সুস্থ দেখালেও শরীরে হতে পারে পুষ্টির ঘাটতি, লক্ষণগুলো জেনে নিন
ছবি: সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ১২:১৬ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৩৪
বাইরে থেকে অনেককে সুস্থ-সবল দেখালেও অনেক সময় তাদের শরীরে ভিটামিন ডি, আয়রন ও ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি থাকতে পারে। এসব পুষ্টি উপাদানের মাত্রা কমে গেলেও শুরুতে অনেকের শরীরে স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি বা চুল পড়ার মতো উপসর্গকে অনেকে মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব কিংবা ব্যস্ত জীবনযাত্রার ফল বলে মনে করেন।
ভারতের যশোদা মেডি সিটির ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী পরিচালক ডা. বিনয় ভাট বলেন, বাহ্যিক চেহারার সঙ্গে শরীরের পুষ্টির অবস্থার অমিল অস্বাভাবিক নয়। ভিটামিন ডি, আয়রন ও ভিটামিন বি১২ শরীরের অক্সিজেন পরিবহন, স্নায়ুর কার্যক্রম, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও বলেন, শরীরে পুষ্টির মাত্রা কমতে শুরু করলেও কিছু সময় শরীর তা সামলে নিতে পারে। ফলে ঘাটতি ধীরে ধীরে বাড়লেও একজন ব্যক্তি স্বাভাবিক কাজকর্ম, শরীরচর্চা ও দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে যেতে পারেন।
পুষ্টির ঘাটতি হওয়ার কারণ
আধুনিক জীবনযাত্রার কারণেও শরীরে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। ভিটামিন ডি-এর অন্যতম প্রধান উৎস সূর্যালোক। দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরে বা অফিসে কাটালে পর্যাপ্ত সূর্যালোকের সংস্পর্শে না আসায় ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হতে পারে। খাদ্যাভ্যাসও আয়রন ও ভিটামিন বি১২-এর মাত্রায় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নিরামিষভোজীদের খাদ্যতালিকায় এসব পুষ্টির পর্যাপ্ত ও সহজে শোষণযোগ্য উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। তবে নিরামিষভোজী হলেই যে ঘাটতি হবে, এমন নয়। কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন সেবন করলেও ভিটামিন বি১২ শোষণে সমস্যা হতে পারে। এর মধ্যে মেটফরমিন এবং পাকস্থলীর অ্যাসিড কমানোর ওষুধ, যেমন প্রোটন-পাম্প ইনহিবিটর বা পিপিআই উল্লেখযোগ্য।
ভারতের হায়দ্রাবাদের শহরাঞ্চলে প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর করা এক গবেষণায় প্রায় ৪৬ শতাংশের শরীরে ভিটামিন বি১২-এর মাত্রা কম এবং প্রায় ২৯ শতাংশের ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পাওয়া যায়। আরেক জরিপে নিরামিষভোজীদের মধ্যে ১৪ শতাংশের ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি এবং ৮২ শতাংশের ভিটামিন ডি৩-এর মাত্রা কম পাওয়া যায়।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
ভিটামিন ডি, আয়রন ও ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির লক্ষণ অনেকটাই একই ধরনের হওয়ায় শুধু উপসর্গ দেখে কোনটির ঘাটতি হয়েছে তা বোঝা কঠিন। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দীর্ঘস্থায়ী বা কারণহীন ক্লান্তি
- মনোযোগে সমস্যা ও মানসিক জড়তা
- মেজাজের পরিবর্তন বা খিটখিটে ভাব
- চুল পাতলা হওয়া বা অতিরিক্ত চুল পড়া
- ব্যায়ামের সময় দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া
- শারীরিক দুর্বলতা
- বিশ্রামেও হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
আয়রনের ঘাটতি বাড়তে থাকলে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া হতে পারে। তখন ক্লান্তি, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট ও ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি থাকলে ক্লান্তির পাশাপাশি হাত-পা অবশ বা ঝিনঝিন করা, ভারসাম্য রাখতে সমস্যা এবং বিভিন্ন স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ভিটামিন ডি হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য এবং শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর ঘাটতি থাকলেও শুরুতে নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ নাও দেখা দিতে পারে।
যাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন
যারা নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস মেনে চলেন, দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরে থাকেন, ৫০ বছরের বেশি বয়সী, দীর্ঘদিন মেটফরমিন বা পিপিআই ব্যবহার করছেন কিংবা কারণহীন দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিতে ভুগছেন, তাদের পুষ্টির ঘাটতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এ ছাড়া যাদের খাদ্যাভ্যাস সুষম নয় বা ঘুম, মানসিক চাপ ও জীবনযাত্রার মাধ্যমে উপসর্গের কারণ ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না, তাদেরও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
কোন পরীক্ষায় ঘাটতি ধরা পড়ে
ডা. ভাটের মতে, প্রাথমিকভাবে কয়েকটি রক্ত পরীক্ষা করে এসব ঘাটতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে ২৫-হাইড্রোক্সিভিটামিন ডি, সিরাম ভিটামিন বি১২, ফেরিটিন এবং কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট বা সিবিসি। ফেরিটিন পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে আয়রনের মজুতের ধারণা পাওয়া যায়। সিবিসি পরীক্ষায় রক্তাল্পতা ও রক্তকণিকার বিভিন্ন পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব। আর ভিটামিন ডি ও বি১২-এর পরীক্ষা শরীরে এসব পুষ্টি উপাদানের মাত্রা সম্পর্কে তথ্য দেয়।
তবে পরীক্ষার ফল নিজে নিজে বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা শুরু করা উচিত নয়। বিশেষ করে শুধু ক্লান্তি বা চুল পড়ার মতো উপসর্গের কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চ মাত্রায় আয়রন বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা ঠিক নয়। অতিরিক্ত আয়রনও শরীরে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হলো, প্রথমে ঘাটতি আছে কি না তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া, এরপর ঘাটতির কারণ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা। বাইরে থেকে সুস্থ দেখালেই শরীরে প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি পর্যাপ্ত আছে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সূত্র: এনডিটিভি