রমজানে বিশ্বজুড়ে বিচিত্র আয়োজন
আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকে রমজান মাসে শিশুরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গায় এবং বড়দের কাছ থেকে মিষ্টি ও উপহার সংগ্রহ করে
রফিকুর রহমান প্রিয়াম
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ধর্মতাত্ত্বিকভাবে রমজান মাস কোরআন নাজিল এবং সিয়াম সাধনার মাস। বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটির অধিক মুসলমানের জন্য আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং সামাজিক ঐক্যের এক পবিত্র সময়। কিন্তু নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে রমজান কেবল উপবাস নয়; এটি এমন এক বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক উৎসব, যেখানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে মিশেছে স্থানীয় ঐতিহ্য, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং ভোজনরসিকতা।
মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কা থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা–বিশ্বের সব প্রান্তের ইফতারির টেবিলে একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়–খেজুর ও পানি। তবে এর পেছনে রয়েছে গভীর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীরে গ্লুকোজ বা শর্করা কমে যায় এবং শরীর তার সঞ্চিত চর্বি খরচ করতে শুরু করে। এ অবস্থায় হঠাৎ ভারী খাবার খেলে রক্তে সুগারের মাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যেতে পারে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, খেজুর একটি ‘বায়োলজিক্যাল ইকুয়ালাইজার’ বা শারীরিক ভারসাম্য রক্ষাকারী। এটি দ্রুত শক্তি জোগায়, রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা ঠিক রাখে এবং ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়ামের ঘাটতি পূরণ করে শরীরকে পরবর্তী খাবারের জন্য প্রস্তুত করে।
অন্যদিকে সাহ্রির খাবারে গুরুত্ব দেওয়া হয় এমন খাদ্যের ওপর, যা দীর্ঘক্ষণ পেটে থাকে। যেমন জিবুতিতে সাহ্রিতে টকদই, বার্লি ও কর্ন নাটসের মিশ্রণ খাওয়া হয়; যা দেরিতে হজম হয়। আবার ইরানে পনির ও বাদাম এবং ইন্দোনেশিয়ায় নারকেলের দুধে রান্না করা ভাতের ডিশ ‘নাসি লেওয়েট’ সাহ্রির জনপ্রিয় খাবার। বিশ্বজুড়ে রমজানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও উৎসবমুখর প্রথা পালন করা হয়।
ইন্দোনেশিয়া
রমজান শুরুর এক সপ্তাহ আগে ইন্দোনেশিয়ায় মানুষ পূর্বজদের কবর জিয়ারত করে এবং কবরে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এর সঙ্গে রয়েছে ‘পাদুসান’ বা পবিত্র স্নান উৎসব, যেখানে মানুষ নদী বা ঝর্ণায় গোসল করে নিজেকে পাপমুক্ত করার নিয়ত করে।
মিসর
মিসরে রমজানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘ফানুস’ বা রঙিন লণ্ঠন। ফাতেমি খিলাফতের সময় খলিফাকে স্বাগত জানাতে কায়রোর মানুষ মোমবাতি জ্বালিয়েছিল এবং বাতাস থেকে বাঁচাতে সেগুলোকে চামড়া বা কাঠের ফ্রেমে মুড়িয়েছিল, সেখান থেকেই এই ফানুসের জন্ম।
উপসাগরীয় অঞ্চল
সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকে রমজান মাসে শিশুরা পালন করে ‘হক আল লায়লা’ বা ‘গারগিয়ান’ উৎসব। অনেকটা পশ্চিমা হ্যালোইনের মতো, শিশুরা রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গায় এবং বড়দের কাছ থেকে মিষ্টি ও উপহার সংগ্রহ করে।
মেরু অঞ্চল
ভৌগোলিক কারণে সূর্য না ডোবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোয় এক অদ্ভুত সংকট তৈরি হয়। নরওয়ে, আইসল্যান্ড বা আলাস্কার মতো জায়গায় দিনের দৈর্ঘ্য ২১ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে, যাকে বলা হয় ‘মিডনাইট সান’। সমস্যা সমাধানে ইসলামিক তাত্ত্বিকরা তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করার বিধান দিয়েছেন–নিকটবর্তী কোনো স্বাভাবিক শহরের সময় অনুসরণ করা, মক্কার সময় অনুসরণ করা অথবা শীতকাল পর্যন্ত রোজা পিছিয়ে দেওয়া।
বিশ্বজুড়ে রমজানের বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস সংস্কৃতির পাশাপাশি ইফতার ও সাহ্রির আয়োজনেও রয়েছে বিশ্বজুড়ে দারুণ বৈচিত্র্য। একেক অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস তাদের নিজস্ব ইতিহাস ও পুষ্টি চাহিদার কথা তুলে ধরে। বাংলাদেশের ভোজনরসিকরা ইফতারে ‘ভাজা-পোড়া’ খাবারকেই প্রাধান্য দেন। বেগুনি, পেঁয়াজু, আলুর চপ এবং জিলাপি ছাড়া যেন ইফতারি অপূর্ণ থেকে যায়। তবে পুরান ঢাকার চকবাজারের বিখ্যাত এবং বিশালাকার আয়োজন ‘বড় বাপের পোলায় খায়’, যা গরুর মগজ, মাংস, ডাল, চিড়া ও ১২ পদের মসলা এবং ঘিয়ের এক অনন্য সংমিশ্রণ ভোজনরসিকদের কাছে এক পরম আরাধ্য খাবার।
রমজানে ঢাকা শহর, বিশেষ করে পুরান ঢাকা, তার স্বাভাবিক ঘুমের রুটিন বদলে ফেলে। দিনের বেলা যেখানে শান্ত ভাব বিরাজ করে, ইফতারের পর থেকে সাহ্রি পর্যন্ত শহরটি যেন জেগে ওঠে। মাসটি ‘নৈশকালীন কার্নিভালে’ রূপান্তরিত হয়। রমজান মূলত ইসলামী চেতনার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে কীভাবে স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিশে গেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
দেশ বা সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও রমজান বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের এক সুতোয় গেঁথে রাখে। খাদ্যাভ্যাস ও প্রথাগত বৈচিত্র্যের মধ্যেই আছে রমজানের আসল সৌন্দর্য-সহমর্মিতা, আত্মত্যাগ এবং ভ্রাতৃত্ববোধ।
- বিষয় :
- রমজান
