ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পল্লবীতে শিশু হত্যা

আমি শুধু লাশ কেটেছি, ধর্ষণ করেছে ডলার: প্রধান আসামি সোহেল

আমি শুধু লাশ কেটেছি, ধর্ষণ করেছে ডলার: প্রধান আসামি সোহেল
×

ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ২২:০০ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ২২:০৭

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগগঠন (চার্জ) করেছেন আদালত। ঢাকা মহানগরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন সোমবার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের উপস্থিতিতে অভিযোগ গঠনের এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামীকাল মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেন।

অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং স্বপ্নাকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। বেলা ১১টার দিকে আদালত কক্ষে শুনানির জন্য এজলাসে তোলা হয় তাদের।

রাষ্ট্রনিযুক্ত বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু অভিযোগ গঠনের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি বলেন, শিশুটিকে বাসায় ডেকে নিয়ে বাথরুমে ধর্ষণ করা হয়। তাকে বেঁধে নির্যাতনের এক পর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পরে আসামি তাকে মৃত ভেবে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে শরীর থেকে গলা কেটে আলাদা করে। একইসঙ্গে বাথরুমের ভেতরেই তার হাত-পা বিচ্ছিন্ন করা হয়।

আইনজীবী দুলু বলেন, ঘটনার দিন ভুক্তভোগীর মা শিশুটিকে স্কুলে পাঠানোর জন্য ডাকাডাকি করলে তাকে খুঁজে পাননি। পরে একটি জুতা দেখতে পেয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এসময় আশপাশের লোকজন জড়ো হন। ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের দরজা খুললেও আসামিদের ফ্ল্যাটের দরজা না খোলায় সবার মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। পরে জানালা দিয়ে একজন ফ্ল্যাটের ভেতরে রক্ত দেখতে পান। এরপর দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, আসামি সোহেল রানা পালিয়ে গেছেন। তার স্ত্রী তখন উপস্থিত লোকজনকে জানান, তার স্বামী এমন ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে গেছেন। পরে পুলিশ এসে তাকে গ্রেপ্তার করে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ আসামিদের অব্যাহতি চেয়ে শুনানি করেন। তিনি বলেন, তড়িঘড়ি মামলার তদন্ত শেষ করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও আনতে পারেনি। এ সময় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকীসহ অন্যান্য আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

উভয়পক্ষের শুনানি শেষে প্রধান আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান বিচারক। পরে অপর আসামি স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনানো হয়। এতে বলা হয়, তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং শিশুটিকে হত্যায় বাধা না দিয়ে রক্ত ও আলামত নষ্টে সহযোগিতা করেছেন, যা হত্যার অপরাধের সহায়তা হিসেবে গণ্য হয়। পরে বিচারক স্বপ্না আক্তারের কাছে জানতে চান, তিনি নিজেকে দোষী মনে করেন কি না। উত্তর দিতে গিয়ে কেঁদে ওঠেন স্বপ্ন।

কাঠগড়ায় দাঁড়ানো স্বামী সোহেল রানাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তুমি বল আমি দোষী কিনা। এসময় সোহেল রানা আদালতে দাবি করেন, স্বপ্না নির্দোষ। শুনানি শেষে আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করে এজলাস ত্যাগ করেন বিচারক।

এরপর কাঠগড়ায় একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সোহেল উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, আমি ধর্ষণ করিনি, শুধু লাশ কাটছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন। আমি পাপ করছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন।

সোহেল বলেন, মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল। এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেন। পরে ১১টা ৪০ মিনিটে তাদেরকে কাঠগড়া থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় হাজতখানায় নেওয়া হয়।

চার্জ গঠনের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু সাংবাদিকদের বলেন, মামলাটি যেন দ্রুত শেষ হয়, সে বিষয়ে দায়িত্ব পালন করব। এখন থেকে প্রতিদিন বিচার কাজ চলবে। বাকি সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনাল নেবেন।

সাংবাদিকদের যা বললেন সোহেল
আদালত থেকে কারাগারে যাওয়ার পথে প্রিজনভ্যানে সোহেল সাংবাদিকদের উদ্দেশে উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, মিরপুর-১১ নম্বর লাইনে বাড়ি ডলারের। শিশুটিকে ধর্ষণ-হত্যার মূল আসামি ওই ডলার। ডলার তাকে ধর্ষণ করছে এবং মারছে। আমি মারিনি ও ধর্ষণ করিনি। তাকে ধরলে সব তথ্য পাওয়া যাবে।

সোহেল বলেন, আমার স্ত্রী আমাকে সাহায্য করেনি। ওর কোনো দোষ নাই। সব দোষ ডলারের। আমারও অল্প দোষ আছে, ডলারেরও দোষ আছে। আমি শুধু বাচ্চারে দুই টুকরো করছি। ধর্ষণ করছে ডলার, মারছেও ডলার। আমার কোনো ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি। ডলার আমাকে দুই লাখ টাকা দিছে। সে মিরপুরের কোটিপতি, অনেক টাকার মালিক।

এরআগে পাঁচ দিন তদন্ত শেষে গত ২৪ মে সোহেল রানাসহ দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান। দ্রুত বিচার শেষ করার জন্য সেদিনই মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। আলোচিত এই মামলায় ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।  

সোহেলের দাবি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির সমকালকে বলেন, সোহেলের বাসায় শিশুটিকে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছে। সেখানে সোহেল ও তার স্ত্রী ছাড়া অন্য কারও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তারের পর সোহেল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজের দোষ স্বীকার করেছে। এখন বিচারকাজ বিলম্বিত ও বিভ্রান্ত করার জন্য সোহেল এসব কথা বলছে।

ওসি আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে সোহেলের স্ত্রীও আমাদের জানিয়েছে, ঘটনার সময় তারা স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। হত্যার পর শিশুটির শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে সোহেল গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।

মামলাটি তদন্ত করেছিলেন পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ভুঁইয়া। তিনি সমকালকে বলেন, তদন্তে ডলার নামে কোনো ব্যক্তির জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। সোহেল নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টায় এসব কথা বলেছে। শিশুটিকে নির্মমভাবে হত্যার পরও তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। সে মাদকাসক্ত। ঘটনা অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য সোহেল এসব কথা বলছে। কারাগারে বসে সে ডলার নামক কাল্পনিক চরিত্র তৈরি করেছে। এর আগে সে এ ধরনের কোনো কথা বলেনি।

মামলায় অভিযোগ
মামলায় বলা হয়, পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, শিশুটিকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেন সোহেল রানা। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধবিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান।

গত ১৯ মে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীর একটি ভবনের তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা ঘটনার পর বাসার শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। তবে ওই বাসা থেকে তার স্ত্রীকে তখনই আটক করা হয়। আর ওই দিনই সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঘটনার পরদিন শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা করেন। ওই দিনই বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আসামি সোহেল রানা। শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা তিনি স্বীকার করেন।

মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামতসমূহের ফরেনসিক, রিপোর্ট, ডিএনএ পরীক্ষা এবং লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থেকে প্রমাণ হয় শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×