ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

শ্যাম রাখি না দুদক রাখি

শ্যাম রাখি না দুদক রাখি
×

মঈদুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৮

'স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল'- বাংলা এ প্রবাদটি জানা সবার। এর মর্মার্থ হাড়ে হাড়ে টের পায় পাগলেও। 'শরীরের নাম মহাশয়' বলা সহজ হলেও যা-তা সহানো মোটেই সহজ নয়। আমার তো সয় না কিছুই; এমনকি লবণটাও। একটুখানি বেশি হলেই একেবারে শিরে সংক্রান্তি। তীব্র শিরোপীড়ায় কাতরানি তিন দিন! নুন সয় না, তাইতে গুণ গাওয়া আর ধাতে এলো না।

দেশের তাবৎ লোকের স্বাস্থ্য-সুখের দায় নিয়ে কাজে আছে আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সঙ্গে নিয়ে তারই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, আরও কত দপ্তর, হাজার প্রতিষ্ঠান! তাদের নাকি এবার অসুখের বিশেষ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদক নামে যা সমধিক পরিচিত। পত্রিকায় প্রকাশ (সমকাল, ১২ জানুয়ারি ২০২০)- দুদকাতঙ্কে নাকি তাদের কর্মকর্তারা কেনাকাটা পাশ কাটিয়ে চলছেন! আমাদের 'কেনা' ব্যাপারটা এলেই 'কাটা' ব্যাপারটাও চলে আসে অবধারিতভাবে। তাই তো কেনার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে কাটা জড়িয়ে বেশুমার চলছে কেনাকাটা। কাটা-ই যদি না যায়, তবে আর কেনা কেন! এই কেনায় যদি কাঁটা নয়, একেবারে গজাল নিয়ে দুদক দাঁড়ায়, তবে তো কেনা-ই দায়! তবে কিনা, কেনার চেয়ে যদি কাটা-ই বেশি হয় তাহলে তো বেগতিক একটু ঠেকবেই। 'হেলথ্‌ ইজ ওয়েলথ'; স্বাস্থ্যই সম্পদ- এই বিদেশি প্রবাদে ভুললে প্রমাদ তো গুনতে হবে। একেকটি পর্দা, হোক তা রোগীর বা ভোগীর, যদি সাড়ে ৩৭ লাখ টাকায় কেনা হয় তাহলে কেনা আর হলো কতটুকু! সবই তো গেল কাটাতে। বাঙালির চক্ষু চড়কগাছে কি এমনি ওঠে!

বেড়াল যদি বলে, মাছ খাব না, তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু ইঁদুর ধরব না বললে তো মহা মুশকিল! যার যার স্বাভাবিক কাজটুকু তো করতে হবে। বেপর্দায় না হয় চলতে পারে, কিন্তু হাসপাতালে যদি প্রয়োজনের ওষুধ, যন্ত্রপাতি মোটেই কেনা না হয়, তাহলে 'কুচিকিৎসা'ও তো কপালে জুটবে না। রেলের লোকেরা যদি প্রয়োজনের রেল, কোচ, ইঞ্জিন আরও সব কেনা বন্ধ করে; সড়কের লোকেরা রাস্তা, সেতু বানানো, মেরামত বন্ধ করে বসে থাকে; সিটি করপোরেশন যদি আর মশা মারার ওষুধ না কেনে তাহলে যে কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়াবে, তা কল্পনা করা তো আরও ভয়ঙ্কর!

তবে কি এখন 'সকল অসুখের মূল দুদক'! এ রকম কথা আগেও উঠেছে দুয়েকবার। ব্যাংকাররা নাকি ঋণ দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন দুদকের ধরপাকড়ে। আমাদের আর যা-কিছুরই অভাব থাক, যুক্তিবাগীশ-তর্কবাগীশের অভাব নেই! সেদিন এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে পাশে বসা লব্ধপ্রতিষ্ঠ বিজ্ঞ ব্যারিস্টারের যুক্তি হাঁ হয়ে শুনতে হলো। ক্যাসিনো-কাণ্ডের ধরপাকড়ে নাকি 'মানি ফ্লো' কমে গেছে। আর তাইতে প্রভাব পড়েছে দ্রব্যমূল্যে (নিম্নগামী না হয়ে ঊর্ধ্বপানে ছুটেছে!)। এখন আবার স্বাস্থ্যে আসছে দুদকাতঙ্কের কথা। 'উপরি-ফায়দা' হালাল করার যুক্তিতর্কে থ হওয়া ছাড়া আর কোনো গতিক আছে!

দুদককে বাবুরাম সাপুড়ের দুধ-ভাতে একেবারে শান্তমতো দেখতে চান, রাখতে চান অনেকে- বাইরের, ভেতরের। একবার এর এক বড় কর্তা তো সাফ জানিয়েও দিয়েছিলেন 'নখদন্তহীন' বলে। দুদকের নখদন্ত যা আছে, তা অন্য অনেকের ভাগ্যে জোটে না। কী, আর কত আছে, তার ফিরিস্তি এখানে ধরবে না। তবে তা সর্বত্র সমভাবে ফুটাতে হয়তো দেখা যায় না। কেন ফোটে না, সে আরেক প্রসঙ্গ। অবকাশ জুটলে দুদককে তাই একেবারে 'নখদন্তহীন' বলা যায় না। তবে যদি কেউ 'গজদন্তসার' বলেন, তাহলে আমি নাচার। দাঁত-চোখ-নখ আছে সবই, ফোঁসফাঁস তো কিছু করেই, ঢুঁশ্‌ ঢাঁশও মারে কিছু। তাই তেড়ে মেরে ডাণ্ডা করে দিতে হবে ঠান্ডা! দাঁত-নখ উপড়ে ফেলা যদি নাও যায়, তবু যেন দুদক থাকে 'গজদন্তসার' হয়ে- এই কামনা 'রাঘববোয়াল' দুর্নীতিবাজদের মনে মনে। যদিও রাঘববোয়াল থেকে শত হাত দূরে থাকার কৌশলে দুদক চলে বলে দুর্মুখরা মুখর সর্বদাই। 'গজদন্তসার' যদি কিছুটা হয়েও থাকে, দুদক শ্বেতহস্তী নয় মোটেও। দুদকের ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন (২০১৯ সালেরটি এখনও প্রকাশিত হয়নি) বলছে, তাদের মামলায় সাজা থেকে রাষ্ট্রের পক্ষে জরিমানার আদেশ হয়েছে ১৩৯ কোটি ৯৪ লাখ ৭৬ হাজার ৯৯১ টাকার এবং বাজেয়াপ্তির আদেশ হয়েছে ১৩ কোটি ৩৪ লাখ ৪৭ হাজার ২৫২ টাকার। দুটো মিলে ১৫৩ কোটি ২৯ লাখ ২৪ হাজার ২৪৩ টাকা রাষ্ট্রের প্রাপ্য করেছে দুদক। আর ওই বছরে সরকারের কাছ থেকে বাজেটে দুদক পেয়েছে ৯৪ কোটি ৪৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। (মামলায় সাজার হারও এদের ৬০ শতাংশের ওপরে। ফৌজদারি আর সবার চেয়ে অনেক অনেক বেশি) দুদক দিয়ে 'চুনোপুঁটিতেই' রাষ্ট্রের লাভ-ক্ষতির হিসাব করুন, আর রাঘববোয়ালে কত হতো ভাবুন। দুর্মুখরা হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, এই যে জরিমানা-বাজেয়াপ্তি, তা কাজির কেতাব থেকে রাষ্ট্রের গোয়ালে গেছে কিনা, সত্যি আদায়-দখল হয়েছে কিনা। আদায়-দখলের কাজটি আইনত কালেক্টরের। কিন্তু কেন জানি কোতোয়ালগিরি আর কাজিগিরিতেই ব্যগ্রতা বেশি; কালেক্টরি বিষম ল্যাঠা!

স্বাস্থ্যই হোক আর ব্যাংকই হোক, সবখানের সবাই তো আর 'উপরি-ফায়দা'র কারবারি হতে পারে না (সুযোগ-সাহস, বুদ্ধি-যোগ্যতা, বিবেকহীনতা; যার অভাবেই হোক না কেন), কিছু তো ব্যতিক্রম থাকেই। আছেও, যারা নিজের কাজটা ঠিকঠাক করতে চান নির্ঝঞ্ঝাটে। কবিগুরু তো মিথ্যে বলেননি- 'আমার মতে জগৎটাতে ভালোরই প্রাধান্য/ মন্দ যদি তিন-চল্লিশ ভালোর সংখ্যা সাতান্ন'। দুর্নীতিবাজরা সত্যি কি দুদককে ভয় পায়! এই তো স্বাস্থ্যেরই কোন এক আবজাল দুদকজাল ফাঁক করে সোনার বাংলা শূন্য করে সুটকেস ভরে দিব্যি পগারপার হয়ে গেছে বেগমপাড়ায় বেগম নিয়ে! আসল বিষয়টা তাহলে কী? এর স্পষ্ট উত্তর আছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই লাইফস্টাইল, হেলথ এডুকেশন অ্যান্ড প্রমোশন স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে (দৈনিক যুগান্তর, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯)। সেখানে কেনাকাটায় যত সব 'দোষ-ত্রুটি' ঘটেছে, সেসবের কারণ হিসেবে আরও কিছুর সঙ্গে ভয়-ভীতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এবং 'স্বার্থান্বেষী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান'গুলোর হাত থেকে ক্রয় প্রক্রিয়াকে নিরাপদ রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃত কারণ এ দুটোই। ধান্ধাবাজ-ক্ষমতাধর 'রাঘববোয়ালরা' চাপ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে (অল্প-বিস্তর লোভও), 'চুনোপুঁটিদের' দিয়ে ফায়দা মেরে নিজেরা গায়েব থাকেন দূর আসমানে সুখচিত্তে। যাদের ঠিকানা দুদকের মেলে না; ধরা পড়ে চুনোপুঁটিরাই। বুদ্ধিমানে খাটায় বুদ্ধি, বোকায় পড়ে চিপায়! শুধু স্বাস্থ্য নয়; সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানেই এই হাল। চাকরি বাঁচাতে, ভোগান্তি ঠেকাতে অনেকেই এসব চাপে ক্ষণিক লাভের আশে পুতুলবৎ যে কাজটুকু করেন তার থেকেই তৈরি হয় বৃহৎ দুর্নীতি ঘটানোর ফুটোটা। লাভের ছিটেফোঁটা এদের যা জোটে তা চলে যায় পরবর্তী ভোগান্তি সামলাতে। আখেরে চাকরিও টেকে না, ভোগান্তিও ঠেকে না। 'যেমনি নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কী দোষ' বলে নাচলেও শেষকালে পুতুলকেই তো ফেলা হয় বিচারে। শ্যাম থাকে অধরা, অদৃশ্যে বিরাজমান। শ্যাম আর কুল একসঙ্গে রাখার কৌশল কাজে লাগে না। শেষকালে শ্যামও থাকে না, দুদকও ছাড়ে না। শ্যাম রাখতে দুদক সামলানো দায়- এই কঠিন সত্য পরিস্কার। তাহলে কি দুদককে থামতে হবে, নাকি থামাতে হবে! কাটা বাদে কেনার কাজ সারলে, জাল-জালিয়াতি ছাড়া ঋণের কারবার করলে দুদকের হাত কেন; নাকও গলানোর ফাঁক হয় না। শ্যামদের অন্যায় আবদার আর অবৈধ চাপে ঠিকঠাক কাজ করা বিষম দায়। শ্যাম রাখি না দুদক রাখি- এই দোটানা নয়। টানা তাদের একটাই- দরকারি কাজ তারা করতে পারছেন না শ্যামের টানায়। আসলে তারা দুদক আতঙ্কে নয়; আছেন এই 'শ্যাম' আতঙ্কেই। দুদক থামান বা সরান জরুরি নয়। দরকার হলো 'শ্যাম' থামান, সরান। গায়েবি সব 'শ্যাম' সরান- সরকারি কাজে গতি, উন্নতি কোনোটাই আটকাবে না। ভালোর সংখ্যা অবশ্যই সাতান্ন।

সাবেক সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল)
[email protected]

আরও পড়ুন

×