ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বই আলোচনা

কারাগারের আয়নায় রাষ্ট্রের মুখ

কারাগারের আয়নায় রাষ্ট্রের মুখ
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

মো. খোসবর আলী লিখেছেন কারাগারে অনুসন্ধান। এটি এক অসাধারণ বই। সম্প্রতি বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়েছে। আমি খুবই খুশি হতাম যদি উপস্থিত থাকতে পারতাম এই অনুষ্ঠানে। কিন্তু শারীরিক কারণে উপস্থিত থাকতে পরিনি না বলে দুঃখিত। আমার মনে হচ্ছে, এই বইটা এক অসাধারণ কাজ। মো. খোসবর আলী প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন। তিনি কোনো ওপরতলার অফিসার বা রাজবন্দি বা তাঁর পরিদর্শক ইত্যাদি ছিলেন না। তিনি কারাগারের ভেতরেই ছিলেন। কারারক্ষীদের একজন ছিলেন এবং তিনি এটা দেখেছেন। দেখে তাঁর কৌতূহল হয়েছে আরও জানার। 

সেগুলো অনুসন্ধান করে তিনি কাজটা করেছেন। তাঁকে আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই এবং এর প্রকাশককেও আমি ধন্যবাদ, অভিনন্দন এবং কৃতজ্ঞতা জানাব এমন একটা কাজ প্রকাশ করার জন্য। 
আসলে রাষ্ট্রের যে চেহারা, সেটা নানান জায়গায় ধরা পড়ে। বিশেষভাবে ধরা পড়ে কারাগারে এবং কারাগারের অবস্থা দেখলে বোঝা যায়– রাষ্ট্রের কী অবস্থা। যে কারা ব্যবস্থা আমাদের এখানে সেই ১৭৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তারপর আমরা অনেক স্তর অতিক্রম করলাম। কয়েকবার স্বাধীন হলাম। কিন্তু এই রাষ্ট্র যে বদলায়নি– তার বিভিন্ন প্রমাণ আমরা সব জায়গায় পাই। এই তো কারাগারেও এটার পরিচয় পাওয়া যায়। কারা ব্যবস্থায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। 

কারাগারকে ধারণা করা হতো, এটা একটা সংশোধনাগার। কিন্তু এটা সংশোধনাগার নয়। এটা যে কারাবন্দি হয় একবার হলেও, সে আরও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মধ্য থেকে আসে; সমাজ থেকে যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়; অপরাধী বলে সে যেভাবে চিহ্নিত হয়, তার দরুন তার পুনর্বাসন আর ঘটে না। তার জন্য দেখা যায় যে এই রকম যারা তথাকথিত অপরাধী তারা বারবার কারাগারে ফিরে যাচ্ছে। আর কারাগারে যেটা ঘটে, এটা একটা আজব জগৎ! একটা অপরিচিত জগৎ, যার সন্ধান আমরা জানি না এবং সেই অপরিচিত জগতে যে কাণ্ডকারখানা ঘটে, তার একটা বড় অংশ হচ্ছে দুর্নীতি। যেখানে টাকার খেলা চলে। যেখানে কেনাবেচা হয়; সুযোগগুলো কেনা যায় এবং যেখানে নিপীড়ন চলে এই যে বন্দিদের ওপরে; রাজবন্দিদের কথা আলাদা, সেগুলো আমরা জানি এবং তারা নিজেরাও বলেছেন। কিন্তু যারা এই সাধারণ অপরাধী বলে গণ্য, তাদের কথা তো আমরা জানি না। তাদের কথা তো কেউ বলে না এবং তাদের ওপর যে নিপীড়ন চলে, সেটা যে কত অমানবিক, তা আমরা অনুমান করতে পারি না। এই বই পড়লে সেটা আমরা কিছুটা কল্পনা করতে পারব। 

যদিও কল্পনাশক্তি আমাদের অতদূর পর্যন্ত পৌঁছাবে কিনা, বলা কঠিন। দুর্নীতির ব্যাপারটা কিন্তু এখনও রয়ে গেছে। নিপীড়নের ব্যাপারটাও রয়ে গেছে। এই যে রাষ্ট্র বদলাচ্ছে কিন্তু কারাগার বদলাচ্ছে না; তার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র আসলে বদলায়নি। রাষ্ট্র আসলে আগের রাষ্ট্রই রয়েছে। নানান পোশাক-আশাকে পরিবর্তন হচ্ছে; নামে পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু এর ভেতরের যে চরিত্র, যে স্বভাব, সেটার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। 
বিশেষ করে মেয়েদের ওপরে, নারী অপরাধী, তথাকথিত যারা কারাগারে যায় তাদের ওপরে যে নিপীড়ন চলে সেটা দ্বিমাত্রিক। একটা হচ্ছে পুরুষদের মতো নারীরা লাঞ্ছিত, নিগৃহীত, অত্যাচারিত হয়। আর একটা হচ্ছে নারী হলেও তাদের ওপর বিশেষ যন্ত্রণা দেওয়া হয়। 

সেই সব ছবি এখানে উদ্ঘাটিত হচ্ছে এবং এই উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়ে যেটা আমরা জানতে পারব এই পৃথিবীটাকে, সেটা শুধু জানা নয়, আমাদের আগ্রহ তৈরি হবে। আমি আশা করব, এই ব্যবস্থার বদল হবে। আমরা স্বাধীনতা বলতে যা পেয়েছি, সেটা যে প্রকৃত স্বাধীনতা নয়, তা আবার প্রমাণিত হবে কারাগারের ব্যবস্থায় আমরা কোন ধরনের পরিবর্তন আনতে পেরেছি সেই মাপকাঠিতে।
কারাগার ব্যবস্থায় তো উন্নতি হয়নি, বরং অবনতি হয়েছে। কারাগারে বন্দি রাখার যে ব্যবস্থা ছিল, যে পরিসর ছিল, তার তুলনায় অনেক বেশি মানুষকে এখন আটক রাখা হচ্ছে একই জায়গায়। কাজেই মান আরও নামছে এবং সমাজের যে ছবি, বিশেষ করে রাষ্ট্রের যে ছবি, সেটা ওখানে প্রকাশ করছে। কাজেই যারা সমাজ পরিবর্তনের কথা ভাবেন, তাদেরকে এই বই আরও অনুপ্রাণিত করবে যে সমাজ পরিবর্তন কতটা জরুরি এবং সেই পরিবর্তনটা হচ্ছে মূলত রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন। 
রাষ্ট্রের চরিত্রের পরিবর্তন আনতে হবে এবং রাষ্ট্রকে জনগণের মালিকানায় আনতে হবে। সেই ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে অপরাধ না ঘটে। মানুষ কিন্তু অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। মানুষ অপরাধী তৈরি হয়, যা পরিস্থিতির কারণে, নানা বিপদ-আপদের কারণে, অভাবের কারণে, নির্যাতনের কারণে অনেক সময়। কাজেই মানুষকে মানুষ হিসেবে যদি আমরা বাঁচাতে চাই, দেখতে চাই তাহলে সে যাতে অপরাধের জগতের দিকে না যায়, সেই জায়গাটা দেখা দরকার। তাকে শাস্তি দিয়ে এই অপরাধ দূর করা যাবে না। 

অপরাধ দূর হবে সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এবং সেটা হচ্ছে এমন একটা সমাজ আমরা চাইব, যেখানে ব্যক্তিমালিকানা থাকবে না, যেখানে সামাজিক মালিকানা থাকবে এবং সামাজিক মালিকানা থাকলে সেখানে অপরাধও থাকবে না। কেননা, সমাজে প্রত্যেক মানুষই সন্তুষ্ট থাকবে এবং সে মানুষ বুঝবে যে তার একটা জায়গা আছে; তার একটা ভূমিকা আছে। এই রাষ্ট্র তার এবং এখানে তার অধিকার আছে মানুষ হিসেবে বাঁচার। সে জন্য এটা খুবই জরুরি একটা বই। এটা শুধু জ্ঞানের জন্য নয়; এটা মানুষের অনুভূতিকে আঘাত করার জন্য; মানুষের চেতনাকে তীক্ষ্ণ করার জন্য এবং পরিবর্তনের জন্য যে আকাঙ্ক্ষা, সেই আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য অত্যন্ত জরুরি একটা প্রকাশনা বলে আমি মনে করি। লেখককে আবারও অভিনন্দন জানাই। তিনি একটা অসাধারণ কাজ করেছেন। 
প্রকাশককেও ধন্যবাদ জানাই এবং আমি আশা করি, বইটি বহুল পঠিত হবে এবং যত পঠিত হবে ততই আমাদের উপকারে লাগবে। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×