স্ট্রিট ফুড
রাজধানীতে অন্যরকম মেলা
ছবি :: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৯
ঢাকা। শহরটির নামেই যেন লেগে আছে ঘামের গন্ধ, যানজটের ক্লান্তি আর ব্যস্ততা। এর ফাঁকে হঠাৎ যদি গন্ধ ভেসে আসে ভাজা পরোটার, ধোঁয়া ওঠা হালিমের কিংবা টক-মিষ্টি-ঝালের এক দারুণ মিশ্রণের, তাহলেই বদলে যায় মুহূর্তটা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, সংসদ ভবন, বেইলি রোড, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন স্থান যেন এ শহরের গোপন ভোজনালয়। যেখানে স্ট্রিটফুড শুধু খাবার নয়; বরং মানুষের গল্প, সম্পর্কের উষ্ণতা এবং জীবনের স্বাদও বয়ে আনে। লিখেছেন দ্রোহী তারা
মোহাম্মদপুর: শহরের পেটপুজোর কবিতাখানা
মোহাম্মদপুর ঢাকার এক পুরোনো ও নান্দনিক এলাকা। এ এলাকাটি এখন পরিচিত আরও এক কারণে–তার স্ট্রিটফুড সংস্কৃতি। টাউন হল মোড় থেকে শুরু করে সলিমুল্লাহ রোড, বাবর রোড, তাজমহল রোড–প্রতিটি অলিগলি যেন স্বাদ আর গন্ধের এক বহতা নদী। সন্ধ্যার একটু আগে থেকেই যেন এ সড়কগুলোয় ভিড় জমতে থাকে, ঠিক যেমন করে কোনো উৎসবে মানুষের ঢল নামে। এখানে স্ট্রিটফুড মানে শুধুই ফুচকা কিংবা চটপটি নয়। বরং পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হালিম থেকে শুরু করে মগজের চপ, বিফ চাপ, ভুনা–সবই পাওয়া যায় রাস্তার ধারে। ‘সেলিম কাবাব ঘর’-এর মতো দোকানগুলোয় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর উপচে পড়ে মানুষের ভিড়।
মোহাম্মদপুরে খাবার শুধু স্বাদে নয়, উপস্থাপনাতেও ব্যতিক্রমী। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ‘শাহি দই ফুচকা’র কথা। টক দই, ঝাল ঘুগনি, কাজু-চানাচুরের ওপর ছিটানো পুদিনা পাতার চাটনি–এ যেন এক প্লেটেই ছোটখাটো উৎসব। চিতই পিঠার সঙ্গে ২৫ রকমের ভর্তা– আলুর দম, বেগুন ভর্তা, ডাল ভর্তা–এমনকি শুঁটকি মাছ ভর্তাও পাওয়া যায়। যেন একেকটা পদের নিজস্ব গল্প আছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ এলাকাটি যেন এক বিশাল খোলা হোটেলে রূপ নেয়। দোকানিরা হাঁকডাক দেন, চায়ের কাপ টুংটাং শব্দ করে আর চারপাশে ভেসে বেড়ায় গরম তেলে ভাজার ঘ্রাণ। চায়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে উদ্ভাবনী–মাখন চা, মালাই চা কিংবা বিশেষ মসলাদার সিঙ্গাপুরি চা।
মিরপুর: লাভ রোডে প্রেম ও ফুচকার জ্যামিতি
মিরপুরের ‘লাভ রোড’ এখন ঢাকার অন্যতম পরিচিত স্ট্রিটফুড হটস্পট। একসময়ের নীরব রাস্তা এখন পরিণত হয়েছে সন্ধ্যার পর এক রঙিন মেলায়। এখানে প্রতিদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই ভিড় জমে যায় ফুচকার দোকান, তান্দুরি ঘর, শর্মা কর্নার আর বর্তমানে কোরিয়ান কাওয়াই কালচারে গড়া ছোট রেস্টুরেন্টের সামনে।
মিরপুরের স্ট্রিটফুডের একটা বিশেষ দিক হলো, এর মূল ভোক্তা তরুণ সমাজ। স্থানীয় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা নতুন ইউটিউবার সবাই এসে জড়ো হন এ লাভ রোডের হাটে। একেকজনের হাতে ফুচকার প্লেট, চটপটির বাটি কিংবা ঝালমুড়ির ঠোঙা। এখানকার ফুচকাখ্যাত সিজলিং টক-ঝালের জন্য, আবার পান পাওয়া যায় ২০ ধরনের স্বাদে–চকলেট থেকে শুরু করে স্পাইসি।
এই এলাকায় আরও চোখে পড়ে ভ্রাম্যমাণ ছোট ছোট কুকড ফুড কার্ট; যেখানে বিক্রি হয় মিনি পিৎজা, মোজারেলা স্টাফড কাবাব, ডিম পরোটা, চিকেন রোল আর ফ্রুট কাচ্চি। ভিড় সবচেয়ে বেশি হয় শুক্র ও শনিবার। তবে কলেজ ছুটির দিনগুলোতেও ব্যতিক্রম নয়। এ ছাড়া স্বল্পমূল্যে সুশি থেকে শুরু করে সিফুডের বিরাট সম্ভার রয়েছে মিরপুরে।
এখানে খাবার খাওয়ার পাশাপাশি চলে ইনস্টাগ্রাম রিলস তৈরি, সেলফি, টিকটক লাইভ। এ যেন আধুনিক শহুরে খাদ্য-সংস্কৃতির নতুন রূপ। মিরপুরের স্ট্রিটফুড শুধুই পেট ভরায় না; বরং শান্তি দেয়, বন্ধুতা ও প্রেমে রং ছড়ায়।
খিলগাঁও: সড়কজুড়ে খাবারের ঘ্রাণ
খিলগাঁও রেলগেট পার হলেই সন্ধ্যার পরপর জমে ওঠে হালকা ধোঁয়ার রাজ্য। এখানে স্ট্রিটফুড মানেই চটপটি, ফুচকা, ডিম চপ, আলুর চপ, গরম গরম ভাজি, দোসা, চায়নিজ ও ফাস্টফুড আইটেমসহ সবকিছু। রিকশাচালক থেকে অফিসফেরত মানুষ, স্কুলফেরত কিশোরী থেকে গৃহিণী–সবার চাহিদা অনুযায়ী একেকটি স্টল সাজানো।
বিকেল ৪টা থেকে মধ্যরাত–এ সময়টাতেই সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন রাস্তার পাশের খাবার বিক্রেতারা। দামে সস্তা, স্বাদে খাঁটি–এ মূলমন্ত্রই টিকে থাকার পথ খুলে দিয়েছে তাদের জন্য। খিলগাঁওয়ের খাদ্যে মিশে আছে স্থানীয়তার স্বাদ। আবাসিক এলাকায় বাসার ঠিক নিচেই মুখরোচক খাবার খেতে একবার হলেও নামেন বাসিন্দারা। চওড়া রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে একটু চাওমিন, গরম পিৎজা কিংবা ঠান্ডা জুসে পেটের শান্তি করে নেন।
বেইলি রোড: ফিউশন ও ফ্লেভারের খেলা
বেইলি রোডে গেলে মনে হবে যেন স্ট্রিটফুডও আজকাল কলেজপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীর মতো সাজগোজ করে। সুশি রোলের পাশাপাশি বারবিকিউ, তাজা লেমনেড, ওয়াফল বা ক্রিসপি চিকেন–সবই পাওয়া যায় পসরা সাজানো ছোট ছোট ফুড কার্টে। মূলত সন্ধ্যার পর অফিসফেরত কর্মজীবী আর তরুণ দম্পতিরাই হন এসব খাবারের প্রধান ভোক্তা।
তবে দাম এখানে একটু চড়া; পরিবেশনা একটু ঝাঁ-চকচকে। তরুণ প্রজন্মের লাইফস্টাইলের সঙ্গে খাপ খায় বেইলি রোডের ফুডকোর্টগুলো। গরম লুচির সঙ্গে কাবাব কিংবা স্যুপ যেমন তৃপ্তি দেয়, একই সঙ্গে খাবারের ছোট ভিডিও বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তার প্রচারে বাড়ে ভিউ। মূলত বেইলি রোডে খাবার মানে ‘এক্সপেরিয়েন্স’।
এই শহর কখনও থেমে থাকে না। থেমে যায় মানুষের পা, যখন রাস্তার ধারে কেউ বলে– ‘ভাই, একটা ফুচকা খাবেন?’ এ প্রশ্নেই লুকিয়ে থাকে ঢাকার সত্যিকারের আমন্ত্রণ। v
- বিষয় :
- ফাস্টফুড
