ব্রড পিক ট্র্যাজেডি
এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান
(বাম থেকে) ইকরামুল হাসান শাকিল, নিমা নুরু শেরপা, কিলি পেম্বা শেরপা (কিলু)
ইকরামুল হাসান শাকিল
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৭ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
পর্বত কখনও আরোহীকে বিজয়ী হওয়ার জন্য ডাকে না। পর্বত ডাকে তার বিশালতা, নিঃশব্দ গাম্ভীর্য এবং মানুষকে তার ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। সেই ডাক কানে শোনা যায় না, শুনতে হয় হৃদয় দিয়ে। যারা সেই নিঃশব্দ ডাক শুনতে পায়, তারাই কেবল পর্বতের বিশালতা ছুঁয়ে দেখার অনুমতি পায়–যে অনুমতি পর্বত স্বয়ং নিজে দেয়। কিন্তু কখনও কখনও সেই ভয়ংকর সুন্দরের নিঃশব্দ বিশালতা নেমে আসে এক নির্মম ধ্বংসস্তূপ হয়ে। তেমনই ইতিহাসের এক ভয়াবহতম তুষারধস হয়ে গেল পৃথিবীর আট হাজার মিটারের অধিক উচ্চতার ১৪টি পর্বতের মধ্যে ১২তম পর্বত শিখর পাকিস্তানের ব্রড পিকে (৮,০৫১ মিটার)।
২০২৬ সালের ৩০ জুলাই সকালে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ তুষারধস এবং নির্মল পুরজাসহ ১০ জন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহীর অকালপ্রয়াণ বিশ্বের সব পর্বতপ্রেমীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। একজন পর্বতারোহী হিসেবে আমার ভেতরের শূন্যতা আর বেদনার ক্ষতটা আজ একটু বেশিই গভীর। এটি শুধু কয়েকজন পর্বতারোহীর চলে যাওয়া নয়, এটি পুরো বিশ্ব পর্বতারোহণ জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
যারা সেদিন ব্রড পিকের প্রায় ছয় হাজার ৬৬০ মিটারের ওপরে প্রাণ হারিয়েছেন, তারা কেউ অপেশাদার ছিলেন না। তারা ছিলেন বরফ ও পাথরের ভাষা বুঝতে পারা পৃথিবীর সেরা কয়েকজন পর্বতারোহী। এই ১০ জনের মধ্যে তিনজনের সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় ও অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে ছিল।
নির্মল পুরজার কথা আলাদা করেই বলতে হয়, যিনি পর্বতারোহণের জগতে ‘নিমস দাই’ নামে অধিক পরিচিত। ২০১৯ সালে মাত্র ১৮৯ দিনে ১৪টি আট হাজারি পর্বত জয় করে তিনি যে ইতিহাস গড়েছিলেন, তা সারাবিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। সম্প্রতি তিনি অক্সিজেন ছাড়াই দ্বিতীয়বারের মতো ১৪টি চূড়া আরোহণের এক অকল্পনীয় রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে একই দড়ি ধরে কোনো পর্বতে ওঠার সুযোগ আমার হয়নি ঠিকই; তবে নেপালে তাঁর সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। তাঁর অদম্য তেজ এবং পর্বতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় অনুপ্রেরণা জোগাত। পর্বতারোহণকে তিনি এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর সাহস, দক্ষতা আর পর্বতের প্রতি অগাধ ভালোবাসায়।
বিশ্বখ্যাত আরেক পর্বতারোহী কিলি পেম্বা শেরপা (কিলু)। ২০২৫ সালেই তিনি ১৪টি আট হাজারি চূড়া জয়ের বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার অসংখ্য স্মৃতি। ২০১৫ সালে আমার প্রথম ছয় হাজার মিটারের পর্বত ‘মাউন্ট কেয়াজো-রি’ আরোহণের সময় আমাদের শেরপা টিমের দলনেতা ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে আমি একাধিক কঠিন অভিযানে অংশ নিয়েছি। পর্বতকে কীভাবে সম্মান করতে হয়, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কীভাবে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তা আমি তাঁর কাছ থেকে শিখেছি। তিনি কেবল একজন গাইড বা সহযাত্রী ছিলেন না; ছিলেন পর্বতের বুকে আমার অন্যতম অভিভাবক ও শিক্ষক।
পাকিস্তানের অভিজ্ঞ পর্বতারোহী ও গাইড সোহাইল সাখি–তাঁর সঙ্গে ছিল আমার এক আত্মিক বন্ধুত্ব। ২০২২ সালে প্রথম পরিচয়ের পর থেকে একে অপরের অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা নিয়মিত শেয়ার করেছি। আমাদের একটা স্বপ্ন ছিল–একসঙ্গে ‘দ্য গ্রেট হিমালয়ান ট্রেইল’-এর কারাকোরাম অংশ অভিযান করব। তাঁর মুখে সবসময় যেন হাসি লেগেই থাকত। তাঁর সেই পরিচিত হাসি আর পর্বতের প্রতি খাঁটি ভালোবাসা আজও আমার চোখে ভাসছে। তাদের এভাবে চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এত অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা কেন এই তুষারধসের কবলে পড়েন? সত্য বলতে, এটি পর্বতের এক অমোঘ খেয়াল। পর্বতারোহণে সবচেয়ে অদৃশ্য এবং গুরুতর বিপদের নামই হলো তুষারধস। পর্বতে নিয়মিত তুষারপাত হয়। পুরোনো ও শক্ত বরফের স্তরের ওপর যখন নতুন করে প্রচুর নরম তুলতুলে বরফ জমা হয়, তখন সেই ওপরের স্তরটি ভার সামলাতে না পেরে খাড়া ঢাল বেয়ে তীব্র বেগে নিচে নেমে আসে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তুষারধসের সময় যখন হাজার হাজার টন বরফ নিচে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শত কিলোমিটার গতিবেগ লাভ করে। এর সামনে যা আসে, তা-ই খড়কুটোর মতো উড়ে যায়।
আধুনিক প্রযুক্তি–যেমন অ্যাভালাঞ্চ বিকন, প্রোব, রেকো রিফ্লেক্টর চিপ অথবা জিপিএস ট্র্যাকার আমাদের বরফের নিচে চাপা পড়া মানুষকে দ্রুত খুঁজে বের করতে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু যখন পুরো একটা পাহাড় ভেঙে পড়ে, তখন মানুষের তৈরি প্রযুক্তি বড্ড অসহায় হয়ে পড়ে। বড় কোনো তুষারধসের কবলে পড়লে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি।
ইতিহাস সাক্ষী, পর্বত তার নিজের নিয়মেই চলে। ২০১৪ সালের এভারেস্ট ট্র্যাজেডি (১৬ জন শেরপা গাইড নিহত) এবং ২০১৫ সালে নেপালের ভূমিকম্পের ফলে পুমরি পর্বত থেকে নেমে আসা তুষারধস (২৪ জন আরোহী ও গাইড নিহত)–প্রতিটি ঘটনাই আমাদের এই কঠোর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পর্বত এমন এক জায়গা যেখানে শারীরিক শক্তি, অহংকার কিংবা কোনো জোর খাটে না। অতিমানবী সাহস আর বছরের পর বছর অর্জিত অভিজ্ঞতাও ব্যর্থ হয়ে যায়, যদি পর্বত আপনাকে ওপরে ওঠার বা ফিরে আসার অনুমতি না দেয়। নির্মল পুরজাও ব্রড পিকে আরোহণের আগে সামাজিক মাধ্যমে ঠিক এমনই প্রার্থনা করেছিলেন–পর্বত যেন তাঁকে নিরাপদে ওপরে উঠিয়ে আবার নেমে আসার সুযোগ দেয়।
পর্বতের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, আমরা কখনোই কোনো পর্বত ‘জয়’ করতে পারি না। পর্বত দয়া করে আমাদের তাঁর চূড়ায় দাঁড়ানোর অনুমতি দেয় মাত্র। পর্বতকে সমীহ করতে হয়, তার প্রতিটি সংকেতকে সম্মান জানাতে হয়। সামিট বা চূড়া ছোঁয়া কখনোই জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।
আজ ব্রড পিকের শুভ্র বরফের নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত কিলি পেম্বা, সোহাইল, নির্মল পুরজাসহ সেই ১০ জন বীরের আত্মার শান্তি কামনা করি। তোমরা আকাশের মেঘে আর কারাকোরামের হিমশীতল বাতাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। আমরা যারা এখনও পর্বতের প্রেমে বুঁদ হয়ে আছি, প্রতিটি পদক্ষেপে তোমাদের রেখে যাওয়া এই বিয়োগান্তক শিক্ষা আর পর্বতের প্রতি অগাধ সম্মান সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাব।
বিদায়, পর্বতের বীর সন্তানরা!
লেখক: এভারেস্ট সামিট করা পর্বতারোহী
- বিষয় :
- ট্র্যাজেডি
- পর্বতারোহণ
- ইকরামুল হাসান শাকিল