কালনীর ঢেউয়ে চিরভাস্বর শাহ আবদুল করিম
শাহ আবদুল করিম [১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬–১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯]
পঙ্কজ দে
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রাম। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শান্ত কালনী নদী। এই নদীর তীরে এক অভাবী পরিবারে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন শাহ আবদুল করিম। বাবা ইব্রাহিম আলী ছিলেন পেশায় দিনমজুর, মা নাইওরজান বিবি। ছয় সন্তানের সংসারে একমাত্র ছেলে ছিলেন তিনি। নিদারুণ দারিদ্র্যের মাঝে বেড়ে ওঠা করিমের জীবনে স্কুল-কলেজে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের সুযোগ হয়নি। পরিবারের হাল ধরতে গ্রামের এক মোড়লের বাড়িতে গরুর রাখাল হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। এই কাজে ছুটি ছিল না, এমনকি ঈদের দিনেও মিলত না বিশ্রাম। সেই কষ্টের কথা তিনি নিজেই গানে গানে লিখেছেন, ‘মাঠে থাকি গরু রাখি, ঈদের দিনেও ছুটি নাই/ এই দুঃখ কার কাছে জানাই।’
এই কঠিন জীবনসংগ্রামের মাঝেই তাঁর মনে বোনা হচ্ছিল সুরের বীজ। মাঠে গরু চরাতে চরাতে আপন মনে গাইতেন। নিজে গান রচনা করতেন, সুর মেলাতেন। তাঁর গানে হাতেখড়ি হয় আরেক গানপাগল মানুষ করম উদ্দিনের কাছে। মা নাইওরজান বিবি তাঁকে ‘ধর্মের বাবা’ ডেকেছিলেন। সুযোগ পেলে করম উদ্দিনের কাছে তালিম নিতে ছুটতেন কিশোর করিম।
করম উদ্দিনের নাতি ৭০ বছর বয়সী আকমল হোসেন বাউল স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘দাদার কাছে গানের তালিম নিতে আসতেন শাহ আবদুল করিম। দাদা তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। আমার বাবা আছদ্দর মিয়া ও তিনি পরে একসঙ্গে বিভিন্ন মালজোড়া গানের আসর করেছেন। গান গেয়ে তেমন টাকা-পয়সা মিলত না, তবুও গানের আসর ছাড়েননি শাহ আবদুল করিম।’
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি গ্রামের তৈয়মুর চৌধুরীর কাছ থেকে অক্ষরজ্ঞান শিখেছিলেন। আকমল হোসেন জানান, যৌবনে কোথাও কোনো মালজোড়া গান বা যাত্রা শুনে এলে, বাড়িতে ফিরে তিনি অবিকল তা অন্যদের শোনাতে পারতেন। সেই প্রতিভাকে সম্বল করে তিনি জীবদ্দশায় রচনা করেছেন দেড় হাজারেরও বেশি গান।
বাউলের এই অগোছালো ও বোহেমিয়ান জীবনকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী আফতাবুন্নেছা, ভালোবেসে করিম যাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘সরলা’। ধল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক দীন ইসলাম জানান, শাহ আবদুল করিমের প্রথম বিয়ে হয়েছিল কাছামালা বিবির সঙ্গে। সে সংসার বেশিদিন টেকেনি। পরে সরলার সঙ্গে তাঁর জীবন বাঁধা পড়ে। সরলা কখনোই স্বামীর বাউল জীবনে বিরক্ত হতেন না, বরং উৎসাহ দিতেন। দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা জেনেছি, সরলা হয়তো বাজার করার জন্য তাঁকে পাঠিয়েছেন; করিম সেটি ভুলে গিয়ে দূরে কোথাও গানের আসরে চলে গেছেন। এক-দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও কোনো খোঁজ নেই। সরলা এই আচরণ সহজভাবে বুঝতে পারতেন এবং প্রেরণা জোগাতেন।’
সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে কথা বলায় কখনও কখনও সমাজপতিদের রক্তচক্ষুর মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাঁকে। নিজের শিষ্য বালক শাহ আকবর আলীর জানাজা পড়ানো নিয়ে স্থানীয় ইমাম আপত্তি তুললে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিলেন তিনি। একপর্যায়ে গ্রামের কিছু মানুষের বাধায় গান-বাজনা ছাড়তে বাধ্য করা হলে অভিমানে গ্রাম ছেড়ে দিরাই সদরে চলে গিয়েছিলেন। পরে গ্রামবাসীর অনুরোধে ও আছদ্দর আলীসহ অন্যদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি মীমাংসা হলে তিনি আবার নিজ ভিটায় ফেরেন।
শাহ আবদুল করিমের গানে ভাটি বাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি সামাজিক বৈষম্য ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তাঁর গান সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছে। ২০০১ সালে একুশে পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। এসব পুরস্কার তাঁকে কখনও মোহগ্রস্ত করতে পারেনি। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ইনার উদ্দিন ফাহিম বলেন, ‘‘২০০১ সালে একুশে পদক পাওয়ার খবর শুনে আমি আনন্দে দৌড়ে করিম ভাইয়ের কাছে যাই। তিনি তখন গলায় গামছা পেঁচিয়ে গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে হাঁটছিলেন। আমি বললাম, ভাই আপনি তো দেশের বড় পুরস্কার একুশে পদক পেয়েছেন! তিনি অত্যন্ত নির্বিকারভাবে উত্তর দিলেন– ‘অয়বে ২১-২২ ইতা দিয়া আমি কীতা করতাম, ইতা আমার লাগে না রে। মওলানা ভাসানী হাতে ধইরা কইছইন–তুই পারবি করিম, তুই পারবি।’
ভাটির এই সুরস্রষ্টা তাঁর অসামান্য গানের ভান্ডারে বাংলার মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
- বিষয় :
- বাউল
- শাহ আবদুল করিম
- সুনামগঞ্জ