ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আশি বছরে জাতিসংঘ

সংহতি ও চ্যালেঞ্জের বিশ্ব মঞ্চ

২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস

সংহতি ও চ্যালেঞ্জের বিশ্ব মঞ্চ
×

হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৪০ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮০তম বার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয় জাতিসংঘ সনদ, যা বিশ্বজুড়ে শান্তি ও নিরাপত্তার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল এক গভীর প্রয়োজনের তাগিদ থেকে। পুরোনো লিগ অব নেশনস আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে ব্যর্থ হওয়ায়, বিশ্বনেতারা এমন একটি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, যা শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আলোচনাকে আরও কার্যকর করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ছিল এর প্রধান চালিকাশক্তি। এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন মিলে ১৯৪২ সালের জানুয়ারি মাসে ২৬টি দেশের স্বাক্ষর নিয়ে মূল জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র তৈরি করে, যা ছিল অক্ষশক্তির (জার্মানি, ইতালি এবং জাপান) বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।

১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল সান ফ্রান্সিসকো কনফারেন্সে জাতিসংঘ সনদের মূলনীতিগুলো প্রথম প্রণীত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী–ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে রক্ষা করা, মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিত করা এবং বৃহত্তর স্বাধীনতার মধ্যে সামাজিক অগ্রগতি ও জীবনযাত্রার মান উন্নীত করা। সনদের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল–সমান অধিকার ও সব মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতিকে সম্মান জানানো এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মানবিক সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শান্তি বজায় রাখার বাস্তব দায়িত্ব দেওয়া হয় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ওপর। এর স্থায়ী সদস্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন। তবে প্রতিটি সদস্যের একে অপরের সিদ্ধান্তের ওপর ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার থাকায়, সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। উইনস্টন চার্চিল তখন এই বৈশ্বিক সংস্থাকে কমিউনিস্ট সম্প্রসারণ ঠেকাতে এবং একটি নতুন, ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ গঠনে ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়েছিলেন; কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের গঠনগত কারণেই সেই কাজটি সহজ ছিল না।

জাতিসংঘ বৈশ্বিক পরিসরে, বৈশ্বিক স্বার্থে নির্মিত হয়েছিল। ১৯৪৫ সাল থেকে এটিই সেই স্থান, যেখানে দেশগুলো বৈশ্বিক সমস্যার সম্মিলিত সমাধান খুঁজতে এক হয়। এই সমাধান উত্তেজনা প্রশমিত করে, সেতু নির্মাণ করে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। এটি দারিদ্র্য দূরীকরণ, টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং দুর্বলতমদের পাশে দাঁড়ানোর পথ দেখায়। সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা মানুষের কাছে জীবন রক্ষাকারী ত্রাণ পৌঁছে দেয় জাতিসংঘ। জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ গবেষণার মতো বিষয়গুলো মোকাবিলাতেও জাতিসংঘ কাজ করে যাচ্ছে।

তবে নানা নীতি, আদর্শ, প্রতিনিধিত্বের সমতা, প্রশাসন এবং সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষমতার জন্য জাতিসংঘ সমালোচিতও হয়েছে। যুদ্ধ-সংঘাত বন্ধের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অবস্থান নিয়ে আগে থেকেই অনেক বিতর্ক ছিল। তবে বর্তমানে জাতিসংঘ সবচেয়ে সমালোচিত হচ্ছে গণহত্যার মতো অপরাধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ায়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, গাজা গণহত্যা বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় কার্যত জাতিসংঘ অকার্যকর হয়ে পড়েছে! 

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি নিরাপত্তা পরিষদকে একটি ‘সেকেলে’, ‘অযৌক্তিক’ এবং ‘অকার্যকর ব্যবস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ থামাতে এই পরিষদের ব্যর্থতা সামগ্রিকভাবে সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই পরিষদ আজকের বিশ্বের সঙ্গে মানানসই নয়। আজ আমরা সবচেয়ে ভয়ানক যে সংঘাতগুলোর মুখোমুখি– সুদান, গাজা, ইউক্রেন– সেগুলো বন্ধ করার সক্ষমতার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগতভাবে নিরাপত্তা পরিষদ ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিষদের এই রাজনৈতিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থা এবং বিশেষত এর মানবিক কাজে যুক্ত সংস্থাগুলো গাজায় ফিলিস্তিনিদের কাছে প্রয়োজনীয় পরিষেবা সরবরাহ করে চলেছে। তবে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যর্থতা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজের জন্য এক গুরুতর প্রতিবন্ধকতা।’

জাতিসংঘ মহাসচিবের মতে, ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর প্রতি স্থানীয়দের আস্থা রয়েছে। সংস্থাটি গাজায় মানবিক সহায়তার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। তবে তিনি ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জ তৈরির নিন্দা জানান।

আজকের এই সমস্যা জর্জরিত বিশ্বে, শুধু আশায় বুক বাঁধলে চলবে না। আশার জন্য প্রয়োজন নির্ধারিত পদক্ষেপ এবং শান্তি, সমৃদ্ধি ও একটি প্রাণবন্ত গ্রহের জন্য বহুপক্ষীয় সমাধান। আশা তখনই সফল হবে, যখন সব দেশ একযোগে কাজ করবে। সেই সংহতি এবং সম্মিলিত পদক্ষেপের জন্য জাতিসংঘের গুরুত্ব অপরিসীম। জাতিসংঘের কাজ সবসময় এর সনদে উল্লিখিত মূল্যবোধ ও নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইন, সেই সঙ্গে মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকারের মূলে নিহিত।

আরও পড়ুন

×