সৌরশক্তির পরবর্তী প্রজন্ম
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ পরীক্ষা করছেন একজন গবেষক
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৪১ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি জীবাশ্ম-জ্বালানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২২,২১৫ মেগাওয়াট থেকে ২৭,১৬২ মেগাওয়াটের মধ্যে। এই সক্ষমতার প্রাথমিক উৎসগুলো হলো–প্রাকৃতিক গ্যাস (৫৬ শতাংশ) এবং ফার্নেস অয়েল (২৭ শতাংশ)। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাস দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে; যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত করছে আমাদের। নবায়নযোগ্য জ্বালানি মোট স্থাপিত সক্ষমতার মাত্র ৪.৫ শতাংশ (প্রায় ১,১৮৩ মেগাওয়াট) পূরণ করে। এই নবায়নযোগ্য সক্ষমতার প্রায় ৮০ শতাংশই সৌরশক্তি থেকে আসে। তবে সৌরশক্তি প্যানেলের ক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সে কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে বিশ্বব্যাপী। সৌর প্যানেলের সক্ষমতা বাড়ানোর গবেষণা এর মধ্যে অন্যতম। এমনই এক গবেষণায় অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীরা বিস্ময়কর উপাদান সমন্বিত করে সৌর প্যানেলের সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন মাইলফলক রেখেছেন।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডের উপকণ্ঠে একটি গবেষণাগার পরিচালনা করে অক্সফোর্ড পিভি, যা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিরই একটি স্টার্টআপ বা উদ্যোগ। এটি বিশ্বের এমন কয়েকটি স্টার্টআপের মধ্যে অন্যতম, যারা এমন একটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যাকে অনেকেই সৌরশক্তির ‘গেম-চেঞ্জিং’ পরবর্তী প্রজন্ম বলে মনে করেন; আর তা হলো ট্যান্ডেম পেরোভস্কাইট সোলার সেল। গবেষকদের মতে, পেরোভস্কাইট সোলার সেলের অগ্রগতি আমাদের সৌরশক্তির বিকাশে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। তবে এসবই নির্ভর করছে বাস্তব জগতে তার কার্যক্ষমতার ওপর। এই প্রযুক্তিতে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সৌর প্যানেলে ব্যবহৃত সিলিকনের সঙ্গে পেরোভস্কাইট যুক্ত করা হয়। এর ফলে সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সৌর প্যানেলের ক্ষমতা বহুলাংশে বেড়ে যায়।
প্রসঙ্গত, পেরোভস্কাইট হলো ১৮৩৯ সালে ইউরেশিয়ার উরাল পর্বতমালায় আবিষ্কৃত একটি খনিজ। তবে আজকের দিনে এই নামটি বিভিন্ন কৃত্রিমভাবে তৈরি উপাদানকে বোঝায়, যার স্ফটিক কাঠামো সেই খনিজটির মতো। এটি ব্রোমিন, ক্লোরিন, সিসা এবং টিনের মতো সহজলভ্য উপকরণ থেকে তৈরি করা যেতে পারে।
এই বিস্ময়কর উপাদানে তৈরি সৌর প্যানেল সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ছাদ থেকে উৎপন্ন শক্তিকে কম খরচে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে দিতে পারে। এ ছাড়াও এটি স্যাটেলাইট এবং বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যবহৃত হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের দেশের ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তিগত বিকাশ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশে ইউটিলিটি-স্কেল এবং গ্রিড-সংযুক্ত সৌরশক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বর্তমানে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে, যেখানে বর্তমানে গ্রিড-সংযুক্ত সৌর সক্ষমতা ১,০০০ মেগাওয়াট অবদান রাখছে। ২০২৪ সাল নাগাদ, ১০টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪৫৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। দেশের বৃহত্তম একক সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র হলো তিস্তা ২০০ মেগাওয়াট সোলার পার্ক, যা গাইবান্ধায় ২০২৩ সালে চালু হয়েছিল। তবে বাংলাদেশে সৌরশক্তির বহুগুণ বিস্তার সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সৌরশক্তির নতুন দিগন্ত
বর্তমানে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তি প্রায় ৭ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে এবং এর বৃদ্ধি দ্রুত হচ্ছে। ২০২৪ সালে এটি ২৯ শতাংশ বেড়েছে। এটি বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় সস্তা নতুন বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌর প্রযুক্তির অগ্রগতি সম্ভবত একটি যুগান্তকারী মোড়ে পৌঁছে গেছে, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ বাজারগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।
সিলিকনের চেয়ে পেরোভস্কাইটের প্রধান সুবিধা হলো, এটি আলোর স্পেকট্রাম বা বর্ণালির আরও বেশি অংশকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। এর কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো কোষগুলোর অভ্যন্তরে ইলেকট্রনের উচ্চ গতিশীলতা। পেরোভস্কাইট সেলগুলো কিছু ক্ষেত্রে এককভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সিলিকনের সঙ্গে পেরোভস্কাইট ব্যবহার করলে সূর্যের শক্তি শোষণ করার ক্ষেত্রে সিলিকন এবং পেরোভস্কাইট উভয়ের সুবিধাই পাওয়া যায়। সিলিকন সেলের কার্যকারিতা সাধারণত ২১-২৩ শতাংশ হয় এবং এর সর্বোচ্চ সীমা প্রায় ৩৩ শতাংশ। পেরোভস্কাইট ট্যান্ডেম সোলার সেলে সর্বোচ্চ কার্যকারিতা ৪৭ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। অক্সফোর্ড পিভি-এর প্রচেষ্টা ফল দিচ্ছে। ২০২৪ সালে তারা আবাসিক পরিসরের সোলার মডিউলের জন্য ২৬.৯ শতাংশ কার্যকারিতার নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে।
অক্সফোর্ড পিভি-এর অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাদের প্যানেলগুলো একই এলাকা থেকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সক্ষমতা রাখায়, স্ট্যান্ডার্ড সিলিকন প্যানেলের তুলনায় বিদ্যুতের খরচ প্রায় ১০ শতাংশ কমাতে পারে।
অক্সফোর্ড পিভি বর্তমানে জার্মানির একটি কারখানায় তাদের সেল উৎপাদন করছে এবং সম্প্রতি তারা প্রায় ১০০ কিলোওয়াটের (যা যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৪টি পরিবারের জন্য যথেষ্ট) প্রথম পাইলট প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্যিক সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রে শুরু করেছে। অক্সফোর্ড পিভি একা নয়; অন্যান্য কোম্পানি, যেমন এমআইটি এবং স্ট্যানফোর্ডের স্পিনআউট সুইফট সোলার, আমেরিকান টাওয়ার করপোরেশনের সঙ্গে পাইলটিং শুরু করেছে। চীনের বৃহত্তম সোলার বাজারও দ্রুত এগোচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিলে চীনা সৌর বৃহৎ প্যানেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ত্রিনাসোলার একটি ট্যান্ডেম সোলার সেলে ৩১.১ শতাংশ কার্যকারিতার নতুন রেকর্ড ঘোষণা করেছে।
পেরোভস্কাইট ট্যান্ডেম সোলার প্যানেলের কিছু দুর্বলতাও আছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত প্রক্রিয়ার কারণে এই প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাব সাধারণ সিলিকন সোলার পিভি-এর চেয়ে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। যদিও এর বর্ধিত আউটপুট এই প্রভাবকে পুষিয়ে দেয়, কারণ একই পরিমাণ শক্তির জন্য কম প্যানেলের প্রয়োজন হয়। বেশি সিলিকন প্যানেল ব্যবহার করলে পরিবেশগত প্রভাব আরও বেশি হতো।
ইউএস ন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি ল্যাবরেটরির গবেষক জোসেফ বেরি বলেন, ‘প্যানেলগুলোর শক্তি উৎপাদনের তুলনায় সিসার ব্যবহার খুবই কম, যা একই পরিমাণ শক্তি কয়লা পুড়িয়ে উৎপন্ন করার চেয়ে অনেক কম।’ তিনি আরও মনে করেন, প্যানেল অকার্যকর হয়ে পড়লে বিষাক্ততার সমস্যা এড়ানো যেতে পারে উপযুক্ত পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।’ অক্সফোর্ড পিভি জানিয়েছে, তাদের প্যানেলগুলো স্ট্যান্ডার্ড সিলিকন প্যানেলের (যেগুলোতেও সিসা থাকে) মতোই পুনর্ব্যবহারের উপযুক্ত করে তৈরি করা।
গাড়ি এবং মহাকাশযান
কিছু নির্মাতা পেরোভস্কাইট প্যানেলগুলোর বৈদ্যুতিক গাড়ির ছাদে লাগানো নিয়ে কাজ করছে। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্পিন অব ক্যালুক্স-এর সিইও স্কট গেব্রিয়াল মনে করেন, পথে চার্জিং স্টেশনের কাছে ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে গেলে ট্যান্ডেম সোলার প্যানেলগুলো জরুরি রিজার্ভ ক্ষমতা দিতে পারে। অক্সফোর্ড পিভি বৈদ্যুতিক যানবাহনে তাদের প্যানেল ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট খাতের নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনা করছে। ট্যান্ডেম পেরোভস্কাইট প্যানেলগুলো মহাকাশের অ্যাপ্লিকেশনের জন্যও বিবেচিত হচ্ছে। প্যানেলগুলো অল্প আয়ুষ্কালের নতুন প্রজন্মের সস্তা স্যাটেলাইটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তা সম্ভব হলে সৌরশক্তির বিকাশে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করা হবে।
বিবিসি ফিউচার অবলম্বনে
- বিষয় :
- সৌরশক্তি
- শাহেরীন আরাফাত
- উদ্ভাবন
