ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সালতামামি-২০২৫

গণঅভ্যুত্থানের ট্রমা: উপেক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য

গণঅভ্যুত্থানের ট্রমা: উপেক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য
×

অলংকরণ :: বোরহান আজাদ

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৫ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত বছরের জুলাই-আগস্টের কোটা সংস্কার ও সরকার হটানোর গণআন্দোলন চলাকালে সরকারি হিসাব ও বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী এক হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন; যার মধ্যে রয়েছেন সব বয়সী শ্রেণিপেশার মানুষ। আহতের সংখ্যা ২২ হাজারেরও বেশি; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই ছাত্রছাত্রী, শিশু-কিশোর। তাদের অনেকেই চিকিৎসা নিয়েছেন, অনেকের চিকিৎসা এখনও চলছে। ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি, সারাদেশে কমপক্ষে ৬৭ জন শিশু-কিশোর নিহত হয়েছে। ১০ জন ছাড়া যাদের সবার শরীরে গুলির ক্ষতচিহ্ন ছিল। আন্দোলনের সময় আহত হয়েছেন, জেল খেটেছেন বা কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন ছাত্র-জনতার সংখ্যা অগুনতি। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না, তাদের অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে, যা স্বল্পমেয়াদি থেকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। শারীরিক আঘাত চিকিৎসায় একসময় হয়তো সেরে ওঠে। মানসিকভাবে যে ক্ষতি হয় তা দীর্ঘদিন থেকে যায় এবং এর প্রভাব অনেক সময় শারীরিক আঘাতের চেয়েও গভীর। এ ক্ষেত্রে সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয়।

তীব্র শোক বা মানসিক আঘাত পেলে যে ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে তার মধ্যে অন্যতম ও জটিল একটি রোগ হচ্ছে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, যেটিকে সংক্ষেপে পিটিএসডি বলা হয়। এ মানসিক রোগের প্রধান কিছু লক্ষণ হচ্ছে, যে ঘটনা বা অভিজ্ঞতা ব্যক্তির মনে আঘাত সৃষ্টি করেছে তা বারবার ফিরে আসে। ঘটে যাওয়া ট্রমাটিক ঘটনা কখনও বাস্তব স্মৃতি হয়ে, কখনও কল্পনা বা দুঃস্বপ্নের মধ্যে চলে আসে। ব্যক্তি বারবার সেই স্মৃতিতে আতঙ্কিত বোধ করেন, মনে করেন তাঁর জীবনে আবারও সেই ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। মানসিক ট্রমাআক্রান্ত ব্যক্তির পিটিএসডি না দেখা দিলেও উপরোল্লিখিত কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এটি নির্ভর করে ব্যক্তি কী ধরনের ট্রমা অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, কতখানি সময় সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেছেন এবং তার আগের মানসিক অবস্থার ওপর। তবে উপরোল্লিখিত লক্ষণগুলোর কিছু যদি দেখা যায়, তবে অবশ্যই ব্যক্তির জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন হবে। মনে রাখতে হবে, ট্রমা অভিজ্ঞতা সব বয়সের মানুষের, এমনকি সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষকেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে অসংখ্য মানুষ ভয়াবহ ট্রমা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তীব্র মানসিক আঘাত পেয়েছেন। অথচ বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যের বর্তমান অবস্থা মোটেও আশাবাদী নয়। লঘু থেকে গুরুতর মাত্রার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে ১৮.৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের; যার মধ্যে ২০ শতাংশ নারী এবং ১৬ শতাংশ পুরুষ। ১৮ বছরের নিচের জনগোষ্ঠী ১২.৩ শতাংশ। মানসিক সমস্যা আছে এমন মানুষের ৯০ শতাংশ চিকিৎসার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের কাছে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন না। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী অনুমান করা যায়, দেশে বর্তমানে তিন কোটিরও বেশি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। এই হিসাব অনুযায়ী প্রতি এক লাখ মানুষ, যাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, তাদের জন্য একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী (মনোচিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও অন্যান্য প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী) দেশে আছেন। এ পেশাজীবীদের ৮০ শতাংশেরও বেশি শুধু ঢাকাতেই কাজ করছেন। বিভাগীয় শহর, মফস্বল আর গ্রামে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অভাব প্রকট। মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য হচ্ছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন এমন জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশের বেশি (প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু) সেবা নেওয়ার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের কাছে যাচ্ছেন না। অনেকেই এর কারণ হিসেবে বলবেন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অজ্ঞতা, ভ্রান্ত ধারণা আর কুসংস্কারের কথা।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হলেও মানুষ জানতে পারেন না কোথায় গেলে তারা সেবা পাবেন। সবার পক্ষে ঢাকায় এসে বা বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। যে কারণে অনেকেই বাধ্য হন ঝাড়ফুঁকসহ অন্যান্য অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গুরুতর অবহেলা ও উপেক্ষা। দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতে পুরো বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। বিষয়টি অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। এসডিজি-৩ লক্ষ্য নির্ধারণ আছে ২০৩০-এর মধ্যে সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা। এ সেবা সহজলভ্য করে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এত অপর্যাপ্ত বাজেট নিয়ে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আকাশকুসুম কল্পনা করার মতোই। 

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি আমাদের দেখিয়ে দেয়, তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শুধু শারীরিক ক্ষত নয়, মানসিক আঘাতের ক্ষতও গভীরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের উচিত এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে আরও কার্যকর ও মানসম্পন্ন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, যাতে তরুণরা আবারও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসতে পারেন এবং তাদের মানসিক সুস্থতা রক্ষা পায়।

আরও পড়ুন

×