিত হচ্ছে। এই এক বছরে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেছে। লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত
-------------------------------------------------------------
যেসব পরিবারের সদস্যকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেসব পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গড়ে ওঠা সংগঠন ‘মায়ের ডাক’। এটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন সানজিদা ইসলাম তুলি, যাঁর ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনকে ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর এক যুগ পার হতে চলল তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সুমন ছিলেন বিএনপির ঢাকা মহানগরের তৎকালীন ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের (বর্তমানে ২৫ নম্বর ওয়ার্ড) সাধারণ সম্পাদক।
সেই স্মৃতি রোমন্থন করে সানজিদা ইসলাম বলেন, ‘ভাইয়ার সঙ্গে আরও সাতজনকে র্যাব পরিচয়ে ওই দিন তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের প্রত্যেকেই বিএনপির কর্মী ছিলেন। তখনও গুম বিষয়টির সঙ্গে আমরা পরিচিত ছিলাম না। জানতাম না–একজন মানুষকে কেন বেআইনিভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে যাবে। তিনি অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন, তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠক ছিলেন। তার অর্থ এ নয় যে, আপনি তাঁকে গুম করে ফেলবেন। আমরা র্যাব অফিস থেকে কোনো রেসপন্স পাইনি। কেউ কেউ বলছিলেন দুয়েক দিনের মধ্যে আদালতে নেওয়া হবে। যখন দুই দিন পার হয়ে গেল, আম্মা থানায় গেলেন। সেখানে র্যাবের কথা উল্লেখ করায় জেনারেল ডায়েরি নেয়নি, এফআইআরও নেয়নি। তখন বুঝতে পারি, এটাই গুম। আমরা এর মুখোমুখি হতে যাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তখন আম্মা প্রথম মানববন্ধনে দাঁড়ান আমার ভাইয়ের জন্য। আটটা ফ্যামিলি, আটটা মা। তখন আমরা দেখলাম–ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে অনেক পরিবারই এমন গুমের শিকার। তারাও আসতে চাইছেন। এমন অনেক পরিবার আছে, যাদের একদিকে যেমন ভয় কাজ করছিল; অন্যদিকে অর্থনৈতিক অবস্থাও সচ্ছল নয় যে, নিখোঁজ মানুষটির জন্য দাঁড়াবে।’
সানজিদা ইসলাম তুলি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন যখন নিখোঁজ স্বজনের খোঁজ পাওয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেখল টেলিভিশনের পর্দায়, তারাও যোগাযোগ করল। তাদের একসঙ্গে পথচলার এক যুগ পার হয়েছে।
২০১৩ থেকে গুমের শিকার পরিবারগুলো মানববন্ধন শুরু করলেও ‘মায়ের ডাক’ নামে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৪ সালে। ওই বছরের শুরুতে একটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যদি নির্বাচনের জন্যই বিরোধীদলীয় কর্মীদের আটক রাখা হয়ে থাকে, তাহলে ভোটের পর নতুন সরকার আসার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে বলে মনে করছিলেন ওই পরিবারগুলোর সদস্যরা। কোনো পরিবর্তন হলো না। কেউ ফেরেনি। এরপর সামনে এলো নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ‘সাত খুন’। তখন নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভয়ংকর কিছুর আশঙ্কা কাজ করছিল। এমন এক প্রেক্ষাপটে ‘মায়ের ডাক’-এর পদচারণা শুরু; যেখানে পরবর্তী সময়ে যুক্ত হন হাজারো আক্রান্ত পরিবারের সদস্যরা।
বিগত সরকারের আমলে প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে আক্রান্ত পরিবারগুলোকে। ২০২৩ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসেও গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারবর্গকে শাহবাগে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে ‘মায়ের ডাক’ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে মানববন্ধন করতে বাধ্য হয়। সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘‘আমাদের কোনো জায়গায় প্রোগ্রাম করার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হতো না। পরিবারগুলোকে হয়রানি করা হতো, হুমকি দেওয়া হয়। যে ভাবিরা, তাদের আমরা ‘অর্ধ-বিধবা’ বলছি, তাদের রাত ৮টা, ৯টার সময় থানায় ডেকে নিয়ে যায়, সাদা কাগজে স্বাক্ষর করার জন্য। তা দিয়ে একটা বক্তব্য বানানো হতো যে, ওই লোকগুলো নিজেরাই পালিয়ে গেছে। যেটি আপনারা বিগত সরকারের আমলে প্রায়ই শুনতে পেয়েছেন।’’

২০১৭ সালের ৩ জুলাই সকালে রাজধানীর শ্যামলীর বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন কবি ও ভাবুক ফরহাদ মজহার। ১৮ ঘণ্টা পর গভীর রাতে নাটকীয়ভাবে যশোরে বাস থেকে তাঁকে উদ্ধার করার কথা জানায় র্যাব। এরপর ফরহাদ মজহারের বিরুদ্ধে ‘নিজেকে অপহরণের নাটক’ সাজানোর অভিযোগ তোলে পুলিশ। গত বছর হাসিনা সরকারের পতনের পর গুম ও ভয়ের সংস্কৃতি নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘যারা গুম হয়েছেন, তারা কি ফিরে আসবেন? তারা কোথায় আছেন? এটা থেকে যে ট্রমা তৈরি হয়, তা ভয়াবহ। এই ট্রমায় কেবল গুম হওয়া ব্যক্তি নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের মাঝেও ট্রমা তৈরি হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কারও পরিবারে যদি এভাবে কেউ গুম না হয়ে থাকে, তাহলে এটা বোঝা ভীষণ রকম কঠিন। আমি নিজেও গুম হয়েছিলাম। এটি টলারেট করা যে কত কঠিন, তা বুঝেছি। আমি দুইবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম। আমি ডাক্তারের কাছে যখন গিয়েছি, ডাক্তার আমাকে বলেছেন, এটা তুমি ভুলে যাও, ভাবো এই ঘটনাটি ঘটেনি। আমি তখন গুমের পেইনটা বুঝেছি। আপনি যখন জানবেন, আপনাকে বা আপনার পরিবারের কাউকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। অথবা ভয়াবহ নির্যাতন করা হবে। তাঁর অনুভূতিটা ভয়ংকর। আপনার ভাইকে আপনার সামনে থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তা যে ট্রমা তৈরি করে–এটি ভয়ংকর।’
সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘যুদ্ধটা আসলে আমাদের জন্য এখন আরও বেশি কঠিন। গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। কী পরিবর্তন হয়েছে আমাদের জন্য। হ্যাঁ, আমরা এখন কথা বলতে পারছি। এই পরিবারগুলোর জন্য আমরা কিছুই করতে পারিনি। তারা জানে না, ওই মানুষটির সঙ্গে কী হয়েছে। যারা করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।’
প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৭ আগস্ট গুম কমিশন গঠিত হয়েছে। তবে এখনও মামলার কোনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। গত বছর র্যাবের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে বিচারবহির্ভূত আটক ও হত্যার জন্য। অথচ তাদের পক্ষ থেকে জবাবদিহি বা বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একটা নির্দিষ্ট সময়ে কারা কোথায় নিয়োজিত ছিল, সেসব তথ্য থেকে খুব সহজেই দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ কাজে অগ্রগতি নেই বললেই চলে।
এখন মায়ের ডাকের সঙ্গে যুক্ত আছে হাজারেরও বেশি পরিবার। সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কমিশনে লিখিত আবেদনই হয়েছে ১৮৫০টি। আসল সংখ্যাটা আরও অনেক বড়। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে যাত্রা শুরু করতে গেলে এই মানুষদের আমরা অজ্ঞাতনামা রেখে যেতে পারি না। তাদের সঙ্গে ঘটা বীভৎসতা যেমন সামনে আনতে হবে; তেমনি এর বিচারের মধ্য দিয়ে আমরা প্রগতির পথে এগোতে পারব।’
