ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল উয়ারী-বটেশ্বর

বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল উয়ারী-বটেশ্বর
×

নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরে চলছে প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনের খোঁজ

রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩৯ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

নরসিংদীর দুটি গ্রাম বাংলার প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা এক উন্নত নগরসভ্যতা ছিল বিশ্ববাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যা প্রাচীন রোমান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ ক্লডিয়াস টলেমির মানচিত্রের ‘সোনাগড়া’ বা গঙ্গারিডাই রাজ্যের অংশও হতে পারে।

প্রচলিত ধারণা ছিল, বাংলার নগরসভ্যতার ইতিহাস খুব বেশি প্রাচীন নয়। এ ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে নরসিংদীর উয়ারী ও বটেশ্বর গ্রামের প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার। মাটির নিচ থেকে উঠে আসা এক দুর্গনগরী প্রমাণ করেছে, আড়াই হাজার বছর আগেই ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে এক অত্যন্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা গড়ে উঠেছিল, যা রোমান সাম্রাজ্য থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

এই বিস্ময়কর ইতিহাসের সূচনা হয় ১৯৩৩ সালে, যখন উয়ারী গ্রামের শ্রমিকরা মাটি খনন করতে গিয়ে রুপার মুদ্রার একটি বিশাল ভান্ডার খুঁজে পান। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ হানিফ পাঠান এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে কয়েকটি মুদ্রা সংগ্রহ করেন এবং বুঝতে পারেন এগুলো বঙ্গ-ভারতের প্রাচীনতম মুদ্রা। ছেলে হাবিবুল্লাহ পাঠানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কয়েক দশক ধরে এক অবিশ্বাস্য সংগ্রাম চালিয়ে যান। নিজেদের অর্থ ও শ্রমে তারা প্রত্নতত্ত্ব স্থলটির অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। কৃষকের লাঙলে উঠে আসা পুঁতি, ভাঙা মৃৎপাত্র বা বৃষ্টির জলে উন্মোচিত হওয়া হাজারো প্রত্নবস্তু তারা পরম যত্নে সংগ্রহ করেন। বাবা-ছেলের নিরলস প্রচেষ্টা না থাকলে উয়ারী-বটেশ্বরের ইতিহাস হয়তো চিরতরে হারিয়ে যেত।

অবশেষে ২০০০ সাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে বৈজ্ঞানিক খননকাজ শুরু হলে ইতিহাসের পর্দা সরতে থাকে। কার্বন-১৪ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, এই নগরীর বয়স অন্তত খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দ।
এর স্থাপত্যশৈলী যে কোনো আধুনিক নগর পরিকল্পনাবিদকে বিস্মিত করবে–

দ্বি-স্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
নগরীর সুরক্ষার জন্য ছিল দুই স্তরের প্রাচীর। কেন্দ্রে ছিল একটি ৬০০ বর্গমিটার আয়তনের অভ্যন্তরীণ দুর্গ, যা সম্ভবত ছিল প্রশাসনিক কেন্দ্র। একে ঘিরে ছিল ৩০ মিটার চওড়া পরিখা। এর বাইরে প্রায় ৫.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২০ মিটার প্রশস্ত এবং ১০ মিটার উঁচু এক বিশাল মাটির প্রাচীর (স্থানীয়ভাবে ‘অসম রাজার গড়’ নামে পরিচিত) পুরো নগরীকে সুরক্ষা দিত।

উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা
খননকাজে প্রায় ১৮০ মিটার দীর্ঘ একটি পাকা রাস্তার সন্ধান পাওয়া গেছে; যা ইট, চুন ও মৃৎপাত্রের ভাঙা অংশ দিয়ে তৈরি। উপমহাদেশের ইতিহাসে সিন্ধুসভ্যতার পর এত প্রাচীন পাকা রাস্তার নিদর্শন অত্যন্ত বিরল।

প্রাচীনতম বসতি
এখানকার সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি হলো গর্ত-বসতি বা ভূগর্ভস্থ বাসস্থান। এটি প্রমাণ করে, লৌহ যুগের এই নগরী গড়ে ওঠার বহু আগে, তাম্র-প্রস্তর যুগেই এখানে মানুষের বসবাস ছিল।

শিল্প ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি 
উয়ারী-বটেশ্বর ছিল এক সমৃদ্ধ শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানকার অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ছিল মূলত দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর–
১. এই নগরী ছিল পুঁতি বা গুটিকা তৈরির এক বিশাল শিল্পকেন্দ্র। কার্নেলিয়ান, অ্যাগেট, জ্যাসপারের মতো দামি পাথর বাইরে থেকে আমদানি করে এখানে দক্ষ কারিগররা সেগুলোকে অপূর্ব অলংকারে রূপ দিতেন। এখানে প্রচুর পরিমাণে অসম্পূর্ণ পুঁতি ও কাঁচামাল পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এটি ছিল একটি গণ-উৎপাদন কেন্দ্র। নকশা করা পুঁতি এবং সোনার পাত মোড়ানো কাচের পুঁতি তৈরির প্রযুক্তি তাদের জানা ছিল, যা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির পরিচায়ক।
২. এখানকার কারিগররা লোহা গলিয়ে অস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরি করতেন। পাশাপাশি উন্নত কৃষিব্যবস্থা নগরীর বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দিত। এখানে ধান, যব, ডাল এবং তুলার চাষ হতো, যা একটি শক্তিশালী বস্ত্রশিল্পের দিকেও ইঙ্গিত করে।

বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্র 
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থানই ছিল উয়ারী-বটেশ্বরের বাণিজ্যিক সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। এই নদীপথ ব্যবহার করে বণিকরা বঙ্গোপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্য নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতেন। এর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অকাট্য প্রমাণ মেলে আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তু থেকে–
মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতি: এখান থেকে হাজার হাজার রুপার মুদ্রা পাওয়া গেছে, যা মৌর্য সাম্রাজ্যের পূর্ববর্তী জনপদ এবং মৌর্য শাসনামলের। এটি একটি উন্নত মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতির প্রমাণ।
বিদেশি মৃৎপাত্র: এখানে পাওয়া কালো মসৃণ মৃৎপাত্র উত্তর ভারতের সঙ্গে, রুলেটেড মৃৎপাত্র রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে এবং নবযুক্ত মৃৎপাত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।

অনেক গবেষক মনে করেন, উয়ারী-বটেশ্বরই গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির উল্লিখিত বিখ্যাত বাণিজ্যকেন্দ্র ‘সোনাগড়া’। এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক সরঞ্জাম দেখে অনেকে একে সেই শক্তিশালী ‘গঙ্গারিডাই’ রাজ্যের রাজধানী বলেও মনে করেন; যার ভয়ে মহাবীর আলেকজান্ডারও ভারত অভিযান থেকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন।

প্রকৃতির সামনে এক মহানগরীর পতন 
যে ব্রহ্মপুত্র নদ ছিল উয়ারী-বটেশ্বরের প্রাণ, সেই নদই একসময় এর ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের দিকে ব্রহ্মপুত্র তার গতিপথ আকস্মিকভাবে পরিবর্তন করে। এর ফলে সৃষ্ট এক ভয়াবহ বন্যায় পুরো নগরী মাটির নিচে তলিয়ে যায়। নদের পলিমাটির পুরু স্তর প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরগুলোকে ঢেকে দিয়েছে, যা এক আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রমাণ। বাণিজ্য পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং ভয়াবহ বন্যার আঘাতে এক সময়ের সমৃদ্ধ নগরী পরিত্যক্ত হয় এবং কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।

উয়ারী-বটেশ্বরের আবিষ্কার বাংলার ইতিহাসকে কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে নিয়ে গেছে এবং প্রমাণ করেছে, প্রাচীন বাংলা বিশ্বসভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ভূখণ্ড ছিল না। এটি ছিল তার সময়ের এক সক্রিয় এবং প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তি। এই অমূল্য প্রত্নস্থলটি বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের এক গৌরবময় অধ্যায়। এর যথাযথ সংরক্ষণ এবং আরও গবেষণা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে অপেক্ষা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতির, যা এই হারানো মহানগরীকে তার সঠিক স্থান ফিরিয়ে দেবে।

আরও পড়ুন

×