ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আফ্রিকার ‘রুদ্রপলাশ’ ঢাকায় যেভাবে এলো

আফ্রিকার ‘রুদ্রপলাশ’ ঢাকায় যেভাবে এলো
×

ড. রেজা খান

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিমুল ফুলের আকারের লালচে-কমলা ফুলে ছেয়ে গেছে রুদ্রপলাশ গাছ। ঢাকার কয়েকটি জায়গায় দারুণ সুন্দর দেখতে এই ভিনদেশি  ফুল আকাশকে রাঙিয়ে তুলেছে। শোভাবর্ধনের বাইরে আমার কাছে ওদের কদর বেশ ভিন্ন। প্রথমত, ওর বাংলা রুদ্রপলাশ নামটি দিয়েছেন আমার গুরু উদ্ভিদবিদ ও প্রাবন্ধিক প্রয়াত অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা স্যার। দ্বিতীয় হলো, এর ফুলে শহরের অনেক মধুপায়ী পাখি ও বাকি প্রাণীরা ভিড় করে। সে সময় বারোয়ারি পাখির কলকাকলি মনকে ভরিয়ে দেয়।

ঢাকার রাস্তাঘাট, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ কিংবা পুরোনো উদ্যানগুলোতে বসন্তের শেষভাগে বা গ্রীষ্মের শুরুতে হঠাৎ চোখে পড়ে এক উজ্জ্বল অগ্নিমেঘের মতো ফুলে ভরা গাছ। দূর থেকেই লালচে-কমলা ঘণ্টার মতো ফুলগুলো নজর কাড়ে। গাছটির নাম রুদ্রপলাশ। অনেকেই একে ‘আফ্রিকান টিউলিপ ট্রি’ বা ‘ফাউন্টেইন ট্রি’ নামেও চেনেন। মধ্য এশিয়া থেকে নিয়ে গিয়ে ইউরোপে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসে ব্যাপক চাষ করা টিউলিপের মতো দেখতে ফুল হওয়ার কারণে এর নাম আফ্রিকান টিউলিপ। ফাউন্টেইন ট্রি নামটির পেছনেও একটি ছোট্ট গল্প আছে। ফুল যখন কেবল কুঁড়ি আকারে থাকে, তখন বৃষ্টি বা কুয়াশা থেকে পানি ধরে তা জমিয়ে রাখে কুঁড়ির ভেতর। যখন পাপড়ি খুলতে শুরু করে তখন সে পানি ফুলের ওপর ছড়িয়ে পড়ে।

রুদ্রপলাশ গাছটি প্রায় ছাতার আকারে, ১৫-২০ মিটার উচ্চতার। চাঁদোয়ার নিচে মূল কাণ্ড দুই-তৃতীয়াংশ লম্বা, গোলাকার থামের মতো। যৌগিক সবুজ পাতা ৬-৮ জোড়া থাকে একটি শিরার দু’পাশে। গুচ্ছফুলের থোক হয় সরু ডালের ডগায়। লালচে ফুলে পাঁচটি পাপড়ি মিলে একটি বেল বা ঘণ্টার মতো আকার নেয়। যেহেতু এক থোকে ডজনের মতো ফুল একসঙ্গে ফোটে, তাই রুদ্রপলাশ দারুণ শোভাবর্ধনকারী। গাছটিতে আড়াই-তিন মাস ফুল সলজ্জিত থাকে। বাংলাদেশে এটি এখন বেশ পরিচিত একটি শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ হলেও প্রকৃতপক্ষে এ গাছ আমাদের দেশের বা দক্ষিণ এশিয়ার স্বাভাবিক উদ্ভিদ নয়। এর জন্মভূমি আফ্রিকার উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চল, বিশেষ করে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল।

আফ্রিকা থেকে বিশ্বের পথে
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় একে ইউরোপীয় উদ্ভিদ ও উদ্যানতত্ত্ববিদরা আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু উদ্ভিদ সংগ্রহ করে ইউরোপের বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে আসতে শুরু করেন। রুদ্রপলাশও সেই সময়েরই একটি ‘ভ্রমণকারী’ গাছ। ১৮৫০-এর দশকে এটি ইউরোপের উদ্ভিদ উদ্যানগুলোতে আনা হয় এবং তার পর থেকেই ধীরে ধীরে পৃথিবীর নানা উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। দৃষ্টিনন্দন লালচে বড় ফুলাচ্ছাদিত চাঁদোয়া গাছটির সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ভিনদেশিরা এটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। সেটিই এর বিস্তারের প্রধান কারণ। দ্রুত বেড়ে ওঠা, ছায়া দেওয়া এবং আকর্ষণীয় উজ্জ্বল ফুলের জন্য এটি খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক প্রশাসন, মিশনারি প্রতিষ্ঠান ও বোটানিক্যাল গার্ডেনগুলো এ গাছকে বিভিন্ন উপনিবেশে নিয়ে যায় এবং পার্ক, রাস্তার ধারে ও সরকারি ভবনের চত্বরে লাগাতে শুরু করে।

ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন
রুদ্রপলাশ সম্ভবত উনিশ শতকের শেষভাগ বা বিশ শতকের শুরুতে ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। সেই সময় ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন শহরে নতুন নতুন উদ্যান ও প্রশাসনিক ভবনের চারপাশে বিদেশি শোভাবর্ধনকারী গাছ লাগানোর প্রবণতা ছিল। কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ বিভিন্ন উদ্যানতাত্ত্বিক কেন্দ্র থেকে এ গাছ ধীরে ধীরে অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকাও সেই সময় ব্রিটিশ প্রশাসনিক ও শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছিল। শহরের পার্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ভবনের আশপাশে নানা বিদেশি গাছ লাগানো হচ্ছিল। ধারণা করা হয়, সেই সময়েই রুদ্রপলাশ ঢাকায় প্রথম রোপণ করা হয়। যদিও সুনির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক নথিতে ঢাকায় এই গাছের প্রথম রোপণের নির্দিষ্ট সাল পাওয়া যায় না, তবে উদ্যানতাত্ত্বিক ইতিহাস বিচার করলে বলা যায় যে বিশ শতকের প্রথম দিকেই এটি ঢাকার সবুজ পরিসরে জায়গা করে নেয়।

আজও ঢাকার কিছু রাস্তার পাশে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বরে এ গাছ দেখা যায়। মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পুবদিকে বেশ কয়েকটি রুদ্রপলাশ গাছ আছে। বসন্তের শেষভাগে যখন এর ফুল ফোটে, তখন গাছটি যেন আগুনের শিখার মতো লালচে-কমলা ফুলে ভরে ওঠে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন গাছটি আগুনে জ্বলছে। 

সৌন্দর্য ও বিতর্ক
রুদ্রপলাশ নিঃসন্দেহে একটি দৃষ্টিনন্দন বৃক্ষ। তবে পরিবেশবিদদের মধ্যে এ নিয়ে কিছু আলোচনা রয়েছে। কারণ বিশ্বের কিছু দেশে এই গাছকে আক্রমণাত্মক বা দ্রুত বিস্তারকারী বিদেশি প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি দ্রুত বাড়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় উদ্ভিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারে। 

বাংলাদেশে এখনও এটিকে বড় ধরনের পরিবেশগত হুমকি হিসেবে দেখা হয় না, কারণ এটি প্রধানত শহরের বাগান ও রাস্তার ধারে লাগানো শোভাবর্ধনকারী গাছ হিসেবেই সীমিত রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে নগর বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রজাতির প্রতি অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, এমন মত অনেক উদ্ভিদবিদের।

ঢাকার নগর বৃক্ষের ইতিহাসে রুদ্রপলাশ একটি বিশেষ অধ্যায় যোগ করেছে। আফ্রিকার বন থেকে শুরু করে ইউরোপের উদ্যান, তারপর উপমহাদেশের শহর–এই দীর্ঘ ভ্রমণের পর গাছটি আজ ঢাকার নাগরিক জীবনেরও অংশ হয়ে গেছে। বসন্তের শেষে যখন এর অগ্নিময় ফুলগুলো শহরের ধুলোমাখা আকাশের নিচে ফুটে ওঠে, তখন মনে হয় সুদূর আফ্রিকার কোনো রঙিন স্মৃতি যেন ঢাকার রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতির এই রঙিন অতিথি আমাদের মনে করিয়ে দেয়–পৃথিবীর উদ্ভিদ জগতের ইতিহাস আসলে মানুষের ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। মানুষের কারণে এরা দেশ থেকে দেশান্তরে চলে গেছে, হয়েছে এদের বিশ্ববিস্তার। যদিও এর সুফল এবং কিছুটা হলেও কুফলও রয়েছে। তবে যখন কোনো প্রজাতি কেবল সীমিত আকারে কেবল সীমার মধ্যে রেখে শোভাবর্ধনের কাজে ব্যবহৃত হয়, তখন তার সুফলটাই বেশি নজরে আসে। 

লেখক: বন্যপ্রাণী, চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক বিশেষজ্ঞ
 

আরও পড়ুন

×