ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শৈশবের আলো

শৈশবের আলো
×

 এইচ বি রিতা

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৩ | আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ২০:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনের হিসাবনিকাশ যখন খুব জটিল হয়ে ওঠে, তখন পেছন ফিরে তাকালে কিছু মুখ আলোর মতো জ্বলজ্বল করে। আমার শৈশব, কৈশোর আর আজকের এই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের ক্যানভাসে এমনই এক ধ্রুবতারা সেলিনা আক্তার; যেখানে অধিকার, অভিমান, হাসি আর অদ্ভুত এক একচ্ছত্র ভালোবাসা মিলেমিশে আছে। 

আমার বন্ধু সেলিনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কিছুটা জটিল অথচ নির্মল বন্ধুত্বের গল্প, যার শুরু প্রাইমারি স্কুলের সেই ছোট্ট কাঠের বেঞ্চে বসে। আমরা তখন খুব ছোট। পৃথিবীটাও ছিল ছোট–স্কুল, বাড়ি আর কয়েকটা পরিচিত মুখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেই ছোট্ট জগতের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলাম আমরা দুজন। সেলিনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা ছিল গভীর ভালোবাসা, আগলে রাখার এক তীব্র তাড়না এবং কিছুটা মজার একচ্ছত্র আধিপত্য। 

ছোটবেলা থেকেই আমার ওপর সেলিনার টানটা ছিল চোখে পড়ার মতো। ও আমাকে কতটা ভালোবাসত, তা বোঝানোর সেরা উপায় ছিল ওর একগুঁয়েমি। আমি যদি অন্য কোনো সহপাঠী বা বন্ধুর সঙ্গে একটু বেশি মেলামেশা করতাম বা হাসাহাসি করতাম, সেলিনার মুখটা মুহূর্তেই মেঘলা হয়ে উঠত। সে মুখ গোমড়া করে বসে থাকত, আবার কখনও সরাসরি রাগ দেখাত। ওর চোখেমুখে ফুটে উঠত এক অদ্ভুত কষ্ট আর অভিমান। যেন ওর স্পষ্ট অঘোষিত নিয়ম ছিল, ‘তুমি শুধু আমারই বন্ধু!’

তখন হয়তো বুঝতাম না, কিন্তু এখন ভাবলে মনে হয়, এটি ছিল এক ধরনের ‘এক্সক্লুসিভ অ‍্যাটাচমেন্ট’, যেখানে প্রিয় মানুষটিকে নিজের বলেই মনে করতে ইচ্ছে করে। আমার প্রতি তার এই মায়া কখনও কখনও ঈর্ষার মতো লাগলেও, এর ভেতরে ছিল এক গভীর নিরাপত্তাবোধ। কেউ যদি ক্লাসে বা খেলার মাঠে আমাকে সামান্য আঘাত করত বা বাজে কথা বলত, ব্যাস! সেলিনাকে আর ঠেকায় কে? সে গিয়ে সেই বাঘা বাঘা প্রতিপক্ষের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে দিত। নিজের গায়ের জোর থাক বা না থাক, বন্ধুকে রক্ষা করতে তার বীরত্বের অভাব ছিল না কোনোদিন। 

মজার ব্যাপার হলো, এতদিন পার হয়ে গেলেও সেলিনা আজ পর্যন্ত বিন্দুমাত্র বদলায়নি। সময় বদলেছে, জীবন বদলেছে, কিন্তু সেলিনার ভেতরের সেই শিশুটি যেন ঠিকই রয়ে গেছে। এখনও তার কণ্ঠে মাঝে মাঝে সেই পুরোনো অভিমান ধরা পড়ে, সেই পুরোনো যত্নও। আমরা দুজনই বড় হয়েছি, বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখেছি, কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বের ভেতরে সেই প্রাথমিক দিনের সরলতা এখনও কোথাও নরমভাবে বেঁচে আছে।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় কোনো প্রিয় মানুষের প্রতি এই ধরনের একচ্ছত্র অধিকারবোধ বা তীব্র আকর্ষণকে বলা হয় ‘পসেসিভনেস’ বা ‘ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট’। আবার বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এমন গভীর এবং একচেটিয়া মানসিক নির্ভরতাকে কখনও কখনও ‘প্লাটোনিক পসেসিভনেস’ বলা হয়ে থাকে। যদিও শব্দটি শুনতে কিছুটা ভারী মনে হয়, কিন্তু সেলিনার এই অধিকারবোধের পেছনে কোনো স্বার্থ ছিল না, ছিল শুধুই এক নিষ্পাপ ও নির্মল ভালোবাসা।

আজ যখন জীবনের ব্যস্ততায় আমরা সবাই একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি, তখন সেই শৈশবের দিনগুলোর কথা ভেবে বুকটা এক অজানা বেদনায় ভার হয়ে ওঠে। টিফিন ভাগ করে খাওয়া, প্রাইমারির মাঠে একসঙ্গে দৌড়ানো, আর আমার ওপর সেলিনার সেই মিষ্টি ‘দাদাগিরি’–সবই আজ স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি। প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই নিষ্পাপ বিকেল, সেই অসমাপ্ত গল্প আর ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ঝগড়া আর অভিমানের দিনগুলোকে কি আর ফিরিয়ে দিতে পারবে?

আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়–আমরা আসলে শুধু সময় হারাইনি, হারিয়েছি সেই নির্ভেজাল অনুভূতির দিনগুলোও। এখনকার সম্পর্কগুলো অনেক হিসেবি, অনেক সচেতন; সেখানে এমন সরল অধিকার বা নিঃসংকোচ অভিমান খুব কমই দেখা যায়। 

তবুও, এই হারানোর মধ্যেও একধরনের সৌন্দর্য আছে। কারণ স্মৃতি থেকে যায়, আর সেই স্মৃতির ভেতরেই বন্ধুত্ব নতুন করে বেঁচে ওঠে। সেলিনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব তাই শুধু বর্তমানের নয়–এটি অতীতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়, যা আজও আমার ভেতরে নরম আলো হয়ে জ্বলছে। 

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শিক্ষক

আরও পড়ুন

×