ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আত্মপরিচয়ের লোকজ দুনিয়ায়

আত্মপরিচয়ের লোকজ দুনিয়ায়
×

শিল্পকলা একাডেমিতে ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া ‘ধারণ’ শীর্ষক প্রদর্শনীর একাংশ

তায়েব মিল্লাত হোসেন

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৩ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘ভ্রাতৃভাব ভাবি মনে, দেখ দেশবাসীগণে,/ প্রেমপূর্ণ নয়ন মেলিয়া।/ কতরূপ স্নেহ করি, দেশের কুকুর ধরি,/ বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।’
উনিশ শতকে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের লেখা এই অমোঘ পঙ্‌ক্তি যেন কেবল একটি কবিতাই নয়, বরং বাংলার আত্মপরিচয় ও শিকড় সন্ধানের এক চিরন্তন ইশতেহার। খাঁটি দেশি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরার মাধ্যমেই যে আত্মমর্যাদা সুরক্ষিত থাকে, কবি সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। কালের আবর্তে আধুনিকতার চাকচিক্যে অনেকেই হয়তো এই বাণী বিস্মৃত হয়েছেন। তবে সমাজের একটি ক্ষুদ্র কিন্তু নিবেদিতপ্রাণ অংশ আজও শিকড়ের টানে নিজেদের সঁপে দেন। তাদেরই নিরলস সাধনা ও কল্যাণে আজ পর্যন্ত টিকে আছে বাংলার আবহমান লোকশিল্প; চর্চিত হচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা বর্ণিল ধারা।

আমাদের দেশে লোকশিল্পের প্রায় সব উপকরণ এবং গ্রামীণ মানুষের জীবনবোধ মূলত মেলা ও পার্বণকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। তাই দেশের যে প্রান্তেই লোকজ মেলা বসুক না কেন, শিকড়ের টানে সেখানেই ছুটে যান ইমরান উজ-জামান। দেশের প্রায় প্রতিটি উল্লেখযোগ্য মেলাই তাঁর নিজ চোখে দেখা। এই নিরন্তর ছুটে চলা থেকেই তিনি রচনা করেছেন ‘বাংলাদেশের মেলা-পার্বণ’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূরর্ণ গ্রন্থ, যা এরই মধ্যে বিদগ্ধ সুধীমহলে বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ইমরান উজ-জামান তাঁর সংগৃহীত এই মৃৎশিল্প কেবল নিজের ঘরের শোভাবর্ধনের জন্যই জমিয়ে রাখেননি। শহুরে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে যেন এই শিল্প আবার ফিরে আসে, সে জন্য তিনি নিরন্তর উদ্যোগ নিয়ে চলেছেন। নিজের সমৃদ্ধ সংগ্রহ নিয়ে তিনি নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প প্রদর্শনীগুলোয়। বছর দুয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন, প্রখ্যাত শিল্পী ও অধ্যাপক নিসার হোসেনের গবেষণা ও নির্দেশনায় ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের লোকশিল্প: চিত্রিত মৃৎশিল্প’ প্রদর্শনীতে অংশ নেন ইমরান। 

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে উপস্থাপিত হয়েছে ইমরানের সংগৃহীত মৃৎশিল্পের এক অনন্য ভান্ডার। চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে একাডেমির ৪ নম্বর গ্যালারিতে ‘ধারণ’ শীর্ষক বাংলাদেশের লোকশিল্প প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে তাঁর এই সংগ্রহ।

মৃৎশিল্পের তাত্ত্বিক দিক বিশ্লেষণ করে ইমরান জানান, ঐতিহাসিকরা মৃৎশিল্পকে মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত করেছেন–চারুকলামূলক এবং কারিগরি মৃৎশিল্প। যেসব মাটির পাত্র বা জিনিসে শৈল্পিক ছোঁয়া ও সূক্ষ্ম কারুকাজ বেশি থাকে এবং যা গৃহস্থালির কাজের চেয়ে শোভাবর্ধনে বেশি ব্যবহৃত হয়, সেগুলো চারুকলামূলক মৃৎশিল্প। অন্যদিকে, যেগুলোয় নকশার আধিক্য থাকে না এবং প্রাত্যহিক গৃহস্থালি কাজেই যার মূল ব্যবহার, সেগুলো কারিগরি মৃৎশিল্প। শিল্প প্রদর্শনীর নান্দনিক দিকটি বিবেচনা করেই শিল্পকলায় চারুকলামূলক মৃৎশিল্পকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে কারিগরি মৃৎশিল্পকেও শহরের মানুষের আধুনিক অন্দরমহলে পৌঁছে দিতে তিনি আলাদাভাবে কাজ করছেন।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ‘‘কারিগরি মৃৎশিল্প নিয়ে যে প্রদর্শনী হতে পারে না, তা কিন্তু নয়। বছর চারেক আগে চারুকলা অনুষদের ‘জয়নুল উৎসব’-এ ‘বাংলাদেশের ব্যবহারিক মৃৎপাত্র’ নামে একটি চমৎকার প্রদর্শনী হয়েছিল, যেখানে আমার সংগৃহীত অনেক প্রাত্যহিক ব্যবহারের মৃৎপাত্র স্থান পেয়েছিল।’’

মায়ের কোলে শিশু–মায়া, মমতা ও বাৎসল্য রসে সিক্ত এক চিরন্তন দৃশ্য। একতাল কাদার তৈরি একটি সাধারণ খেলনার মধ্যে এমন গভীর আবেগ ও জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলা কেবল শিকড়সন্ধানী শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব। নেত্রকোনার এক অখ্যাত মৃৎশিল্পীর গড়া এই মাটির পুতুলের এমন শৈল্পিক বিবরণই দিয়েছেন শিল্পকলা একাডেমির লোকশিল্প প্রদর্শনীর কিউরেটর জিন্নাতুন জান্নাত মুন, যার সংগ্রাহক ইমরান উজ-জামান।

শিল্পকলা একাডেমির এই প্রদর্শনীতে মৃৎশিল্প ছাড়াও স্থান পেয়েছে ইউনেস্কো স্বীকৃত ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রিকশাচিত্র, গ্রামীণ পটচিত্র, বিচিত্র মুখোশ এবং বাঁশ, বেত ও কাঠের সুনিপুণ কাজ। উপকরণ প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রতিটি শিল্পকর্মের পেছনের ইতিহাস ও তথ্য চিরকুটে লিখে দেওয়া হয়েছে। রিকশাচিত্র সম্পর্কে সেখানে বলা হয়েছে, ‘ঢাকা ও অন্যান্য শহরাঞ্চলে চলাচলকারী এই রিকশাগুলো একেকটি যেন জীবন্ত ক্যানভাস। নিজস্ব অঙ্কনশৈলী, উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার এবং বিষয়বস্তুর স্বাতন্ত্র্যের কারণে এটি আজ বিশ্বদরবারে সমাদৃত।’

গত ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। আমাদের মূলধারার শিল্পচর্চায় লোকশিল্পের অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক আবদুল হালিম চঞ্চল আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘‘রিকশাচিত্র থেকে শুরু করে মাটির পুতুল–এই অপূর্ব লোকশিল্পগুলোকে আমাদের দেশের গ্যালারি বা জাদুঘরগুলোয় কখনোই সেভাবে যথাযথ সম্মান ও স্থান দেওয়া হয়নি। একটি ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এগুলোকে সবসময় ‘নিচু স্তরের শিল্প’ বা ‘লো আর্ট’ হিসেবে খাটো করে দেখার প্রবণতা ছিল। অথচ এই শিল্পগুলোর যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও শিল্পগুণ, তা অনায়াসেই আমাদের জাতীয় শিল্পচর্চার মূল ভিত্তি হতে পারত। সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই আমরা এবার লোকশিল্পকে মূল ফোকাসে নিয়ে এসেছি। লোকশিল্প নিচু মানের শিল্প–এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমরা জনগণকে মুক্ত করতে চাই।”

আরও পড়ুন

×