ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আমাজনের বোতো

আমাজনের বোতো
×

আমাজনের বোতোর সঙ্গে লেখক ও পর্যটকদের একাংশ

মহুয়া রউফ

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত বছরের কথা। আমাদের স্পিডবোট চলছে আমাজন নদীতে। বোটের পেছনে তৈরি হয়েছে ফেনিল জলরাশির সরু পথ। সে পথে পানি লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে সে ফেলে আসা পানিপথ দেখার চেষ্টা করছি। পেছনে বসা ভদ্রলোক বললেন, ‘চাইলে তুমি আমার আসনে এসে বসতে পার।’ আমি সংকোচে তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলাম। 

আমাদের গাইড বললেন, “আমরা এখন নদীর মাঝখানেই থামব। এখানেই নেমে পড়ব পানিতে। আমাদের সঙ্গে দেখা হবে ‘বোতো’র। আমি ওই ভিনদেশির দিকে আবার তাকাতেই জানান, ‘বোতো’ হলো এ আমাজন নদীর গোলাপি ডলফিন। এতক্ষণে বুঝলাম। নদীর ঠিক মাঝখানে একটি কাঠের পাটাতনে নৌকা ভিড়ল। পানির নিচের কাঠের খুঁটি এ পাটাতনকে ধরে রেখেছে। চারদিকে পানি আর পানি। দূরে নদীর তীর উঁকি দিচ্ছে। 

বোট থেকে নেমে দাঁড়ালাম কাঠের আয়তকার পাটাতনে। গাইডের নির্দেশ মতো আমরা লাইফ জ্যাকেট পরে নিলাম। আমি বিদেশি ভদ্রলোকের হাতে আমার ক্যামেরা গছিয়ে দেব ভাবছি। কাছে গিয়ে বললাম, ‘নামবে পানিতে?’ সে জানাল–তাঁর কাছে অতিরিক্ত পোশাক নেই। তাই সে নামবে না। ফের বললাম, ‘তোমার নামটাই জানা হলো না।’ সে জানাল–তাঁর নাম হান্স। হান্সের কাছে ক্যামেরা গছিয়ে দিলাম। 

আমাজন নদীর এ অংশে গোলাপি ডলফিনের বিচরণ। আমরা সাত-আটজন নেমে পড়লাম পানিতে। নদীর পানি ধূসর, ওপরে আকাশে মেঘ খানিকটা ঢেকে ফেলেছে সূর্যকে। আমরা আগ্রহে ভাসছি আমাজনে বোতোর আশায়। বোতো এমনি ধরা দেয় না। তার সঙ্গে ছলাকলা করতে হয়। গাইডের এক হাতে একটি মাছ। মাছ সে ঝুলিয়ে ধরেছে পানির ওপর, অন্য হাত দিয়ে পানির ওপর মৃদু আঘাত করছে। বোতো পানির নিচ থেকেই সে মাছ দেখতে পেয়ে ছুটে আসবে সেটি খেতে। আমরা নিঃশ্বাস চেপে পানিতে ভেসে আছি সে আশায়। 

হঠাৎ নদীর ধূসর পানি চিরে উঠে এলো একঝলক গোলাপি রং। আরে রং তো নয় আস্ত লকলকে গোলাপি ডলফিন! এতক্ষণের চেপে রাখা নিঃশ্বাস ছাড়লাম। গোলাপি ডলফিন বোতোকে একটু ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য সবাই আকুল। সে ছোঁ মেরে মাছটা ঠোঁটে চেপে ধরে মিলিয়ে গেল পানিতে। 

চারপাশে পর্যটকের হইচই, হট্টগোল, উচ্ছ্বাস, ক্যামেরার শাটারের শব্দ–ক্লিক ক্লিক। আবার অপেক্ষা। গাইড আরেকটি মাছ নিল হাতে। সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে এলো বোতো। বোতো যতই ওপরের দিকে লাফিয়ে উঠছে, গাইড মাছ সরিয়ে নিচ্ছে। চলল বাক্যবিহীন দ্বিপক্ষীয় সূক্ষ্ম লোকচুরি। আমরা তাকে ছুঁয়ে দিই। সে চলে যায়, হয়তো সে নয়তো আরেক বোতো আসে। বোতো আসলে খেলে পর্যটকদের সঙ্গে– বাচ্চাদের মতোই। জাদুকরী গোলাপি ডলফিনের নাটকীয়তায় পর্যটকরা মুগ্ধ। বোতো কখনও মানুষকে আক্রমণ করে না। মানুষ সাঁতার কাটলে সেও মানুষের সঙ্গে সাঁতার কাটে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিষয়টা এমন নয় যে সে সাঁতার কাটছে; বরং সে মানুষকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। 
ভেজা কাপড় পাল্টে এসে হান্সকে ধন্যবাদ জানাই। 

হান্স জানাল, আমাজনের গোলাপি ডলফিনকে ঘিরে ব্রাজিলের লোকজ সংস্কৃতিতে অসাধারণ মিথ আছে। সে বলল, ‘বোতো রাতে সুন্দর, সুঠাম এক যুবকের রূপ নেয়। সে সাদা পোশাক পরে, মাথায় থাকে টুপি। সে নাকি নারীদের মোহিত করে, প্রেমে ফেলে আর ভোর হওয়ার আগেই আবার নদীতে ফিরে যায়।’ গাইড আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘আমাজনে একটি বিশ্বাস চালু ছিল। যদি অবিবাহিত কোনো নারী গর্ভবতী হয়ে পড়ত– তবে বলা হতো এর জন্য বোতো দায়ী। বোতো প্রতারণা করেছে সে নারীর সঙ্গে।’ 

মনে মনে ভাবলাম, আসলে একটি বাহানা। পুরুষের দায় লুকানোর কৌশল। তবে এ কারণে নারীও নিশ্চয়ই রক্ষা পেত! নারী-পুরুষের যৌনতা ও সমাজের নৈতিকতার মধ্যে আজও টানাপোড়েন চলে বিভিন্ন সমাজে। 

লেখক: ভূ-পর্যটক ও লেখক

আরও পড়ুন

×