ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রকৌশলী থেকে কৃষক

প্রকৌশলী থেকে কৃষক
×

শাহীন রেজা অপূর্ব

 লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৮:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

পরনে সাধারণ পোশাক, চোখেমুখে দৃঢ় সংকল্প। কখনও তিনি দড়িতে ঝুলে উঁচু গাছের মগডাল থেকে মৌচাক ভাঙছেন, আবার কখনও বাড়ির উঠানে বসে বিশাল কড়াইয়ে দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি করছেন খাঁটি ঘি। দৃশ্যটি দেখে যে কেউ ভাববেন, তিনি হয়তো পুরোদস্তুর কোনো গ্রামীণ গৃহস্থ বা পেশাদার মৌয়াল। তবে গল্পের পেছনের গল্পটা একটু অন্যরকম। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এই মানুষটির নাম শাহীন রেজা অপূর্ব। ঢাকা শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস আর মোটা অঙ্কের মাইনের ‘ভালো চাকরি’র বাইরে তিনি জীবনের সমীকরণ মিলিয়েছেন। কারণ নিরাপদ খাবারের হাহাকার তাঁকে স্বস্তি দিত না। তাই চাকচিক্য কর্মজীবন ছেড়ে তিনি ফিরে এসেছেন শিকড়ে। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার তেঘরী গ্রামে গড়ে তুলেছেন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। নাম দিয়েছেন একমাত্র সন্তান অবাকের নামে ‘অবাক ফুড’। সেখানে তিনি নিজেই উদ্যোক্তা, নিজেই শ্রমিক, আবার নিজেই ফেরিওয়ালা।

ঢাকায় কর্মজীবন শুরু করলেও অপূর্বর মন পড়ে থাকত সিরাজগঞ্জের তেঘরীতে; যেখানে ছোটবেলায় যে স্বাদ আর নিরাপদ খাবার তিনি খেয়েছেন, শহরের যান্ত্রিকতায় তা ছিল অনুপস্থিত। তিনি লক্ষ্য করলেন, মানুষ যা খাচ্ছে, তার বড় অংশজুড়েই রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের বিষ। নিজের অনুপ্রেরণার কথা জানাতে গিয়ে অপূর্ব বলেন, ‘চারপাশে দেখেছি– মানুষ খাবার খাচ্ছে। খাবার তৈরির প্রক্রিয়াটা পুরোটাই অনিরাপদ। তখনই মনে হয়েছে, আমি যদি নিজেই খাঁটি এবং নিরাপদ খাবার তৈরি করতে পারি, তাহলে অন্তত কিছু মানুষের জন্য হলেও নিরাপদ খাবারের ব্যবস্থা করা যাবে। সেই তাড়না থেকেই গ্রামে ফিরে আসা।’

এই কঠিন পথচলায় পাশে পেয়েছেন মা এবং স্ত্রীকে। তাদের সহযোগিতায় ঘি, মধুর পাশাপাশি অবাক ফুডে এখন পাওয়া যাচ্ছে দেশি হাঁস-মুরগি এবং খুব শিগগিরই যুক্ত হচ্ছে রাসায়নিকমুক্ত কৃষিপণ্য।

‘অবাক ফুড’-এর শুরুটা কোনো সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অংশ ছিল না। এটা ছিল নিতান্তই ব্যক্তিগত প্রয়োজনে। নিজের এবং পরিবারের জন্য খাঁটি মধু সংগ্রহ ও ঘি বানাতেন অপূর্ব। খাঁটি জিনিসের কদর কি আর লুকিয়ে রাখা যায়? পরিচিতজনরা যখন সেই মধু আর ঘিয়ের স্বাদ পেলেন, তখন চাহিদার পারদ চড়তে শুরু করল। অপূর্ব বলেন, ‘মানুষের আগ্রহ দেখে বুঝলাম, সমাজে বিশুদ্ধ খাবারের ব্যাপক হাহাকার রয়েছে। তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নিলাম, এই খাঁটি পণ্য শুধু নিজের জন্য নয়, মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেব। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে অবাক ফুডের যাত্রা শুরু।’

ঘাম আর শ্রমে কেনা বিশ্বাস আজকের যুগে উদ্যোক্তারা সাধারণত পণ্য ‘সোর্সিং’ বা অন্যের কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিজের ব্র্যান্ডে বিক্রি করেন। অপূর্ব হাঁটলেন উল্টো পথে। ব্যবসার চেয়ে তিনি প্রাধান্য দিলেন বিশ্বাসযোগ্যতাকে। ঝুঁকি নিয়ে গাছে চড়ে মৌচাক ভাঙা, কিংবা আগুনের তাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ঘি তৈরি করা–সবটাই তিনি করেন নিজ হাতে। অপূর্ব বলেন, ‘‘আজকের দিনে মানুষ শুধু পণ্য কিনতে চায় না, তারা পণ্যের সঙ্গে বিশ্বাসও কেনেন। আমি যখন নিজে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করি বা ঘি বানাই, তখন গ্রাহক বুঝতে পারেন, আমি শুধু লাভের জন্য ব্যবসা করছি না। অনেক গ্রাহক বলেন, ‘আপনার উৎপাদন প্রক্রিয়া দেখেই খাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।’ এই শ্রমটাই আমার ব্যবসার মূল পুঁজি।’’

নিরাপদ খাদ্যের লড়াইয়ে নেমে অপূর্বকে লড়তে হচ্ছে প্রচলিত কৃষিব্যবস্থার বিরুদ্ধেও। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াও যে ফসল ফলানো সম্ভব, তা মানতেই নারাজ স্থানীয় কৃষকরা। তারা বলছিলেন, ‘এভাবে ফসল হবে না।’ অপূর্ব রাসায়নিক সারবিহীন পালংশাক ও লালশাক চাষ করে দেখিয়েছেন, প্রাকৃতিক পদ্ধতিতেও বাম্পার ফলন সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘রাসায়নিক আর প্রাকৃতিক চাষাবাদের মধ্যে গুণগত মানের আকাশ-পাতাল তফাত। স্বাদে, ঘ্রাণে এবং সংরক্ষণ ক্ষমতায় প্রাকৃতিক পণ্য অনেক এগিয়ে। সবচেয়ে বড় কথা, এই খাবার শরীরকে সুস্থ রাখে।’

অপূর্বর মতে, ‘আমরা কখনোই দাবি করি না আমাদের পণ্যই সেরা। আমরা শুধু বলি, আমাদের পণ্য খাঁটি। যে পণ্য আমি নিজে খেতে পারব না, তা আমি কাউকে দেব না।’
অবাক ফুডের প্রায় ৭০ শতাংশই ‘রিপিট কাস্টমার’। গ্রাহকদের রিভিউ থেকেই তৈরি হচ্ছে নতুন গ্রাহক।

প্রতিষ্ঠানেরর আর্থিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টিকে অপূর্ব বলেন ‘সুস্থ লাভ’। তিনি বলেন, ‘আমার লক্ষ্য আকাশছোঁয়া মুনাফা নয়, বরং ধারাবাহিকতা। প্রচলিত চাকরির বাইরে নিজেকে দাঁড় করিয়ে কাজটা উপভোগ করছি। খরচ উঠে আসছে, নিয়মিত আয় হচ্ছে–এটাকেই আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখি।’

অপূর্ব এই উদ্যোগকে বিশাল কোনো করপোরেট ব্র্যান্ড বানাতে চান না। তিনি চান, ‘অবাক ফুড’ হয়ে উঠুক মানুষের চোখ বন্ধ করে ভরসা করার মতো একটি নাম। ভবিষ্যতে গুড়, নাড়ু, সরিষার তেল এবং নিজস্ব খামারের দুধ ও মাংস ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তাঁর স্বপ্নের পরিধি আরও বিস্তৃত। তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন একটা আউটলেট থাকবে, যেখান থেকে বিত্তবানরা ন্যায্যমূল্যে পণ্য কিনবেন। সেই আয়ের একটি অংশ দিয়ে সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে নিরাপদ খাবার সরবরাহ করা হবে।’

আরও পড়ুন

×