ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সালতামামি ২০২৫

দেশীয় পোশাকে আধুনিক নকশার ফিউশন 

দেশীয় পোশাকে আধুনিক নকশার ফিউশন 
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:২৫ | আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:২৬

বছরজুড়ে ফ্যাশন ট্রেন্ডে টেকসই ও ফিউশন পোশাকের রাজত্ব ছিল। বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মিনিমালিজম, সিম্পলিসিটি, ওভারসাইজ ট্রেন্ড। পোশাকে অতীতের ছোঁয়া বিশেষ করে ষাট থেকে নব্বই দশকের ছোঁয়া লক্ষ্য করা গেছে। দেশীয় তাঁত, হাতেবোনা কাপড়, প্রাকৃতিক রং এবং কারুশিল্পের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়েছে। গ্রন্থনা করেছেন রিক্তা রিচি। 

ফিরে দেখা ফ্যাশন
আশরাফুর রহমান ফারুক, কর্ণধার, নিপুণ
বাংলাদেশের ফ্যাশন ট্রেন্ডে ছিল সাসটেইনেবিলিটি ও ফিউশন ওয়্যারের দাপট। ছিল টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনের চল। বিদায়ী বছরের ফ্যাশন ট্রেন্ডে গুরুত্ব পেয়েছে মিনিমালিজম ও সিম্পলিসিটি। পোশাকের আরামদায়ক বিষয়ের সঙ্গে স্টাইলকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফ্যাশন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়। পুরোনো কিছু স্টাইল নতুনভাবে ফিরে এসেছে। এ বছর ওভারসাইজ ট্রেন্ড বেশ জনপ্রিয় ছিল। কামিজ, কুর্তি, টপসের প্যাটার্নে পরিবর্তন এসেছে। এ বছর নিপুণে ট্রেন্ড ছিল কোঅর্ড সেট, কাফতান, লুজ কুর্তা, কটি সেট, ওয়াইড লেগ প্যান্ট, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি ইত্যাদি। পোশাকে হাতের কাজের প্রাধান্য পেয়েছে। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রং নির্বাচন করা হয়েছে। 

ছবি: কে ক্র্যাফট


খালিদ মাহমুদ খান, কর্ণধার, কে ক্র্যাফট
বছরজুড়ে ব্যবহার উপযোগিতা এবং ডিজাইনার ও ব্র্যান্ডের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে যার যার নিজস্ব ধারায়। টেকসই ফ্যাশন বিষয়ে সচেতনতা ও চর্চা বেড়েছে। বছরজুড়ে নীলের বিভিন্ন শেড, কালো, মেরুন রঙের পোশাকের কদর ছিল। সময়ভেদে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অফ হোয়াইট, প্যাস্টেল শেডের চাহিদা বেশি ছিল। কাছাকাছি রঙের সংমিশ্রণের পণ্য, হাতের কাজের ইয়োক- পোশাক, এমব্রয়ডারি চলেছে। প্রিন্টের পোশাকের দাপট দেখা গেছে। ডিজিটাল ও স্ক্রিন প্রিন্টের পোশাকেও কারুকাজ লক্ষ্য করা গেছে। পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে কালো, নীল, মেরুন রঙে অল্প কারুকাজ লক্ষণীয়। বছরের শেষ দিকে সাদা পাঞ্জাবির চাহিদা বেড়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে আরামদায়ক কাট ও সুতি কাপড়ের পোশাকের চাহিদা শীর্ষে ছিল। 
বিপ্লব সাহা, স্বত্বাধিকারী ও ফ্যাশন ডিজাইনার, বিশ্বরঙ
দেশের নানা প্রতিবন্ধকতা, অর্থনৈতিক সংকট আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে। তারপরও টিকে থাকার জন্য কাজ করতে হয়। আমরা সিল্ক ম্যাটেরিয়াল, তাঁত, সুতির ওপর কাজ করেছি। নারী-পুরুষ সবার পোশাকে ফিউশন বেশ চলেছে। এখন ক্যাজুয়ালি শাড়ি পরার প্রবণতা অনেক কমেছে। কেবল শাড়ি পরছে পার্টিতে। এ বছর এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করেছি আগের বছরের চেয়ে কম। ডিজিটাল প্রিন্টের চাহিদা কমেছে। জাঁকজমক কাজের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে যেমন বেড়েছে, তেমনি সিম্পল ও কালারফুল কাজের চাহিদাও বেড়েছে। নারীদের পোশাকে প্যাটার্ন নিয়ে বেশ নিরীক্ষা করা হয়েছে। এ বছরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো বাংলাদেশের টাঙ্গাইল শাড়ি বুনন শিল্পকে ‘অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এটি তাঁতশিল্প এবং কারিগরদের জন্য পরম প্রাপ্তির। 

ছবি : রঙ বাংলাদেশ


সৌমিক দাস কর্ণধার, রঙ বাংলাদেশ
বছর শেষে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, ২০২৫ সাল বাংলাদেশের ফ্যাশন বাজারে এক ধরনের পরিণত বোধের বছর। ট্রেন্ডি ফ্যাশন এ বছর আর কেবল বাহারি নকশা বা মৌসুমি উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং জীবনধারা, সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছে। এ বছর সবচেয়ে স্পষ্ট যে ট্রেন্ডটি দেখা গেছে, তা হলো সাসটেইনেবল ও দেশীয় ভাবনাভিত্তিক ফ্যাশন। দেশীয় তাঁত, হাতেবোনা কাপড়, প্রাকৃতিক রং এবং কারুশিল্পের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ক্রেতারা শুধু পোশাক কিনছেন না– তারা জানতে চাইছেন এর গল্প, উৎস ও নির্মাণপ্রক্রিয়া। ডিজাইনের দিক থেকে মিনিমাল অথচ ব্যবহারযোগ্য ফ্যাশন ছিল বছরজুড়ে ট্রেন্ডে। ঢিলেঢালা সিলুয়েট, লেয়ার্ড পোশাক, মাল্টি-ওয়ে ব্যবহারযোগ্য আউটফিট– এসবই শহুরে জীবনের বাস্তবতায় জায়গা করে নিয়েছে। 
রঙের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ফ্যাশন বাজারে এ বছর আধিপত্য করেছে মাটির রং, ইন্ডিগো, অফ হোয়াইট, সবুজ ও লালের নানা শেড। লোকজ মোটিফ, নকশিকাঁথা অনুপ্রেরণা ও গ্রাফিক প্যাটার্নের আধুনিক ব্যবহার ট্রেন্ডকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। 
মুন্নুজান নার্গিস, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, লা রিভ
২০২৫ সালে ফ্যাশন আর স্টাইলিংকে এক শব্দে বলা যায় ব্যবহারযোগ্যতা। গত দশকেও ‘দেখতে ভালো’ এমন ফ্যাশন ও ডিজাইনের প্রচলন ছিল বেশি। এ বছর ‘পরতে ভালো এবং মানানসই’– এমন ডিজাইন ও রংগুলোই ফ্যাশনপ্রেমীদের পছন্দের তালিকায় বারবার উঠে এসেছে। লা রিভ নিজস্ব ডিজাইনে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুসরণ করে। বছরের শুরুতে ফাল্গুন-ভ্যালেন্টাইনে আমরা ‘কনভার্জ’ থিমে প্রযুক্তি ও প্রকৃতির মেলবন্ধনকে সামনে এনেছি। যেখানে ভাইব্রেন্ট কালার, ইউনিক প্যাটার্ন আর ডিজিটাল-ইনস্পায়ার্ড প্রিন্ট স্টোরি দিয়ে বসন্তকে একেবারে নিজস্ব ভাষা দেওয়া হয়েছে। ‘গ্লেজড চেরি’কে সেন্টিমেন্ট কালার করে পিক্সেল প্রজেকশন, গ্রাফিক ফ্লোরাল, মার্বেল-মুড, জিওমেট্রিক নেচার– এসব দিয়ে আমরা বলেছি, আধুনিকতা আর প্রকৃতি আলাদা নয়, একই গল্পের দুই দিক।
ঈদে ঝারোখা প্রিন্টের মতো ট্র্যাডিশনাল মোটিফগুলো হাইলাইটে ছিল আর গ্লোবাল ট্রেন্ডে ফ্যাশন ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের মাধ্যম। তাই পুরো পরিবারের জন্য ম্যাচিং ফ্যামিলি কম্বো, মিনি-মি ডিজাইন এবং নার্গিসাস লেবেলে পার্টিওয়্যার– সব মিলিয়ে ঈদের আনন্দকে আমরা ‘শেয়ার্ড এক্সপেরিয়েন্স’ করেছি। রঙে ছিল শান্ত আর্থি-জুয়েল টোন থেকে শুরু করে এনার্জেটিক পিঙ্ক-মনোক্রোম। কাজের দিক থেকে কারচুপি, এমব্রয়ডারি, লেজার কাট, প্যাচওয়ার্ক– সবই ছিল পরিমিত ও উৎসবমুখর। ওই সময় প্রিন্ট স্টোরিতে টেপেস্ট্রি-ইনস্পায়ার্ড ফ্লোরাল থেকে ব্লক-জিওমেট্রি সবই ট্রেন্ড-রিলেভেন্ট ছিল। আবার গ্রীষ্মে ‘ইথার’ ধারণায় আমরা নরম, হালকা, ফ্লোয়ি ডিজাইন করেছি, যেখানে ব্লু-স্টার সেন্টিমেন্ট কালার, ব্রিদেবল ফেব্রিক এবং ফ্লেয়ার-লেয়ার-র‍্যাফলসহ কমফোর্টেবল ফিটিংকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। ফলের আর্জেন্ট অরেঞ্জ ও গানাশ ব্রাউন যোগ করে উৎসবের রংকে আধুনিক করেছি। প্রিন্টে ক্লাসিক ইক্কাত-মান্দালা থেকে ডিজিটাল টাই-ডাই আর সিলুয়েটে কাফতান, ড্রামাটিক স্লিভ, লেয়ার্ড কেপ সবই ‘উৎসবের বাইরেও পরা যায়’ এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। বছরের শেষে উইন্টারে ‘অ্যাসেনশিয়ালিজম’ দর্শনে আমরা মিনিমাল, স্মার্ট, ক্লাসি– এই তিন পিলার ধরে নিউট্রাল থেকে ডিপ প্যালেট, মনোক্রোম ও কালার ব্লকিং এবং চেক-প্লেইডের বড় কিউরেশন দাঁড় করিয়েছি; যা শুধু একটি মৌসুম নয়, বারবার ব্যবহার করার মতো, টেকসই বা সাসটেইনেবল ফ্যাশনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের ফ্যাশনে উষ্ণতা, স্টাইল আর বাস্তবজীবনে বহুমাত্রিক ব্যবহারই বারবার উঠে এসেছে। 

আবেদা খাতুন মিতুল, উদ্যোক্তা ও ফ্যাশন ডিজাইনার
আমি মূলত বাংলাদেশের প্রকৃতিকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করি। পেঁয়াজ ফুলের রং, কৃষ্ণচূড়া নিয়ে কাজ করেছি এ বছর। দেশীয় নকশা যেন আশপাশের দেশের নকশার চেয়ে পিছিয়ে না থাকে সেগুলো নিয়ে সচেতন থেকেছি। এ বছর ব্লাউজে নতুনত্ব দেখেছি; আমাদের ব্লাউজেও নতুনত্ব এনেছি। বেবি কলার, কোট কলার বেশি করেছি। কো-অর্ড সেটগুলোয় বিভিন্ন রং, বিভিন্ন প্যাটার্নকে প্রাধান্য দিয়েছি। বছরজুড়ে বিভিন্ন প্যাটার্নের ওপর কাজ হয়েছে। পোশাকের গুণগত মান নিয়ে সচেতন থাকার চেষ্টা করেছি। টাই-ডাই, হাতের কাজ, শিবুরি, নকশি কাজ বেশি করা হয়েছে। পাশের দেশের ফ্যাশনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বটম-জ্যাকেট তরুণদের পছন্দের শীর্ষে ছিল। 

আফসানা ফেরদৌসী, সাসটেইনেবল ফ্যাশন ডিজাইনার ও শিক্ষক
২০২৫ সালের ফ্যাশনে সবচেয়ে শক্তভাবে উঠে এসেছে লোকাল টেক্সটাইল ও ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের গুরুত্ব। এ বছর ফ্যাশনে গ্লোবাল ট্রেন্ডের চেয়ে নিজেদের শিকড়, তাঁত ও কারিগরদের কাজকে সামনে আনার প্রবণতাই বেশি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে জামদানি ও টাঙ্গাইল শাড়ি নতুন স্টাইলিং ও আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে আবারও মূলধারার ফ্যাশনে জায়গা করে নিয়েছে।
হাতের কাজ করা লোকাল হ্যান্ডলুম ফেব্রিক, খাদি, হ্যান্ডলুম কটন এবং দেশীয় তাঁতের কাপড় উৎসবের পোশাকের পাশাপাশি দৈনন্দিন ব্যবহারের পোশাকেও জনপ্রিয় হয়েছে। একই সঙ্গে এ বছর ফ্যাশনে সাসটেইনেবিলিটি ও সচেতনতার বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। অনেক ব্র্যান্ড প্রাকৃতিক রঙের দিকে ঝুঁকেছে; যা পরিবেশবান্ধব হওয়ার পাশাপাশি আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
আমরা এ বছর হ্যান্ডলুম কটন, খাদি এবং দেশীয় তাঁতের কাপড়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করেছি। নকশিকাঁথার ব্যবহার বরাবরের মতোই ছিল। পাশাপাশি আপসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পুরোনো বা অব্যবহৃত টেক্সটাইলকে নতুন নকশায় রূপান্তর করেছি। এতে ফ্যাশনের সঙ্গে দায়িত্বশীলতা ও গল্প বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন

×