বিলজুড়ে গোলাপি সকাল
যেন রাতভর গোলাপি রং ঢেলে রেখে গেছে জলের ওপর / ছবি:: সাব্বির মির্জা
এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৪ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভোরের আলো তখনও পুরো ফোটেনি। সাকুয়াদিঘীর মেঠো পথ ধরে হেঁটে বিলের কিনারে দাঁড়াতে মনে হলো, কেউ যেন রাতভর গোলাপি রং ঢেলে রেখে গেছে জলের ওপর। থোকা থোকা পদ্ম। বড় বড় সবুজ পাতার ওপর জমে থাকা শিশিরে রোদ পড়তেই মুক্তোর মতো ঝিকিয়ে উঠল। দুটো ডিঙি নৌকা ধীরে ভেসে যাচ্ছে, বৈঠার শব্দে ভাঙছে জলের নিস্তব্ধতা। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের এই বিলটির নাম বাঘমারা। স্থানীয়রা এখন ডাকেন ‘পদ্মবিল’ নামে।
নৌকায় উঠতে টের পেলাম, তীর থেকে দেখা আর ভেতরে ঢোকা এক জিনিস নয়। ডিঙি যত এগোয়, দুই পাশে পদ্মপাতার দেয়াল তত ঘন হয়। পাতাগুলো থালার মতো চওড়া, কিনারা একটু উঁচু, তাই বৃষ্টির পানি বা শিশির গড়িয়ে গিয়ে জমে থাকে মাঝখানে। নৌকার ধাক্কায় পাতা কাত হলে সেই জল টুপ করে গড়িয়ে পড়ে বিলে। এক জায়গায় কুঁড়িগুলো তখনও বন্ধ, রোদ চড়লে খুলবে। আরেক জায়গায় গতকালের ফোটা ফুলের পাপড়ি ঝরে ভাসছে। জলের নিচে দেখা যায় শালুকের ডাঁটা, মাঝেমধ্যে ছোট মাছের ঝাঁক ছিটকে সরে যায়। একটা পানকৌড়ি ডুব দিয়ে অনেকটা দূরে গিয়ে ভেসে ওঠে। বাতাসে ভেজা মাটি আর পচা পাতার চেনা গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে থাকে ফুলের হালকা মিষ্টি ঘ্রাণ–নাকে লাগে বললে বাড়িয়ে বলা হবে, বরং টের পাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে বৈঠা আটকে যায় পদ্মের শক্ত ডাঁটায়; মাঝি তখন ঠেলে নয়, ঘুরিয়ে নৌকা বের করে আনেন। বললেন, জোরে টানলে গোড়াসহ উঠে আসে, তাতে পরের বছরের ফুল কমে যায়।
বৈঠা বাইতে বাইতে মাঝি মো. রফিকুল ইসলাম কথা শুরু করেন। শাকুয়াদিঘী গ্রামের মানুষ, বয়স পঞ্চাশ। বললেন ছোটবেলার কথা, ‘তখন এই বিলের কোনো শেষ ছিল না। এক পারে দাঁড়ালে অন্য পার দেখা যেত না।’ তাঁর কথায় অতিরঞ্জন নেই। ষাট, সত্তর কিংবা আশির দশকেও চলনবিল ছিল বিশাল এক জলরাশি।
হিসাবটা এখন অন্য রকম। গবেষক ও পত্রিকার তথ্য বলছে, ১৯০৯ সালে চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৫ বর্গকিলোমিটার; এখন ভরা বর্ষাতেও তা প্রায় ১৬৮ বর্গকিলোমিটার, শুকনো মৌসুমে আরও কম। এক শতাব্দীতে সংকোচন প্রায় ৮৫ শতাংশ। নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে তৈরি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৮৮ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট। এক যুগে খনন হয়েছে আট থেকে দশ হাজার পুকুর। রাস্তা দরকার, সেতুও দরকার–তা নিয়ে তর্ক নেই। তর্কটা হলো, জলের চলার পথ কোথায় থাকবে সেই হিসাব কেউ রাখেননি। ফলে একান্নবর্তী এক বিল ভেঙে গেছে অসংখ্য খণ্ডে। বাঘমারা সেই ভাঙনেরই একটি টুকরো।
মজার ব্যাপার, এই টুকরোতে পদ্ম ফিরেছে। আশির দশকেও এখানে পদ্ম ফুটত, তারপর দীর্ঘ সময় দেখা মেলেনি। গত চার বছর ধরে ৩০ থেকে ৪০ বিঘা জলায়তনজুড়ে আবার গোলাপি পদ্ম ফুটছে। বর্ষার শুরুতে কুঁড়ি ধরে, শরতে এসে পূর্ণতা পায়। তবে যে জমিতে পদ্ম ফুটছে, সেগুলো মূলত পতিত ফসলি জমি। জল জমে থাকে বলে চাষ হয় না। অর্থাৎ কৃষকের হারানো একখণ্ড জমির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে দর্শনার্থীর এই মুগ্ধতা।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলের চেহারা বদলাতে থাকে। ভিড় জমে। তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, গুরুদাসপুর তো আছেই, শহর থেকেও আসছেন অনেকে। তরুণ-তরুণী, মধ্যবয়সী দম্পতি, নাতি-নাতনির হাত ধরে বয়স্ক মানুষ। কেউ নৌকায় উঠছেন, কেউ তীরে বসে থাকছেন চুপচাপ। মোবাইলের ক্যামেরা প্রায় সারাক্ষণ চালু; ছবি তোলা হচ্ছে আর তা সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক মাধ্যমে। বছর কয়েক আগেও বাঘমারার নাম আশপাশের গ্রামের বাইরে কেউ জানতেন না। এক ফোন থেকে আরেক ফোনে ছবি ঘুরে ঘুরে খবরটা ছড়িয়েছে। ছুটির দিনে এখন ভিড় সামলানো দায়।
বিকেলটা আরেক রকম। মিষ্টি রোদ পড়ে এলে বিলের জল হয়ে ওঠে তামাটে, পদ্মের গোলাপি তখন আরও গাঢ়। বিলপারের ধারে বসেছে দুই-চারটা চায়ের দোকান, ঝালমুড়ির ভ্যান। মাঝিরা হাঁক ছাড়েন–এক চক্কর ঘুরতে জনপ্রতি কত। যারা সারাবছর মাছ ধরে বা ক্ষেতে কাজ করে দিন চালান, শরতের এ দুই মাস তাদের হাতে বাড়তি কিছু টাকা আসে। বিলের সৌন্দর্য এখানে কেবল চোখের আরাম নয়, কারও ভাতের হিসাবও।
সব দৃশ্য অবশ্য সুখের নয়। ফুল ছিঁড়ে খোঁপায় গোঁজা, ছিঁড়ে নৌকার গলুইয়ে সাজিয়ে ছবি তোলা–এসব খুব সাধারণ ঘটনা এখানে। স্থানীয় তরুণ আকিব সরকার বলেন, ‘আমরা দর্শনার্থীদের ফুল ছিঁড়তে বারণ করছি। কেউ মানছেন, কেউ মানছেন না। মানাটা দরকার। পদ্ম আছে বলেই তো মানুষ আসছে।’ কথাটার ভেতরে সহজ একটা বিজ্ঞানও আছে– বংশবিস্তারের জন্য ফুলটাকে বিলের জলেই ঝরে পড়তে হয়। ছেঁড়া ফুল খোঁপায় শোভা পায় ঠিকই, পরের বর্ষায় সেটি আর ফেরে না।
শহর থেকে আসা দর্শনার্থী লুৎফর রহমানের ভাষায়, ‘ইট-পাথরের ব্যস্ততা থেকে একটু নিঃশ্বাস নিতে আসি। পরিবার নিয়ে নৌকায় উঠলে মনটা হালকা হয়।’ তিনি মনে করেন, বাঘমারাকে পর্যটনবান্ধব করা গেলে দর্শনার্থী আরও বাড়বে। এলাকার পরিবেশকর্মীরাও বিলের পরিবেশ ও পদ্ম সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়ে আসছেন। দুটো দাবি পাশাপাশি রাখলে একটা প্রশ্ন সামনে আসে– পর্যটন মানে কী? জলাভূমিকে ‘দর্শনীয়’ বানানোর দেশীয় অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়; বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা শুরু হয় পাকা ঘাট আর কংক্রিটের রাস্তা দিয়ে, শেষ হয় পলিথিন আর উচ্চ শব্দের মাইক দিয়ে। বাঘমারার জন্য বিকল্পটা কঠিন কিছু নয়–প্রবেশমুখে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নৌকা ভাড়ার নির্ধারিত হার, ফুল না ছেঁড়া ও প্লাস্টিক না ফেলার স্পষ্ট নিয়ম, আর ব্যবস্থাপনার ভেতরে স্থানীয় মাঝি-পরিবারগুলোকে রাখা।
যেতে চাইলে সময়টা এখনই। ভাদ্র-আশ্বিনে পদ্ম পূর্ণ যৌবনে থাকে। হাটিকুমরুল হয়ে তাড়াশ, সেখান থেকে নওগাঁ ইউনিয়নের সাকুয়াদিঘী। সকাল ৭টার আগে পৌঁছাতে পারলে সবচেয়ে ভালো–তখন ভিড় কম, শিশির থাকে, ফুলও তরতাজা। বিলপারে খাওয়ার তেমন ব্যবস্থা নেই, পানি সঙ্গে নেওয়া ভালো। ফেরার সময় নিজের ফেলা প্যাকেট-বোতলটুকু কুড়িয়ে নেওয়া এটুকু অন্তত করা যায়।
ফেরার পথে পেছনে তাকিয়ে মনে হলো, দৃশ্যটা সত্যিই এক টুকরো স্বর্গ। কিন্তু স্বর্গটা ভাড়া করা। মেয়াদ কত দিন, তা ঠিক করবে বিলের জল শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেই হিসাব। পদ্ম নিজে থেকে ফোটে; ফুটতে দেওয়ার দায়িত্বটা মানুষের।