বিআরটি বাস্তবায়নে চাই রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা
যৌথ নিবন্ধ
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান, লিটন কামরুজ্জামান, মুহাম্মদ আহসানুল হাবিব, ফারিবা সিদ্দিক, আহসানুল কবির, মো. শফিক-উর রহমান, ফারিয়া শারমীন, এস এম রিয়াজুল আহসান, রক্তিম মিত্র, সোহেল আমিন, মো. সানিউল আলম, দেওয়ান মাসুদ করিম, ফয়সাল কবীর শুভ, এস এ এম আমিনুল হক, উম্মে তামিমা, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, মোহাম্মদ নুরুল হাসান, মু. শিব্বির আহমদ ও সাদিয়া চৌধুরী
দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে শহরগুলোতে যানজট, দীর্ঘ যাতায়াত সময়, বায়ুদূষণ এবং সড়ক নিরাপত্তার সমস্যা যখন ক্রমবর্ধমান, তখন বিআরটি (বাস র্যাপিড ট্রানজিট) সিস্টেম কেবল একটি উন্নত বাসসেবা জোগায় না; গণপরিবহন, পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনার একটি সমন্বিত ও স্মার্ট হাতিয়াররূপে কাজ করে। ঢাকাবাসী এখন প্রত্যক্ষভাবে জানেন, মেট্রোরেল ব্যবহারকারীদের জীবনযাত্রা ও সন্নিহিত এলাকায় কী কী ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে বা আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সঠিকভাবে পরিকল্পনা এবং নির্দিষ্ট (ডেডিকেটেড) বাস লেন, অগ্রাধিকারভিত্তিক সিগন্যাল, মানসম্মত স্টেশন স্থাপিত হলে বিআরটিও মেট্রোরেলের মতো দ্রুত, নির্ভরযোগ্য এবং উচ্চ ধারণক্ষমতার সেবা প্রদান করে। অধিকসংখ্যক মানুষকে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে বিআরটি শহরের পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা এবং নগরের গতিশীলতা বৃদ্ধি করে। দীর্ঘ মেয়াদে বিআরটি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার সঙ্গে কর্মসংস্থানে সহজ প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধি করে; শহরের সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কলম্বিয়ার বোগোতায় ট্রান্সমিলোনিও বিআরটি চালুর পর শহরের রাস্তায় মোটরযান চলাচল ৩২ শতাংশ এবং দুর্ঘটনায় নিহতের হার ৮৯ শতাংশ হ্রাস পায়। বিআরটি প্রকল্প পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে এর বিপরীতে যে বিশাল পরিমাণ কার্বন ক্রেডিট জমা হতে থাকে, তা দিয়ে আরও নতুন প্রকল্পের অর্থসংস্থান হতে পারে। আমাদের গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, গণপরিবহনের সাফল্য কেবল যানবাহনের গতি বা যাত্রী সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রকৃত সাফল্য আসে তখনই, যখন গণপরিবহনকে আবাসন, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, জনসেবা এবং হাঁটা ও সাইকেলবান্ধব নগর নির্মাণের চেষ্টার সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। এ কারণেই বাসযোগ্যতার তলানিতে থাকা ঢাকা ও অন্যান্য দ্রুত বর্ধনশীল, ঘনবসতিপূর্ণ ও অপেক্ষাকৃত কম আয়ের শহরের জন্য বিআরটিকে আমরা গেম চেঞ্জার মনে করি।
১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে সর্বপ্রথম শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ২০০টি শহরে বিআরটি পরিবহন সেবা প্রদান করছে। ২০০০ সালের পর বিশ্বে বিআরটির সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩৮৩ শতাংশ। এর প্রধান কারণ হলো মেট্রোরেলের তুলনায় সাশ্রয়ী ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্যতা, রাস্তায় বড় কোনো অবকাঠামোগত নির্মাণ না করেই বিআরটি করতে পারা, ভবিষ্যতে সহজে সম্প্রসারণ করা বা প্রয়োজনে মেট্রোরেল, এলআরটি বা মনোরেল স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ থাকা, স্থানীয় শিল্প সংযোগ ঘটানো, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ইত্যাদি।
আধুনিক বিআরটির অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য পাঁচটি: (১) বাসের জন্য নির্দিষ্ট ও বিশেষায়িত লেন, (২) প্রিপেইড বোর্ডিং, (৩) প্ল্যাটফর্ম লেভেলে বোর্ডিং, (৪) উচ্চ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ও ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস) সমৃদ্ধ বাস, (৫) সমন্বিত ভূমি ব্যবহার ও পরিবহন ব্যবস্থা তথা সমন্বিত নগর ও পরিবহন পরিকল্পনা। বিআরটি ২৫-৩০ হাজার (মেট্রোরেলের অর্ধেক) যাত্রী নিয়ে ঘণ্টাপ্রতি ২৫-৪০ কিলোমিটার গতিবেগে চলে। কিন্তু নির্মাণ খরচ মেট্রোরেলের এক-দশমাংশ। কুরিতিবা, বোগোতা, গুয়াংজু এবং জাকার্তার মতো শহরে বিআরটি উচ্চমানের গণপরিবহন সেবা প্রদানের পাশাপাশি ঘন ও মিশ্র ভূমি ব্যবহার, নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২০১৮ সালে বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক গবেষণামতে, চট্টগ্রাম শহরে বিআরটি ওভারডিউ বা অতিজরুরি; রাজশাহী, বগুড়া, ময়মনসিংহ, কুমিল্লাসহ ছয়টিতে তখনই (২০১৮ সালে) দরকার, অদূর ভবিষ্যতে দরকার হবে আরও ১৩টিতে। এ গবেষণা চলাকালে ঢাকা-গাজীপুর বিআরটির কাজ চলছিল, যা নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণের আলোচনা ছিল। তাই এ তিন শহরকে এ গবেষণার আওতা থেকে বাদ রাখা হয়। কিন্তু কে জানত, এ বিআরটির কাজ ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০২৬ সালেও শেষ হবে না!
ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়নে বিলম্ব, সমন্বয়হীনতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। ইনস্টিটিউট অব ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পলিসি (আইটিডিপি) প্রণীত নির্দেশিকায় ‘কমন প্ল্যানিং মিসটেকস’ অধ্যায়ে যেসব ভুলের কথা বলা হয়েছে; ঢাকা-গাজীপুর প্রকল্পে তার প্রায় সবই ঘটেছে। যেমন– অপটিমিজম বায়াস: বাস্তবতার চেয়ে কম সময় ও ব্যয় ধরে প্রকল্প গ্রহণ; রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার অভাব: নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়া; নকশায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অভাব: আব্দুল্লাহপুর, ভোগড়া ও গাজীপুর মোড়ে ভবিষ্যতে অন্য পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ রুদ্ধ করা ইত্যাদি। আইটিডিপি সতর্ক করে– একবার বিআরটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে গেলে পরে সংশোধন করা আইনত ও আর্থিকভাবে কঠিন। ইকুয়েডরের কিটো শহরের তিনটি স্বতন্ত্র বিআরটি করিডোরকে একীভূতকরণের ব্যর্থ চেষ্টা এবং ব্রিসবেনে চাহিদার ভুল হিসাবের কারণে স্টেশন পাসিং লেন সংযোজনে অতিরিক্ত ১১.৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের উদাহরণ এই নির্দেশিকায় উল্লেখ আছে। ঘানার আকরায় বিআরটি ব্যর্থ হয়েছে বিশেষায়িত লেনের অভাবে, অপ্রতুল অংশীজন সম্পৃক্ততায় এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিবহন (ত্রোট্রো) অপারেটরদের বিরোধিতার কারণে। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় ২০০৪ সালে চালু হওয়া ট্রান্সজাকার্তা বিআরটি শুরুতে একই ধরনের নকশাগত ত্রুটি-বিচ্যুতিতে ভুগেছে– পুরোনো বাস মিশ্র ট্রাফিক লেনে চলতে দেওয়া, প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডারের অভাব, ফিডার সার্ভিসের অনুপস্থিতি এবং যাত্রী চাহিদার তুলনায় ছোট গাড়ি ও স্টেশন সংযোজন। তবে জাকার্তা পরবর্তী পর্যায়ে এসব সমস্যার কিছুটা সংশোধন করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে পৃথিবীর দীর্ঘতম বিআরটি নেটওয়ার্ক হলো ট্রান্সজাকার্তা।
এশিয়ার অন্যতম সফল বিআরটির উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল। আমাদের মতোই পরিবহন ও যাতায়াত সংকটের প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালে শহরটিতে প্রথম বিশেষায়িত মিডিয়ান বাস লেন নির্ধারণ করে একটি বিআরটি চালু করা হয়। পরে ২০০৪ সালে সিউল আরও বড় ধরনের সংস্কার করে শহরের পুরো বাস রুট নতুন করে সাজানো হয়। বিআরটি করিডোর সম্প্রসারণ এবং বাস, মেট্রো ও অন্যান্য গণপরিবহনের জন্য একীভূত টিকিট ব্যবস্থা চালু করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এই পরিবর্তনের সুফল পাওয়া যায়। ২০০৪ সালে দৈনিক বাস ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৪৭ লাখ ৮০ হাজার। ২০১১ সালে তা বেড়ে প্রায় ৫৮ লাখে পৌঁছায় (গড়ে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি), যা প্রমাণ করে যে নির্দিষ্ট লেন ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের গণপরিবহনমুখী করতে সক্ষম।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বিআরটির মতো প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত ভূমি ও পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়ন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং কার্যকর আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয় এবং দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সঠিক ঠিকাদার ও বাস্তবায়ন টিম নির্বাচন যেমন দরকার, তেমনি দরকার ধারাবাহিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সদিচ্ছা। অন্যদিকে মেট্রোরেল বা পদ্মা সেতু প্রকল্প রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব পেলেও বিআরটি তেমন কোনো সুদৃষ্টি পায়নি। বরং নানা সময়ে নানা নেতিবাচক অভিধা পেয়েছে খোদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছ থেকে।
আশার কথা, বর্তমান সরকার বিআরটির বিষয়কে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে এবং চার হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রকল্পে দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে যাওয়ার বাস্তবতায় এ প্রকল্প থেকে কীভাবে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করছে।
বিআরটি প্রকল্প সম্পন্ন করতে দরকার হবে আরও দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এক হাজার ৪০০ কোটিই প্রকল্পের অব্যবহৃত টাকা। এ অবস্থায় বিআরটি প্রকল্প শেষ করতে কুণ্ঠিত বোধ করা কতখানি ন্যায্য ও ‘বৈষম্যবিরোধী’– সেই প্রশ্নও উঠবে। মনে রাখা দরকার, জনসংখ্যা বৃদ্ধি বিবেচনায় গাজীপুর বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু শহর। আর ঢাকা-গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জ দেশের সবচেয়ে বড় নগর অঞ্চল, যা জনসংখ্যা, জিডিপি, কর্মসংস্থান ইত্যাদিতে যেমন অন্যান্য নগর অঞ্চল থেকে অনেক এগিয়ে, তেমনি অবাসযোগ্যতা, দূষণ, ঢাকা কেন্দ্রীয় অংশে মাত্রারিক্ত জনঘনত্ব, খেলার মাঠ ও সবুজ জনপরিসর ইত্যাদির অপ্রতুলতায়ও সবার শীর্ষে। গাজীপুরের অভ্যন্তরীণ যাতায়াত সুগম ও ঢাকা-গাজীপুর সংযোগ বৃদ্ধি করে ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত ও উন্নত নগরায়ণের বিস্তারেও বিআরটিকে দারুণ উদ্যোগ ও বিনিয়োগ বলে বিবেচনা করা যায়। এ ছাড়া বিআরটি, মেট্রোরেলের মতো আধুনিক গণপরিবহনগুলো শহরে নারী-শিশু-বৃদ্ধদের যাতায়াতে যে কী স্বাচ্ছন্দ্য আনতে পারে, সেটা মেট্রোরেলের মাধ্যমেই আমরা দেখেছি। সুতরাং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্যও বিআরটি প্রকল্প শেষ করা জরুরি। মানতেই হবে, পরিস্থিতি এখন যা দাঁড়িয়েছে, তাতে বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট, ছোট-বড় ও ডিটেইলড কিন্তু জটিল নয়, এমন কাজ করতে হবে। পেশাগত অভিজ্ঞতা, অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা এবং ঢাকা-গাজীপুর প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতির আলোকে অবশ্যই করণীয়গুলোর একটা সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো।
১. প্রকল্প সম্পন্ন ও বাস সংগ্রহ: আগামী ১২ মাসের মধ্যে বিআরটি চালু করতে হলে ১৩৭টি বিআরটি (ডিজেল) বাস ক্রয়ের টেন্ডার প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় করে দ্রুত সমাপ্ত করতে হবে। সরকার চাইলে কেবল ইলেকট্রিক (ইভি) বাসই কিনতে পারে। বিআরটি ইলেকট্রিক বাস ক্রয়ের টেন্ডার প্রক্রিয়াকালে অবশ্যই টেকনোলজি ট্রান্সফারকে অন্যতম শর্ত হিসেবে রাখতে হবে। বিআরটি-সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক আদালতে প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও অন্যান্য কারণ দেখিয়ে যে মামলা করেছে; দেশের স্বার্থ রক্ষা করে তার আশু নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও করতে হবে।
২. অপারেশন ও ব্যবস্থাপনা: ঢাকা/এয়ারপোর্ট-গাজীপুর রুটে চলাচলকারী (রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত ৩৯৫টি ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন ১৬৭টি) বাসের মালিকদের সঙ্গে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হবে। সম্ভাব্য কয়েকটি পুনর্বাসন সূচি হতে পারে নিম্নরূপ: রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত বাসের মালিকদের নিয়ে একটি সমিতি/সমবায়/কোম্পানি গঠন; পূর্ণাঙ্গ বিআরটি চালু করার আগপর্যন্ত উক্ত সমিতি/সমবায়/কোম্পানির মাধ্যমে চলমান বাসগুলো থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক (১০০-১৫০টি) বাছাইকৃত বাসকে সাশ্রয়ী কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট নিয়মে ওই করিডোরে (বিআরটি লেন) চলাচলের অনুমতি প্রদান ও বাসসেবা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ; বাকি বাসগুলোর মধ্যে চলাচল অনুপযোগী বাসগুলোকে বাতিল ও স্ক্র্যাপকরণ এবং চলাচল উপযোগী বাসগুলোকে ঢাকা বা গাজীপুরে নতুন এক/একাধিক চক্রাকার বাস রুট চালু করে বাসসেবা প্রদানের ব্যবস্থাকরণ। বিআরটি বাসগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অপারেটর নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ ও বর্তমান বাসের মালিকদের সমিতি/সমবায়/কোম্পানিকে (পূর্ণাঙ্গ বিআরটি চালুর আগপর্যন্ত সন্তোষজনক সেবা প্রদান সাপেক্ষে) উক্ত অপারেটরের সঙ্গে যৌথভাবে বিআরটি বাসগুলো পরিচালনার জন্য পরীক্ষামূলক সুযোগ প্রদান। যদি এ যৌথ উদ্যোগ সফল হয় তাহলে ঢাকাসহ সারাদেশের বাস মালিকদের মাঝে সরকারের উদ্যোগগুলোর ওপর আস্থা তৈরি হবে; দেড় যুগের বেশি সময় ধরে ঢাকাতে চলমান বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং-এর জন্য প্রচেষ্টা সফল করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
৩. করিডোর ব্যবস্থাপনা: বিআরটির জন্য সুনির্দিষ্ট ও বিশেষায়িত করিডোর এরই মধ্যে তৈরি করা হয়েছে। তবে ইমারজেন্সি লেন হিসেবে বিআরটি করিডোরকে ব্যবহারোপযোগী রাখার জন্য ৫০০ মিটার পরপর বিআরটি লেন সংরক্ষণে তৈরি সড়ক বিভাজকে স্থানান্তরযোগ্য (মুভেবল) পার্টিশন স্থাপন করা যেতে পারে। বিআরটি চালুর প্রথম দিন থেকে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে: এ করিডোরে সকল প্রকার অযান্ত্রিক এবং লেগুনার মতো ছোট যান্ত্রিক যান চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে। একাধিক নির্দিষ্ট মোড় দিয়ে এগুলো এপার-ওপার করতে পারবে (এতে এই করিডোরে গাড়ির চাপ ৫-১০% কমে যাবে)। করিডোরের রাস্তার ওপর যাত্রী ওঠানামা করানো, পার্কিং, মালপত্র লোডিং-আনলোডিং নিষিদ্ধ করতে হবে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত সমন্বয়: বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ও এর কার্যক্রম সুন্দরভাবে চলমান রাখার জন্য ঢাকা বিআরটি কোম্পানি লিমিটেড (ডিবিআরটিসিএল) ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)-কে আইনিভাবে ও লোকবল দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
সর্বোপরি, উল্লিখিত কাজগুলো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করার সময় শুরু থেকেই বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান (বিআইপি, আইইবি ইত্যাদি) এবং পেশাজীবীদের (নগর ও পরিবহন পরিকল্পনাবিদ, পরিবহন প্রকৌশলী, যন্ত্র প্রকৌশলী, তড়িৎ প্রকৌশলী, কম্পিউটার প্রকৌশলী, পরিবহন অর্থনীতিবিদ) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা আগে করা হয়নি।
৫. চলমান ও প্রয়োজনীয় পরিবহন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন: সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্মাণাধীন ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে (নওজুরি-ভোগড়া-মিরেরবাজার-পূর্বাচল-ভূলতা-মদনপুর) দ্রুত চালু হলে দুই ঘণ্টার পথ ৩০ মিনিটে যাওয়া যাবে এবং বর্তমানে গাজীপুরকে বাইপাসকারী দৈনিক ১০ লক্ষাধিক ট্রিপের সিংহভাগ তা ব্যবহার করবে। তখন এই করিডোরে গাড়ির চাপ আরও ১০-১৫ শতাংশ কমে যাবে।
বিআরটি চালুর পর আরও তিনটি কাজ অবশ্যই করতে হবে:
(১) সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ধউর-কড্ডা-সালনা রাস্তা/এক্সপ্রেসওয়ের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। ঢাকা-উত্তরাঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাসগুলো এ রাস্তা/ এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করলে ঢাকা ও গাজীপুর করিডোরে গাড়ির চাপ আরও ৫-১০ শতাংশ কমবে।
(২) দ্রুততম সময়ে ডিটিসিএ প্রণীত গাজীপুর সিটি করপোরেশন (জিসিসি) কমপ্রিহেন্সিভ ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের সুপারিশ অনুযায়ী পথচারী পারাপারের জন্য আবদুল্লাহপুর, চেরাগ আলি, স্টেশন রোড, চৌরাস্তায় চারটি আন্ডারপাস; ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট গেটে একটি ফুট ওভারব্রিজ এবং বাটা গেট, মিলগেট ও শিববাড়িতে তিনটি রাস্তা পারাপারের ক্রসিং নির্মাণে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। বিআরটি করিডোরে জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিতে হবে।
(৩) গাজীপুরে বিআরটি বাস ডিপো সম্প্রসারণ বা সেখানে নতুন বাস ডিপো নির্মাণ এবং এয়ারপোর্ট প্রান্তে নতুন বাস ডিপো নির্মাণ করতে হবে। প্রস্তাবিত এয়ারপোর্ট মাল্টিমোডাল হাব প্রকল্পের অধীনে অন্যান্য মোডের ফ্যাসিলিটি ডিজাইনের সঙ্গে বিআরটি বাস ডিপোর প্রয়োজনীয়তাকে আমলে নিয়ে সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।
আরও কিছু দীর্ঘমেয়াদি কাজ:
(১) পুরো ঢাকা ও গাজীপুর শহরসহ সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী বাস ডিপোর নতুন/স্থানান্তরিত এলাকাকে বিআরটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে।
(২) রাজউক ও গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে বিআরটি স্টেশনগুলোর চারদিকে ৪০০-৮০০ মিটার এলাকাজুড়ে ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট-টিওডি প্রকল্প গ্রহণ ও সমাপ্ত করতে হবে। এটা হলে এ করিডোর সন্নিহিত এলাকা থেকে রিকশা, টেম্পো, লেগুনার মাধ্যমে বিআরটি স্টেশনে আসার প্রবণতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
(৩) দেশে ইভি বাস ও প্রয়োজনীয় আইটিএস সামগ্রী নির্মাণ শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্রিজ অথরিটির প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোকে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সঠিক প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সবার আগে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অঙ্গীকার। সেই সঙ্গে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব। আর সবসময় প্রয়োজন সমন্বিত নগর ও পরিবহন পরিকল্পনা।
দ্রুত নগরায়ণ ও যানজট নিরসনে বিআরটি কেবল একটি উন্নত বাসসেবা নয়, বরং টেকসই নগর গড়ার সাশ্রয়ী ও স্মার্ট হাতিয়ার। ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পে নানা বিলম্ব ও কৌশলগত ভুল থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়—
সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন:
মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান, লিটন কামরুজ্জামান, মুহাম্মদ আহসানুল হাবিব, ফারিবা সিদ্দিক, আহসানুল কবির, মো. শফিক-উর রহমান, ফারিয়া শারমীন, এস এম রিয়াজুল আহসান, রক্তিম মিত্র, সোহেল আমিন, মো. সানিউল আলম, দেওয়ান মাসুদ করিম, ফয়সাল কবীর শুভ, এস এ এম আমিনুল হক, উম্মে তামিমা, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, মোহাম্মদ নুরুল হাসান, মু. শিব্বির আহমদ ও সাদিয়া চৌধুরী:
লেখকরা বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন নীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ে অধ্যাপনারত এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত।