ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মাটির টানে শিকড়ের খোঁজে

মাটির টানে শিকড়ের খোঁজে
×

ইমরান উজ-জামান

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০০ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

গল্পটা বেশ বর্ণিল। মোহাম্মদ আসাদ ভাই আমার বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রটি তৈরি করেছিলেন আস্ত মাটি দিয়ে! বেশ ওজনদার সেই কার্ড রীতিমতো মাথায় বয়ে নিয়ে অতিথিদের দাওয়াত দিতে হয়েছিল। তবে মাটির প্রতি আমার টান আগে থেকেই। সুযোগ পেলেই মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল কিনতাম। একসময় এই নেশার সঙ্গে যুক্ত হলো মেলায় ঘোরার বাতিক।

দেশের যেখানেই মেলার খবর পেতাম, ছুটে যেতাম। রাঙামাটি, শেরপুরের নালিতাবাড়ী কিংবা সুন্দরবনের ঢাংমারী–কোথায় যাইনি! ২০১৬ সালে জয়নুল উৎসবে শিল্পী নিসার হোসেনের কিউরেটিংয়ে ‘মেলা-পার্বণ’ নামে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়। সেখানে ২৫টি মেলার চারটি করে ছবি স্থান পেয়েছিল। আমার আনন্দের বিষয় হলো, ওই প্রতিটি মেলা থেকেই আমি কিছু না কিছু মাটির জিনিস সংগ্রহ করেছিলাম।

কর্মজীবনে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘অগ্রদূত’ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে আমার তো পোয়া বারো! প্রতিটা শুটিং ট্যুরে ভোর থেকে সকাল ১০টায় কাজ শুরুর আগ পর্যন্ত সময়টুকু বরাদ্দ থাকত একান্তই আমার জন্য। আগের দিন রাতে খোঁজখবর নিয়ে রাখতাম আর ভোরেই বেরিয়ে পড়তাম স্থানীয় পালপাড়ার উদ্দেশে। পছন্দসই হাঁড়ি-কুড়ি বা খেলনা কিনে খবরের কাগজে মুড়িয়ে, বাঁশের খাচিতে ভরে মোটা টেপ দিয়ে পেঁচিয়ে বাসের বক্সে তুলে দিতাম। আমার এই সংগ্রহ অভিযানে সংশ্লিষ্ট অনেকেই দারুণ সহযোগিতা করেছেন।

এই দীর্ঘ যাত্রায় অনেক মধুর স্মৃতির পাশাপাশি একটি দুর্ঘটনার কথাও মনে পড়ে। বরিশালে কাজ শেষ করে ভোলায় গেছি। ভোলার সব ইলিশের ঘাট ঘুরেও মন ভরছে না। মনে হচ্ছিল, কী যেন একটা বাদ পড়ে যাচ্ছে! অবশেষে ভোলার নতুন বাজারে গিয়ে হাজির হলাম। বাজারের মাঝখানে একজন বসে মাটির ব্যাংকে রং করছেন। লোকটি হয়তো আমার আগ্রহ বুঝতে পেরেই বসার জন্য একটা বেঞ্চ এগিয়ে দিলেন। তাঁর হাত চলছে আর মুখে চলছে আলাপ–
– কী করেন ভাই? বাড়ি কই? 
– বিটিভিতে কাজ করি, বাড়ি ঢাকায়। 
– এহানে আইছেন কী করতে? 
– শুটিংয়ে আসছি ভাই। 
– বসেন, চা খাওয়াই। কিছু খুঁজতাছেন? এই হাটে তেমন কিছু পাইবেন না। এইটা তো আর ঢাকা না!
হঠাৎ তাঁর বানানো একটি মহিষের দিকে চোখ আটকে গেল। 
– আপনার এই গরুটার দাম কত? 
– এইটা গরু না, মহিষ। এইটা পোড়ানো না, কাঁচা মাটির এই মহিষটা আমার নিজের হাতে বানানো। অন্যগুলো বাউফল থেকে আনা।

মহিষটার পাশে ভিন্ন রঙের আরও দুটি মহিষ চোখে পড়ল। একেবারেই অন্য রকম। সব মিলিয়ে কিনে নিলাম। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে সার্কিট হাউসে ফিরে সংগৃহীত জিনিসগুলোর ছবি তুললাম। এরপর ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিলাম ইলিশা ঘাটের দিকে, সেখানে লঞ্চের বুকিং দেওয়া।

আমি অটোরিকশার ডান পাশে বসেছি, ডান হাঁটুটা একটু বাইরের দিকে। অটো বেশ জোরেই চলছিল। হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য একটি অটো আমার পা ঘেঁষে চলে গেল। সামনের লোহার দণ্ডটা মুহূর্তেই আমার হাঁটু থেঁতলে দিয়ে গেল। একটু পরেই সাদা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ভিজে লাল হয়ে উঠল রক্তে। ঘাটের একটা ফার্মেসি থেকে কোনোমতে ব্যান্ডেজ বেঁধে লঞ্চে উঠি। পায়ের ঘা শুকালেও সেই ব্যথা আজও মাঝেমধ্যে জানান দেয়। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, ওই দুর্ঘটনায় আমার সংগৃহীত মাটির জিনিসগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। পরে অনেক কষ্টে আঠা দিয়ে দুটি মহিষ জোড়া লাগিয়ে অবয়ব ফিরিয়ে এনেছিলাম।

মাটি সংগ্রহের এই পথে বাগেরহাটের গল্পটা আবার বেশ মজার এবং ঐতিহাসিক। খানজাহান আলীর মাজার প্রাঙ্গণে বসা ‘খানজেলি মেলায়’ নিজের হাতে বানানো মাটির পুতুল নিয়ে বসেন সত্তরোর্ধ্ব আনারতি পাল। তাঁর বানানো চার চাকার মাটির ঘোড়াটি প্রথম দেখাতেই যে কারও নজর কাড়বে। ষাটগম্বুজ মসজিদের পেছন দিকে রয়েছে ঘোড়া দিঘি। দিঘির বাঁপাশ ধরে ইট বিছানো পথটি চলে গেছে সুন্দরঘোনা নামের এক নিভৃত গ্রামে। এই গ্রামে চার-পাঁচ ঘর কুমার বা পালের বসবাস থাকলেও, আনারতি পাল একাই মাটির খেলনা তৈরি করেন।

ইতিহাস বলে, ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণের সময় অভ্যন্তরভাগে ব্যবহৃত পাথর আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে আর বাইরের অংশের টেরাকোটাগুলো স্থানীয়ভাবেই তৈরি হয়। এই টেরাকোটা বানানোর জন্য ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জের রাজমহল থেকে কুমারদের আনা হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। মসজিদ নির্মাণ শেষ হলে এই মৃৎশিল্পীরা বেকার হয়ে পড়েন। তখন তাদের কেউ কেউ খেলনা তৈরিতে মন দেন। ঘোড়া দিঘির পাড়ের আনারতি পালের পূর্বপুরুষদের হাতে তৈরি সেই ঘোড়াই আজ ‘খানজাহান আলীর ঘোড়া’ নামে বিখ্যাত।

শিকড়ের সন্ধানে এই দীর্ঘ ১৭ বছরের যাত্রায় কত যে গ্রাম ঘুরেছি, তার ইয়ত্তা নেই! অচেনা কত মানুষের বাড়িতে খেয়েছি, রাত কাটিয়েছি। এখন সারাদেশের প্রতিটি উপজেলা ছাড়িয়ে গ্রাম পর্যায়েও আমার অসংখ্য বন্ধু। অনেক সময় তাদের বিয়েশাদিতেও আনন্দের ভাগিদার হতে ছুটে যাই। এখনও সময়ে-অসময়ে তারা ফোন করে খোঁজ নেন। মাটির টানে শুরু হওয়া এই যাত্রা আমাকে কেবল মাটির বস্তুর সঙ্গেই নয়, যুক্ত করেছে এ দেশের মাটির মানুষদের সঙ্গেও। সত্যি বলতে, জীবন বড্ড সুন্দর! 

লেখক: লোকশিল্প গবেষক, সংগ্রাহক

আরও পড়ুন

×