আলীকদমে আলট্রা ম্যারাথন
ফিনিশ লাইনে পৌঁছানোর পথে ম্যারাথনে অংশগ্রহণকারীরা
আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২২ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
আলীকদম-পোয়ামুহুরী সড়ক। বান্দরবান জেলার মাতামুহুরীর পাশঘেঁষে তৈরি এ নয়নাভিরাম সড়কে রয়েছে মোহনীয় সব বাঁক। সঙ্গে যোগ হয়েছে সবুজ পাহাড়ের নৈসর্গিক শোভা। দৃষ্টিনন্দন কিন্তু চ্যালেঞ্জিং এই পথে আলট্রা ম্যারাথন আয়োজন করে দৌড়বিদদের দৌড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’।
৫ ডিসেম্বর, ভোর সাড়ে ৫টা। রেস ডিরেক্টরের নির্দেশনা পেতেই পাহাড়ি নদী মাতামুহুরীর পাশঘেঁষে নির্মিত আলীদকমের নয়নাভিরাম সড়কে ছুটলেন দৌড়বিদরা। সবুজ পাহাড়ের নৈসর্গিক শোভা আর মোহনীয় সব বাঁক পেরিয়ে সবার লক্ষ্য একটাই–পোয়ামুহুরী লুপে পৌঁছানো। সেখান থেকে ইউটার্ন নিয়ে ফের শুরুর স্থানে ফেরা। দীর্ঘ ও পাহাড়ি এই চ্যালেঞ্জিং পথে প্রতিযোগীদের দৌড়াতে হবে ৫২ কিলোমিটার। এই বিভাগে অংশ নিয়েছেন ১৬০ জন।
একই সময়ে আলীকদম-পোয়ামুহুরী সড়কে আরেকটি ২৫ কিলোমিটার আলট্রা ম্যারাথনের আয়োজন করে ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স; যেখানে অংশ নেন ২৭৫ জন। প্রতিযোগীরা আলীকদম গার্লস হাইস্কুল থেকে যাত্রা শুরু করে গন্তব্যে পৌঁছান; যেখানে ১৫ থেকে ষাটোর্ধ্ব বয়সীরা অংশ নেন।
আয়োজক ও রেস ডিরেক্টর ফারহান জামান জানান, ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স একটা মাউন্টেন ক্লাব। সেই হিসেবে আমাদের সঙ্গে পাহাড়ের সম্পর্ক। আমরা যেহেতু পাহাড়কে প্রমোট করি, পাহাড়কে ভালোবাসি এবং সাসটেইনেবল ট্যুরিজম; যেটি সাসটেইনেবল ও ইকোফ্রেন্ডলি ট্যুরিজম সেটিকে প্রমোট করার চেষ্টা করি। এ জন্য আমাদের এই আয়োজন। প্রতিবার আমাদের ম্যারাথনে ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ আসছেন। তাদের মধ্যে যদি পাঁচজন লোকও পাহাড়কে আমাদের মতো করে ভালোবাসে, তাহলে আমাদের মনে হয় যে আমরা সাকসেসফুল।’
ফারহান বলেন, ‘মাউন্টেনারিং একটি কষ্টসহিষ্ণু খেলা এবং আলট্রা রানিংও একটা কষ্টসহিষ্ণু খেলা। এখন সমতলের আলট্রার চেয়ে পাহাড়ের আলট্রা অনেক বেশি কঠিন। তাই এখানে একটা পরীক্ষাও হয়ে যায় সামর্থ্যের।’
ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের আলট্রা ম্যারাথন থেকে উপার্জিত অর্থ যায় বান্দরবানের তিনটি আদিবাসী স্কুলে। এ ছাড়া প্রতি সিজনেই আদিবাসী ছেলেমেয়েকে সুযোগ দিচ্ছে ক্লাবটি; যাতে তারা অন্যদের সঙ্গে দৌড়ে কিছু শিখতে পারে, উৎসাহিত হয়।
সিজন-থ্রি আলট্রা ম্যারাথনের প্রতিপাদ্য ছিল–‘ফর ওয়াইল্ড লাইফ, ফর আর্থ’। এ নিয়ে ফারহান বলেন, ‘এই যে বান্দরবানে অনেক বন্যপ্রাণী ধ্বংস হয়ে গেছে। বন্যপ্রাণী রক্ষায় সিম্বল হিসেবে আমরা বেছে নিয়েছিলাম সবচেয়ে কালারফুল একটা প্রাণী রাজধনেশকে। বান্দরবানে একসময় প্রচুর রাজধনেশ দেখা যেত। এখন তা চোখেই পড়ে না। তাই টি-শার্ট থেকে শুরু করে পুরস্কার– সবখানেই রাজধনেশকে রাখতে চেয়েছি।’
৫২ কিলোমিটারের রেস শুরু হয়েছিল ভোর সাড়ে ৫টায়। এর কাট অফ টাইম ছিল ১০ ঘণ্টা, প্রতিযোগীরা বেলা সাড়ে ৩টায় ফিনিশিং লাইনে পৌঁছায়। ২৫ কিলোমিটারের দৌড় শুরু হয় ভোর ৬টায়। এই রেস শেষ হয় সকাল সাড়ে ১০টায়। সব মিলিয়ে ১০টি হাইড্রেশন বুথ করেছেন আয়োজকরা; যেন প্রতিযোগীরা বিশ্রাম কিংবা খাবার নিতে পারেন।
৫২ কিলোমিটার রেসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন সাজ্জাদ হোসাইন স্নিগ্ধ। তিনি বলেন, ‘বান্দরবান আলীকদমের ম্যারাথনটা ছিল আমার জন্য একেবারে ভিন্নরকম এক অভিজ্ঞতা। খাড়া পাহাড়, টানা ক্লাইম্বে শরীর বারবার ক্লান্ত হয়েছে, কিন্তু চ্যালেঞ্জিং মোমেন্টে নিজেকে চিনতে পেরেছি। এই রোডে দৌড়ানোর জন্য দরকার ধৈর্য, ফোকাস আর নিজের ওপর বিশ্বাস।’
আলট্রা ম্যারাথন তথা ২৫ কিলোমিটারে নারী ক্যাটেগরিতে মুকুট পরেছেন ছায়ীদা ফাতমী ওয়ার্দা। তিনি জানান, ‘এর আগে এত চ্যালেঞ্জিং রেসে আমি অংশ নিইনি। এ জন্য একটু নার্ভাস ছিলাম। তবে যখন দৌড়ানো শুরু করলাম ধীরে ধীরে সেটি কেটে গেছে। রাস্তার দুধারের আদিবাসী শিশুরা যখন ক্লাপ করছিল, তখন উজ্জীবিত হচ্ছিলাম। পাহাড়ি পথটা একটা সময় খুব কঠিন মনে হচ্ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত আমি পেরেছি। সেই মুহূর্ত ভোলার মতো নয়।’
- বিষয় :
- ম্যারাথন
- আশরাফুল ইসলাম আকাশ
