হাতের কবজির সুস্থতায় যেসব অভ্যাস জরুরি
ছবি: গেটি ইমেজেস
বিবিসি
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৪১
সারাদিন কম্পিউটারে টাইপ করা, মোবাইল স্ক্রল করা, রান্না বা ঘরের কাজ—দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজেই কোনো না কোনোভাবে হাতের কবজির ব্যবহার করতে হয়। অথচ কবজিতে ব্যথা বা অস্বস্তি শুরু না হওয়া পর্যন্ত এর যত্নের কথা অনেকেই ভাবেন না। দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে হাতের ব্যবহার, অতিরিক্ত চাপ কিংবা পুরোনো কোনো আঘাত পরবর্তী সময়ে কবজির স্বাভাবিক নড়াচড়া ও কার্যক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে আর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই সমস্যা দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে এখন থেকেই কবজির শক্তি, নমনীয়তা ও স্থিতিশীলতা ধরে রাখার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
হাতের কবজি শরীরের জটিল অস্থিসন্ধিগুলোর একটি। এটি আটটি ছোট হাড়, হাতের সামনের অংশের দুটি লম্বা হাড় এবং তালুর পাঁচটি মেটাকার্পাল হাড়ের সমন্বয়ে গঠিত। টাইপ করা থেকে শুরু করে কোনো কিছু শক্ত করে ধরা—বিভিন্ন কাজের সময় এসব হাড়, লিগামেন্ট, টেন্ডন ও পেশি একসঙ্গে কাজ করে। ফলে কবজির ওপর দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চাপ পড়লে এর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
হাতের কবজি সমস্যার কারণ
হাতের কবজির সমস্যা হওয়ার পেছনে আঘাত, বয়সজনিত পরিবর্তন এবং দীর্ঘদিন একই ধরনের কাজ করার মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। হোঁচট খেয়ে হাতের ওপর পড়ে যাওয়া, বারবার হাত মোচড়ানো বা কবজিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এমন কাজ থেকেও আঘাত তৈরি হতে পারে। কবজির তরুণাস্থি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা হাড়গুলোর স্বাভাবিক বিন্যাসে পরিবর্তন এলে অস্টিওআর্থ্রাইটিস কিংবা পোস্ট-ট্রমাটিক আর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রেও অনেক সময় কবজিতে প্রথম দিকে উপসর্গ দেখা যায়।
খাবারের দিকেও নজর দিন
হাতের কবজির পাশাপাশি হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। ছোট কাঁটাযুক্ত মাছ, যেমন সার্ডিন, এবং বিভিন্ন ধরনের দুগ্ধজাত খাবার ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। শরীরের অতিরিক্ত ওজন কম রাখাও সামগ্রিকভাবে অস্থিসন্ধির ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তাই সুষম খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার অভ্যাস করা জরুরি।
কাঁধের পেশি শক্তিশালী করুন
হাতের কবজিকে ভালো রাখতে শুধু কবজির ব্যায়াম করলেই হবে না। পুরো বাহুর পেশিগুলোও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কাঁধের পেশি দুর্বল হলে হাতের অন্যান্য অংশের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। সহজ একটি ব্যায়ামের জন্য দুই হাত শরীরের দুপাশে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ান। এরপর ধীরে ধীরে দুই হাত ওপরের দিকে তুলুন এবং আবার নামিয়ে আনুন। এভাবে ১০ বার করতে পারেন।
বাড়ান হাতের মুঠির শক্তি
গ্রিপ বা হাতের মুঠির শক্তি কবজির স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ব্যায়ামে হাতের সামনের অংশের ফ্লেক্সর ও এক্সটেনসর পেশি সক্রিয় হয়, যা কবজি ও আঙুলের নড়াচড়ায় ভূমিকা রাখে। হ্যান্ড থেরাপি বল, থেরাপিউটিক পুটি কিংবা টেনিস বল ব্যবহার করে এই ব্যায়াম করা যায়। হাতের তালুতে বলটি নিয়ে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড জোরে চাপ দিন। এরপর হাত ছেড়ে ৫ সেকেন্ড বিশ্রাম নিয়ে আবার চাপ দিন। প্রতিটি হাতে ১০ বার করে করতে পারেন।
হালকা ওজন দিয়ে কবজির ব্যায়াম
হাতের কবজির নমনীয়তা ও শক্তি বাড়াতে হালকা ওজন ব্যবহার করে ফ্লেক্সন ও এক্সটেনশন ব্যায়াম করা যায়। টেবিলের ওপর ফোরআর্ম রেখে হাতের তালু ওপরে বা নিচে রেখে কবজি ধীরে ধীরে ওঠানো-নামানো যায়। এ ক্ষেত্রে হালকা ডাম্বেল বা অন্য কোনো ওজন ব্যবহার করা যেতে পারে। ওজন ব্যবহারে অস্বস্তি হলে রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড দিয়েও ব্যায়াম করা সম্ভব।
হাতের তালু ঘোরানোর অভ্যাস
হাতের কবজির নড়াচড়ার পরিসর ঠিক রাখতে সুপিনেশন ও প্রোনেশন ব্যায়াম করা যেতে পারে। এ ব্যায়ামে হাতের তালু ধীরে ধীরে ওপর থেকে নিচে এবং নিচ থেকে ওপরে ঘোরানো হয়। কম্পিউটার বা ল্যাপটপে দীর্ঘ সময় কাজ করার সময় হাত ও কবজি অনেকক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকে। তাই দিনের মধ্যে নিয়মিত বিরতি নিয়ে হাত ও কবজির অবস্থান পরিবর্তন করা এবং হালকা নড়াচড়া করা উপকারী হতে পারে।
ব্যথা হলে ব্যায়াম নয়
কবজির ব্যায়াম করার সময় ব্যথা, ফোলা বা অস্বাভাবিক অস্বস্তি হলে জোর করে ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। আগে থেকেই কবজিতে আঘাত বা কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
দৈনন্দিন কাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই হাতের কবজির প্রয়োজন হয়। তাই ব্যথা বা বড় কোনো সমস্যা তৈরি হওয়ার পর চিকিৎসার দিকে যাওয়ার বদলে নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং কাজের সময় হাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই কবজিকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখার অন্যতম উপায়।
- বিষয় :
- হাতের যত্ন
- ব্যায়াম
- স্বাস্থ্য