ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ধরিত্রীর বুকে বাঁচুক সকল প্রাণ

ধরিত্রীর বুকে বাঁচুক সকল প্রাণ
×

আশিকুর রহমান সমী

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৯ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের এক প্রত্যন্ত এলাকা। সেখানে ছিল স্বচ্ছ জলের এক বিস্তীর্ণ বিল। জলজ লতাপাতা আর শাপলা-পদ্মে ঘেরা সেই জলাভূমি ছিল হাজারো প্রাণের এক আনন্দময় আশ্রয়। দিনভর জলচর পাখির কলকাকলি, ফড়িংয়ের ওড়াউড়ি, মাছ, ব্যাঙ, সাপ, গুইসাপ আর মেছোবিড়ালের অবাধ বিচরণে মুখর থাকত চারপাশ। কিন্তু হঠাৎ একদিন উন্নয়নের নামে সেই জলাভূমির বুকে নেমে এলো ধ্বংসযজ্ঞ। বালু আর মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলা হলো পুরো বিল। গড়ে উঠল মস্ত এক বিলাসবহুল রিসোর্ট। ইট-পাথরের কঙ্কালে ঢাকা পড়ল প্রকৃতির সবুজ গালিচা। মানুষের চিত্তবিনোদনের জন্য তৈরি হলো সুইমিং পুল, কৃত্রিম ঝরনা। আর বাস্তুচ্যুত পাখিরা দূর থেকে অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তাদের হারানো ঠিকানার দিকে। বিপন্ন মেছোবিড়াল যদি ভুল করে লোকালয়ে চলে আসে, তাকে পিটিয়ে মারা হয় বীভৎসভাবে। এই একটি খণ্ডচিত্র কেবল নারায়ণগঞ্জের নয়, বরং পুরো পৃথিবীর বর্তমান অবস্থার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। 

২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল, পুরো বিশ্ব যখন একসঙ্গে ‘বিশ্ব ধরিত্রী দিবস’ পালন করতে যাচ্ছে, তখন এবারের ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য–‘আমাদের শক্তি, আমাদের গ্রহ’–আমাদের এক নতুন উপলব্ধির সামনে দাঁড় করায়। এই শক্তি শুধু মানুষের প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক শক্তি নয়; বরং এই শক্তি হলো সম্মিলিতভাবে পৃথিবীকে সারিয়ে তোলার শক্তি। 

পৃথিবী একটি অখণ্ড ও নিবিড়ভাবে যুক্ত সত্তা। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইকোসিস্টেম’ বা বাস্তুসংস্থান। জাতিসংঘের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের অবিমৃষ্যকারিতার কারণে পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। যখন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে একটি উপকারী পতঙ্গ বিলুপ্ত হয়, তখন সেই পতঙ্গের ওপর নির্ভরশীল পাখিটি খাদ্যাভাবে মারা যায় বা দেশান্তরী হয়। আর পাখিটির অভাবে ফসলের ক্ষতিকর পোকা বেড়ে গিয়ে মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাকেই ভয়াবহ হুমকির মুখে ফেলে দেয়। অর্থাৎ প্রকৃতির ওপর আঘাত হানার অর্থ হলো পরোক্ষভাবে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালটি পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত বাঁক বদলের একটি বছর। একদিকে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের চরম রূপ দেখছি–অসময়ে প্রলয়ংকরী বন্যা, অতিবৃষ্টি এবং প্রাণঘাতী তীব্র তাপদাহ। অন্যদিকে বন উজাড়, জলাভূমি দখল, নির্বিচারে বিদেশি বৃক্ষরোপণ এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি সহিংসতা আমাদের প্রকৃতিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। বুনো জীবজগৎ আজ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী, অথচ এই সংকট সৃষ্টিতে তাদের কোনো ভূমিকাই নেই! 

আশার কথাও আছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার পরিবেশ, বন, বন্যপ্রাণী, পানি ও জলাভূমি রক্ষায় বেশকিছু আইন যুগোপযোগী করে অধ্যাদেশ জারি করেছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। উন্নয়ন মানে কেবল আকাশচুম্বী দালান বা ধোঁয়া ওঠা কলকারখানা নয়; প্রকৃত উন্নয়ন হলো সেই জীবন ব্যবস্থা, যেখানে বনের পশুপাখি তাদের আবাসস্থল হারাবে না; জীববৈচিত্র্য নিরাপদে থাকবে এবং সমুদ্রের প্রাণীরা প্লাস্টিকের বিষে নীল হবে না।

দীর্ঘদিন ধরে মানুষ নিজেকে পৃথিবীর ‘ঈশ্বর’ বা ‘মালিক’ মনে করে এসেছে। এই আধিপত্যবাদী মানসিকতা থেকেই বনভূমি উজাড় হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব কি অন্য কোনো প্রাণের অধিকার হরণ করার লাইসেন্স দেয়? সুন্দরবনের বাঘের যেমন সেখানে থাকার অধিকার আছে, সেন্টমার্টিনের প্রবালেরও টিকে থাকার অধিকার আছে। ২০২৬ সালের ধরিত্রী দিবস আমাদের মানবকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে জীবনকেন্দ্রিক চিন্তায় প্রবেশ করতে শেখায়।

বিশ্বব্যাপী এখন ‘প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান’ এবং ‘রিওয়াইল্ডিং’ বা প্রকৃতিকে পুনরায় বন্য হতে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত অন্তত ৩০ শতাংশ ভূমি এবং সমুদ্রকে সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে নতুন সংরক্ষিত এলাকা গড়ে তোলা চ্যালেঞ্জিং হলেও জলাভূমি ও বনভূমির আশপাশে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় এটি অপরিহার্য। 

বিশ্বের অনেক দেশ এখন ‘রাইটস অব নেচার’ বা প্রকৃতির অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের ওয়াঙ্গানুই নদী বা ভারতের গঙ্গা নদীকে যেমন আইনি ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আমাদেরও উচিত নদী, বন ও জলাভূমিকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া। নদীদূষণ বা বন ধ্বংসকে কেবল জরিমানা দিয়ে লঘু করার বদলে একে একটি ‘প্রাণের ওপর আঘাত’ হিসেবে গণ্য করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

বৃহৎ পরিবর্তনের জন্য আমাদের ব্যক্তিগত জীবনাচরণেও পরিবর্তন আনা জরুরি। সংযমী খাদ্যাভ্যাস, প্লাস্টিকমুক্ত ‘জিরো ওয়েস্ট’ জীবনধারা গ্রহণ এবং বিদেশি বৃক্ষের বদলে দেশি বৃক্ষ রোপণ করা এখন সময়ের দাবি। সবচেয়ে জরুরি হলো আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে কেবল মানুষের ইতিহাস নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ এবং অন্য প্রাণের অধিকারের পাঠ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শৈশব থেকেই এই চেতনা রোপণ করতে না পারলে কোনো আইন দিয়েই পরিবেশ বাঁচানো সম্ভব নয়।

ধরিত্রী দিবস কেবল ক্যালেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট তারিখ নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের একটি ইশতেহার। ২০২৬ সালের এই দিনে আমাদের শপথ হোক–আমরা এমন এক পৃথিবী নির্মাণ করব, যেখানে মানুষ থাকবে সহমর্মী অভিভাবক হিসেবে, শোষক হিসেবে নয়। আকাশটা যেমন মানুষের, তেমনি তা পাখিরও।

‘ধরিত্রীর বুকে সকল প্রাণের আছে বেঁচে থাকার সমান অধিকার’–এই শাশ্বত সত্যটি যখন রাষ্ট্রনেতা থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকের হৃদয়ে প্রোথিত হবে, কেবল তখনই পৃথিবী তার হারানো রূপ ফিরে পাবে। ধরিত্রী দিবস সফল হবে তখনই, যখন একটি বুনোহাতি তার প্রাকৃতিক পরিবেশে নির্ভয়ে ঘুরবে, একটি ডলফিন স্বচ্ছ নদীতে খেলবে এবং আগামী প্রজন্ম বুকভরে নির্মল বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে। আসুন, আমাদের সম্মিলিত শক্তি দিয়ে আমাদের এই সুন্দর ধরিত্রীকে রক্ষা করি। 

লেখক: প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×