ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শব্দের জাদুতে ফিরছে বই

শব্দের জাদুতে ফিরছে বই
×

বই ধরা দিচ্ছে অডিওবুক রূপে ছবি: জেমিনি এআইয়ের সহযোগিতায় চিত্রিত

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:১৫ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১৭:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আঙুল ছুঁয়ে মানুষ এখন পুরো জগৎ দেখছে। সিনেমা দেখা, গান শোনা, বাজার করা থেকে শুরু করে জীবনসঙ্গী খোঁজা–সবই চলছে এক ক্লিকে। কিন্তু এই দ্রুতগতির জীবনে বই কোথায়? শহরের যানজট, ক্লাস-অ্যাসাইনমেন্ট, অফিসের চাপ কিংবা দীর্ঘ যাত্রাপথে বই খুলে বসার ফুরসত মেলা ভার। ব্যস্ততার এই নির্মম বাস্তবতায় বই যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল জীবনের প্রান্তসীমায়। ঠিক সেই শূন্যস্থানে এক নতুন রূপে ফিরে আসছে সাহিত্য। কাগজের পাতার বদলে কানে ভেসে আসছে গল্প, কবিতা আর উপন্যাস। বিশ্বজুড়ে অনেক আগেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা ‘অডিওবুক’ এখন ধীরে ধীরে আপন করে নিচ্ছে বাংলাদেশকেও।

অডিওবুকের ধারণা কিন্তু খুব একটা নতুন নয়। অনেক গবেষক মনে করেন, মানুষের গল্প শোনার সংস্কৃতি বই পড়ার অভ্যাসের চেয়েও প্রাচীন। তবে আধুনিক অডিওবুকের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল বিশ শতকের ত্রিশের দশকে। যুক্তরাষ্ট্রে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য তৈরি হয়েছিল ‘টকিং বুক’। ১৯৩১ সালে ‘আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর দ্য ব্লাইন্ড’ এবং ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’ যৌথভাবে বই রেকর্ডিং প্রকল্প হাতে নেয়। শুরুর দিকে ছোট ছোট ডিস্কে বইয়ের অংশবিশেষ রেকর্ড করা হতো। সময়ের পরিক্রমায় প্রযুক্তির আশীর্বাদে ক্যাসেট, সিডি ও এমপিথ্রি যুগ পেরিয়ে অডিওবুক আজ সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয়।

প্রযুক্তির ডানায় ভর করে নতুন জীবন
বিশেষ করে স্মার্টফোন ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের অবারিত বিস্তার অডিওবুককে দিয়েছে এক নতুন জীবন। অডিবল, স্পটিফাই ও স্টোরিটেলের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো কোটি কোটি মানুষকে বই শোনার এক নতুন অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অডিওবুক বাজারের আয় কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখনও সেই উচ্চতা থেকে বেশ দূরে থাকলেও, সম্ভাবনার দিগন্ত প্রসারিত হচ্ছে দ্রুতগতিতে।
গবেষকদের মতে, মানুষের ব্যস্ত জীবন, পডকাস্ট সংস্কৃতির বিস্তার এবং মাল্টিটাস্কিংয়ের অভ্যাস–এই তিনটি বিষয় মূলত অডিওবুকের জনপ্রিয়তা বাড়াতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এখন মানুষ স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি চালাতে চালাতেও বই শোনেন, আবার জিমে ঘাম ঝরাতে ঝরাতেও শেষ করেন কোনো রোমাঞ্চকর গল্প।

অডিওবুকের নতুন পৃথিবী

শ্রোতার মধ্যেও আসছে পরিবর্তন। কেউ রাতের নিস্তব্ধতায় গল্প শুনছেন, কেউবা ট্রাফিকের কোলাহলে বসে ডুবে যাচ্ছেন উপন্যাসের গভীরে। বিদেশে থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে অডিওবুক হয়ে উঠছে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার এক নস্টালজিক সেতু। প্রবাসের মাটিতে বসে বহু মানুষ এখন বাংলা সাহিত্য শুনে মাতৃভাষার অমল ঘ্রাণ নিচ্ছেন। অডিওবুকের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই–এটি বইকে আবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করছে। যে মানুষটির হাতে একদমই সময় নেই, সেও এখন গল্পের মায়াজালে জড়াতে পারছে। শব্দের পরত দিয়ে তৈরি হচ্ছে কল্পনার এক নতুন পৃথিবী।

হয়তো ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বইমেলার কোলাহলের পাশাপাশি দেখা যাবে অডিওবুক স্টুডিওর ব্যস্ততা। হয়তো কোনো তরুণ ভয়েস আর্টিস্টের জাদুকরী কণ্ঠে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ কিংবা সৈয়দ মুজতবা আলী। প্রযুক্তি তাই বইয়ের শত্রু নয়, বরং সাহিত্যের এক নতুন দরজা। সেই দরজার ওপাশে হয়তো নতুন কাগজের গন্ধ নেই, কিন্তু কান পাতলেই শোনা যায় শব্দের অবিরাম জাদুকরী মূর্ছনা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অডিওবুকের রয়েছে নানা উপকারিতা–
মাল্টিটাস্কিংয়ের সুবিধা: হাঁটতে হাঁটতে, রান্না করতে করতে বা দীর্ঘ যানজটে বসেও বই শোনা যায়, যা সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে।

সর্বজনীন অভিগম্যতা: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিংবা চোখের সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্য এটি সাহিত্য আস্বাদনের এক বিশাল সুযোগ।

ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি: উচ্চারণ ও ভাষা শেখার ক্ষেত্রে অডিওবুক কার্যকর ভূমিকা রাখে। শিশুদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতেও এটি দারুণ সহায়ক।

মনোযোগ ও কল্পনাশক্তি: মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, গল্প শোনার অভ্যাস মানুষের কল্পনাশক্তি ও মনোযোগ বাড়াতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অডিওবুকের বিস্তারে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও বই শোনার আগ্রহ বাড়তে পারে

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে অডিওবুক নিয়ে কাজ করছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও প্ল্যাটফর্ম। এর মধ্যে ‘শুনবই’ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, ইউটিউবভিত্তিক গল্পপাঠ চ্যানেল এবং স্বাধীন ভয়েস আর্টিস্টরাও বাংলা অডিও কনটেন্ট তৈরি করে চলেছেন। কেউ সাহিত্যের আসর বসাচ্ছেন, কেউ দিচ্ছেন বইয়ের নির্যাস বা সারাংশ, আবার কেউবা মজেছেন পডকাস্টধর্মী গল্প বলায়।

এটি তরুণদের জন্য আয়ের এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। ভয়েস ওভার, সাউন্ড এডিটিং, স্ক্রিপ্ট অ্যাডাপটেশন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তৈরি, কনটেন্ট মার্কেটিং কিংবা অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট–নানা ক্ষেত্রে যুক্ত হয়ে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। কেউ কেউ আবার নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলে গল্পপাঠের মাধ্যমে গড়ে তুলছেন নিজস্ব শ্রোতামহল।

২০২১ সালে যাত্রা শুরু করা ‘শুনবই’ স্টার্টআপ বাংলা ভাষার বইকে ডিজিটাল অডিওতে রূপান্তরিত করে চলেছে অবিরাম। তাদের প্ল্যাটফর্মে রয়েছে উপন্যাস, ছোটগল্প, বইয়ের সারাংশ, শিশুতোষ কনটেন্ট থেকে শুরু করে পডকাস্ট পর্যন্ত নানা আয়োজন। মাত্র কয়েকটি বই নিয়ে পথচলা শুরু করলেও, বর্তমানে তারা শত শত কপিরাইটেড বই যুক্ত করেছে তাদের ভান্ডারে।

প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা শাহারিয়ার হৃদয় জানান, করোনা মহামারির গৃহবন্দি সময়ে ইংরেজি অডিওবুক শুনতে শুনতেই বাংলা অডিওবুক প্ল্যাটফর্ম তৈরির ভাবনা দানা বাঁধে তাঁর মনে। শুরুর মাত্র তিন মাসেই ৪৫টি দেশের শ্রোতা তাদের অ্যাপ ব্যবহার করতে শুরু করেন। আর এখন? প্রায় ৭৫টি দেশে ‘শুনবই’-এর মুগ্ধ শ্রোতা তৈরি হয়েছে।
হৃদয়ের মতে, ‘বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে গল্প শোনার সংস্কৃতি তো আগে থেকেই ছিল, অভাব ছিল শুধু প্রযুক্তিগতভাবে সেটিকে গুছিয়ে উপস্থাপন করার একটি প্ল্যাটফর্মের।’ তিনি আরও জানান, শুরুতে অনেক প্রকাশকই অডিওবুক নিয়ে বেশ সন্দিহান ছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে হয়তো ছাপা বইয়ের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সময় গড়িয়েছে, প্রকাশক ও লেখকরা বুঝতে শুরু করেছেন–এটি বইয়ের বিকল্প নয়, বরং নতুন পাঠক সৃষ্টির এক শক্তিশালী মাধ্যম।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাসফিকুল হাসান টনি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান, আগে বই পড়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও সময় বের করতে পারতেন না। এখন বাসে বা রিকশায় বসে যাতায়াতের সময়টাতেই অডিওবুক শোনেন। এতে সময়টাও কাজে লাগে তাঁর, আবার পছন্দের গল্পও শেষ করা যায়।
অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শোয়েব রহমান সজীবের মতে, ‘পরীক্ষার প্রচণ্ড চাপের মধ্যে বই পড়াটা অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু রাতে ঘুমানোর আগে ২০-৩০ মিনিট অডিওবুক শুনলে অদ্ভুত এক প্রশান্তি কাজ করে, মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।’

এত সব সম্ভাবনার পরও প্রশ্ন থেকেই যায়, বাংলাদেশে অডিওবুক এখনও কেন আরও বৃহত্তর পরিসরে জনপ্রিয় হতে পারেনি? এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, পাঠাভ্যাসের সংকট। দ্বিতীয়ত, অনেকেই এখনও অডিওবুককে ‘আসল বই’ হিসেবে মেনে নিতে পারেন না। এ ছাড়া পাইরেসি, কপিরাইট সচেতনতার অভাব এবং মানসম্মত ভয়েস প্রোডাকশনের ঘাটতিও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। 

তবে প্রকাশকরা আশাবাদী। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন মনে করেন, “এখনকার তরুণদের জীবন খুব দ্রুতগতির। তারা যাত্রাপথে, ব্যায়াম করার সময় কিংবা কাজের ফাঁকে কনটেন্ট গ্রহণ করতে চায়। তাই অডিওবুককে শুধু বই পাঠ হিসেবে নয়, বরং ‘লাইফস্টাইল কনটেন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’’ তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের মধ্যে নন-ফিকশন, আত্মউন্নয়নমূলক বই ও সমসাময়িক সাহিত্যের অডিও সংস্করণের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
কথাপ্রকাশের প্রকাশক জসিম উদ্দিনের মতে, ‘বাংলাদেশে গল্প শোনার ঐতিহ্য অনেক পুরোনো। গ্রামে একসময় মানুষ উঠানে বসে রূপকথা শুনত, পালাগানের আসর বসত। এখন সেই জায়গাটি দখল করেছে প্রযুক্তি। তাই অডিওবুককে মানুষের এই সাংস্কৃতিক অভ্যাসেরই একটি অংশ করে তুলতে হবে।’ তাঁর বিশ্বাস, জনপ্রিয় অভিনেতা, আবৃত্তিকার ও কণ্ঠশিল্পীদের যুক্ত করা গেলে অডিওবুক আরও দ্রুত সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।

আরও পড়ুন

×